চট্টগ্রাম রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ

সাগরে হারিয়ে গেল ১৫ প্রাণ মানবপাচার ঠেকাতে চাই কঠোর পদক্ষেপ

মানবপাচার একটি গর্হিত কাজ হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রে স্বীকৃত। প্রণীত হয়েছে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনও। এ ব্যাপারে সরকারের মনোভাবও কঠোর। কিন্তু তারপরও ঠেকানো যাচ্ছে না চরম ঘৃণিত মানবপাচার তৎপরতা। চুরি, ডাকাতি, খুনসহ বিভিন্ন সমাজবিরোধী কর্মকা-ের পাশাপাশি দেশে নারী ও শিশুসহ মানবপাচারের ঘটনাও ঘটছে। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন জনপদ থেকে শিশু হারিয়ে যাচ্ছে। চাকরিসহ নানা প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করা হচ্ছে অসহায় দারিদ্র্যক্লিষ্ট নারীদের। দরিদ্র্য যুবকদেরও চাকরিসহ উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ পথে পাচার করা হচ্ছে। তাদের প্রায় সবাই বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে কষ্টের জীবন। কেউ পাচারের সময় মৃত্যুকে অলিঙ্গন করে, কেউ দুর্গম কোনো জঙ্গলে বন্দি হয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করে মুক্তিপণ দিয়ে জীবন ফিরে পাচ্ছে, আবার কেউ পাচারকারীদের দ্বারা হত্যার শিকার হয়ে জীবন সাঙ্গ করে দিচ্ছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার দালালচক্রের মাধ্যমে সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় সেন্টমার্টিনের অদূরে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে ১৪৮ জন রোহিঙ্গা বোঝাই যাত্রীসহ একটি ট্রলার ডুবে মারা গেছে ১৫ জন, নিখোঁজ আছেন ৫০জন। মানবপাচারের এমনতর ঘটনা প্রায়শ ঘটে চলেছে। কিন্তু কোনো সভ্য মানুষ এমন অমানবিক ঘটনাকে সায় দিতে পারে না। মানবজাতির জন্যেও এমন ঘটনা কলঙ্কতিলক।

দৈনিক পূর্বকোণসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, গত মঙ্গলবার ভোরে কক্সবাজারের সেন্ট মার্টিন্সের ছেঁড়াদ্বীপের পাশে সাগরের ‘মগঘোলা’ নামক এলাকায় ঘটেছে এ মর্মান্তিক নৌকাডুবি। টেকনাফ উপকূলের বাহারছড়া এলাকা থেকে নৌকাটি যাত্রা করেছিল। কাঠের তৈরি ইঞ্জিনচালিত ছোট আকারের নৌকাটিতে প্রায় দেড়শ’ জন যাত্রী ছিল। যাত্রীদের প্রায় সবাই রোহিঙ্গা এবং তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। জীবিত উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে চার দালালও রয়েছেন, যাঁদের দুজন বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে রোহিঙ্গাবোঝাই আরো দুটি নৌকা ওই নৌকাটির সঙ্গে প্রায় একই সময়ে রওনা দেয়। ওই দুটি নৌকার হদিস জানা যায়নি। উদ্ধারপ্রাপ্ত যাত্রীরা বলেছেন, দুর্ঘটনার শিকার নৌকাটি অত্যন্ত ছোট আকারের ছিল। গাদাগাদি করেই তাদের বসতে হয়েছিল। নারী-পুরুষ ও শিশুরা নৌকাটিতে সাগর পাড়ি দিচ্ছিল একজন-অন্যজনের কোলে-পিঠে বসেই। উল্লেখ্য, জন্মভূমি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো জোরালো সম্ভাবনা আপাতত না থাকায় রোহিঙ্গা শিশুকিশোর ও তাদের পরিবারগুলো হতাশ হয়ে পড়েছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে মানবপাচারকারী চক্রগুলো। এদের খপ্পরে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপজ্জনকভাবে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দুর্দশাগ্রস্ত জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে তারা। বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও বলছে, ভবিষ্যতের কোনো লক্ষ্য না থাকায় রোহিঙ্গা শিশুরা হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে তারা মানবপাচারকারীদের সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। গণমাধ্যমের খবর বলছে, প্রতিটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সক্রিয় রয়েছে মানবপাচারকারী দালাল চক্রের সদস্যরা। তারা অসহায় রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে ট্রলারে চেপে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে আগ্রহী করে তুলছে। এর আগে একাধিক সময় টেকনাফ উপকূল ব্যবহার করে সাগর উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়া মানবপাচার হয়েছিল। প্রশাসনের কঠোর প্রতিরোধে তাদের সেই অপচেষ্টা বন্ধ হয়ে যায়। এই পথে দীর্ঘদিন মানবপাচার বন্ধ থাকার পর দালাল চক্রের সদস্যরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে মানবপাচার কর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সাগর পথে ট্রলারে চেপে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় গত কয়েক মাসে ৭ শতাধিক মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা সবাই বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা। তবে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাড়ি দেওয়া বেশির ভাগ যাত্রী হচ্ছে নারী। কারণ দালালরা টার্গেট করছে রোহিঙ্গা সুন্দরী যুবতীদের। বিদেশে পাচারকৃত নারীরা কেউ হয় যৌনদাসী, কেউ হয় গৃহপরিচারিকা, আবার কাউকে উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দেয়া হয়। কেউ কেউ চোখ, কিডনি নানা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের জন্যে হয় হত্যার শিকার হয়। মঙ্গলবার জীবিত উদ্ধার হওয়া রোহিঙ্গারা নারীরাও বলেছেন, দালালদের খপ্পরে পড়ে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মালয়েশিয়া পাড়ি দিচ্ছিল। পাচারের ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই সংবাদমাধ্যমে আসে না। ফলে এসব অজানাই থেকে যায়।

আমরা মনে করি, এই অমানবিক কাজের বিরুদ্ধে এখনই একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা কর্মসূচিকে জোরদার করতে হবে। পত্র-পত্রিকা, বেতার-টেলিভিশনে মানবপাচারকারীদের মানবতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ব্যাপক তৎপর হতে হবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে। আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি দেশের মানুষ যদি এ বিষয়ে সচেতন ও সোচ্চার হয় তাহলে পাচারকারীরা তাদের অপতৎপরতা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হবে। তবে পুরোপুরি সাফল্য পেতে হলে বিভিন্ন চেকপোস্ট ও সীমান্তে নজরদারী জোরদার করতে হবে।

The Post Viewed By: 40 People

সম্পর্কিত পোস্ট