চট্টগ্রাম বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

১৮ মার্চ, ২০২০ | ১:৪৫ পূর্বাহ্ণ

সম্পাদকীয়

কিডনি রোগ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নিন

কিডনি রোগ হচ্ছে নীরব ঘাতক। রোগটি এখন বিশ্বব্যাপী অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এ রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রথম দিকে এর কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে, তখন কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হয়ে পড়ে। তবে, সচেতন এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করলে রোগটির আক্রমণ থেকে বাঁচা সম্ভব। এ কারণেই মূলত নানা প্রতিপাদ্যে প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে পালিত হয় বিশ্ব কিডনি দিবস। এতে কিডনি রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে কিছুটা সচেতন করে তোলা সম্ভব হয়। ‘সুস্থ কিডনি, সর্বত্র সবার জন্য’ প্রতিপাদ্যে দিনকয়েক আগে দেশে পালিত হলো বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগের প্রকট অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দিবসটি পালন খুবই তাৎপর্যবহ বলতে হবে। তবে শুধু জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, সেই সঙ্গে চিকিৎসক, সেবিকা ও জনস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত স্বাস্থ্যকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কিডনি রোগের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাও দরকার।
মানুষের শরীরের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে কিডনি হচ্ছে অন্যতম। কিডনি বিকল হলে জীবন ঝুঁকিতে পড়ে, মৃত্যুও হয়। যার কারণে কিডনি রোগের ওষুধ ও চিকিৎসা সহজলভ্যকরণ এবং কিডনি সুরক্ষায় জনসচেতনতা বাড়াতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে, তা পর্যাপ্ত নয়। বিভিন্ন গবেষণারিপোর্ট বলছে, কিডনি রোগ মানবজাতির পঞ্চম মৃত্যুর কারণ এবং স্বাস্থ্য খাতের ২ থেকে ৩ শতাংশ বরাদ্দ এই কিডনি রোগের জন্য ব্যয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন ও কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) সর্বশেষ তথ্যমতে, দেশে অন্তত দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি সমস্যায় ভুগছেন।
এ ছাড়া দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা শিশু রোগীদের ৫ থেকে ৭ ভাগ কিডনি রোগে আক্রান্ত বলেও জানা গেছে। তবে সাধারণ মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করা গেলে রোগটির বিস্তার ঠেকানো যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিডনি রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করলে ৬০ শতাংশ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে যাতে কিডনি রোগ চিহ্নিত করা যায়, সে ব্যাপারে এ রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলোর বিষয়ে জনগণের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। প্রাথমিকভাবে কিডনি রোগের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর নজর দিলে, কিডনি ও মূত্রনালি, মূত্রথলি ও প্রস্রাবের রাস্তার কাঠামোগত ত্রুটি চিকিৎসা করা গেলে, কিডনি ক্ষতিকারক কোনো ওষুধ ও পরিবেশের কোনো রাসায়নিক পদার্থ থেকে বিরত থাকলে, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলে, চিকিৎসা ও পথ্য পাওয়া সুলভ হলে রোগটির ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
কিডনি রোগ প্রতিরোধযোগ্য যদি সঠিক সময়ে কিডনি রোগের শনাক্ত করা ও চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু সচেতনতার অভাবে তা হয় না। ফলে কিডনি রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারেই বেড়ে চলেছে। এমন চিত্রের অবসানে ব্যাপক জনসচেতনতা কর্মসূচির বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবে আটটি স্বর্ণালি সোপান কঠিনভাবে অবলম্বনের তাগিদ তৈরি হয়েছে এখন। এগুলো হলো কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত ব্যায়াম, উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা, সুপ্ত উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান, ধূমপান থেকে বিরত থাকা, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা এবং নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা। এসবের সাথে সাধারণ স্বাস্থ্যবিষয়ক কিছু নিয়মকানুন মেনে চললে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিডনি সুস্থ রাখতে ও রোগ থেকে বাঁচতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য বিষমুক্ত ও নিরাপদ রাখার ব্যাপারেও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানেরও এগিয়ে আসা দরকার। প্রসঙ্গত, কিডনি রোগের চিকিৎসার ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশে বিনাচিকিৎসায় মারা যায় ৯০ শতাংশ মানুষ। বিষয়টি আমলে নিয়ে জরুরিভিত্তিতে পর্যাপ্তসংখ্যক ডায়ালাইসিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও কম খরচে চিকিৎসাসেবার সুযোগ উন্মুক্ত করা উচিত। কিডনি সংযোজনের আইনটি এখন যুগোপযোগী করা হয়েছে। এর ফলে কিডনিদাতার সঙ্কট দূর হবে। এটি আশার কথা। তবে এক্ষেত্রে কিডনিদাতা ও গ্রহীতা নির্ণয়ের জন্য এবং অবৈধ কিডনিবাণিজ্য প্রতিরোধ করতে সরকারী উদ্যোগে ‘প্রত্যয়ন প্রদানকারী বোর্ড’ গঠন করা উচিত।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট