চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

সর্বশেষ:

২৩ জানুয়ারি, ২০২০ | ৪:৫৭ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

টিপিপি কলোনিতে ‘মিনি ওয়াসা’

রেলওয়ের পাহাড়তলী টিকেট প্রিন্টিং প্রেস কলোনি। সবার কাছে পরিচিত টিপিপি কলোনি নামে। রেলের হিসেবে প্রায় দুইশ’ বাসা ও বাংলো থাকলেও বর্তমানে কলোনিতে বসবাস করছেন তিন শাতাধিক পরিবার। যাদের পানির চাহিদা মেটাতে রেলওয়ের নিজস্ব পানির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন থেকে পানির সংকটে এখানকার বাসিন্দারা। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে গভীর নলকূপ বসিয়ে চলছে রমরমা পানির অবৈধ ব্যবসা। যার সাথে জড়িত স্বয়ং রেলওয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তারাও।
শুধু টিপিপি কলোনিই নয়, একটিমাত্র নলকূপ কিংবা ডিপ বসিয়ে আটশ’ বাসায় দীর্ঘ ছয় বছর ধরে ব্যবসা চালিয়ে আসছেন এমন তথ্য পাওয়া গেছে। যেখানে মিনিট হিসেবেই চলে পানির রমরমা ব্যবসা। বলা চলে টিপিটি কলোনি এখন প্রায় মিনি ওয়াসা হিসেবেই পরিচিত সবার কাছে। এ মিনি ওয়াসা থেকেই প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা আয়ের হিসেবও পাওয়া গেছে। আর ওঠে এসেছে এ ব্যবসার সাথে জড়িতের নামও।

তাদের মধ্যে একজন বাবু। যিনি এলাকায় পরিচিত কালা বাবু ও ডিস বাবু নামে। স্ত্রী রেলওয়ে চাকরি করার সুবাধে থাকেন পাহাড়তলী টিকেট প্রিন্টিং প্রেস কলোনি বা টিপিটি কলোনির সুবিশাল এক বাংলোতে। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অন্তত চারটি নলকূপ। এসব থেকে প্রতিমাসে অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা আয় করছেন তিনি। যদিও এ আয়ের বিষয়ে অস্বীকার করেন বাবু।

তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ‘আবদার’ রাখতেই পানির ব্যবসায় জড়ান বলেও স্বীকার করেন বাবু। শুধু তাই নয়, ব্যবসা চালিয়ে যেতে স্কুলের সাইনবোর্ডও ব্যবহার করছেন তিনি। কিন্তু বিনিময়ে স্কুল কিছুই পাচ্ছে না। প্রতিমাসেই বিদ্যুৎ বিলের টাকাও গচ্ছা দিতে হচ্ছে স্কুলকে। যদিও এসব বিষয়ে বরাবরই নিরব স্বয়ং স্কুল কর্তৃপক্ষও।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিপিটি স্কুলের প্রবেশ গেটের পাশেই দশ হাজার গ্যালনের দুটি ট্যাংক রয়েছে। যাতে সর্বমোট ২০ হাজার গ্যালন পানি মজুদ রাখা হয়। দুই ট্যাংকের মাঝখানেই ছোট্ট টিনের ঘরের ভেতর বসানো হয়েছে গভীর নলকূপটি। যা থেকে পানি উত্তোলন করা হয়। আর পাম্পে বৈদ্যুতিক লাইন হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন স্কুলের মিটারও।
দেখভাল ও টাকা উত্তোলন করেন স্কুলের পিয়ন : প্রতিমাসে পানির টাকা উত্তোলন ও পানির নলকূপ দেখভাল করার জন্য নিয়োজিত রয়েছেন স্বয়ং টিটিপি স্কুলের পিয়ন মহসীন। যিনি শুরু থেকেই এই নলকূপ দেখভাল ও প্রতিটি বাসা থেকে টাকা উত্তোলন করে থাকেন। যার বিনিময়ে প্রতিমাসে মহসীনকে আট হাজার টাকা দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন বাবু। তবে বেতন কত পায় তা অস্বীকার করলেও স্কুলের পাশাপাশি নলকূপটি দেখাশোনার কথা স্বীকার করেন মহসীন।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমিই দেখাশোনা করি। পাঁচ/ছয় বছর থেকেই চালিয়ে আসছি। তবে বাবু ভাই যা দেয় তা দিয়ে মোটামুটি চলে’। কিন্তু স্কুলের কাজ কখন করে জানতে চাইলে মহসীন বলেন, ‘একসাথে দুটাই চালাই। মাঝেমাঝে স্কুলও চালাই, আবার এটাও চালাই। আর সন্ধ্যা সাতটার পরতো মেশিন বন্ধই থাকে’।
প্রতিমাসে আয় সাড়ে ৬ লাখ টাকা : রেলওয়ের আমবাগান কলোনি, ভাঙ্গারপুল, টিপিপি কলোনি থেকে শুরু করে ঝাউতলা কমিশনার লাইন পর্যন্ত একটি নলকূপ দিয়ে প্রায় আটশ পরিবারে পানি সরবরাহ করে থাকেন বাবু। যাদের কাছ থেকে প্রতিমাসে তিনি আটশ টাকা করে উত্তোলন করেন। শুধু তাই নয়, প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে লাইন চার্জ হিসেবে অগ্রিম ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকাও আদায় করা হয়েছে। যদিও এসব বিষয়ে অস্বীকার করেন বাবু।
জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্কুলের বাইরে মাত্র ৬০ থেকে ৭০টা বাসায় লাইন আছে। এর বাইরে নেই। তাদের কাছ থেকে ৭০০ টাকা করে খরচ নেই। যা পাই, তা সাথে সাথেই খরচ হয়ে যায়। আমার তেমন থাকে না’।

কিন্তু তথ্য আছে আটশ টাকা করে নেয়া হচ্ছে বলতেই, একটি কার্ড বের করে বলেন, ‘ও.. ঠিক আছে। আমার ভুল হয়েছে। আটশ’ টাকাই নেয়া হচ্ছে। আসলে আমি দেখিনাতো তাই জানি না।’
যদিও দেখভালের দায়িত্বে থাকা মহসীন জানায়, দুই শতাধিকের উপরে বাসা রয়েছে বলে তথ্য দেন। এমনকি প্রতিটি বাসা থেকে আটশ টাকা করে নেয়া হয় বলেও জানান তিনি’। তবে অনুসন্ধানে আট শতাধিক বাসার তথ্য পাওয়া গেছে।
হিসেব অনুযায়ী, শুধুমাত্র টিপিপির নলকূপের লাইন থেকে আটশ’ পরিবার থেকে আটশ’ টাকা করে উত্তোলন করলে প্রতিমাসে বাবুর আয় হয় ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আর বছরে এই আয় দাঁড়ায় ৭৬ লাখ ৪০ হাজার। গত ছয় বছরে তিনি আয় করেন প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এরবাইরে অগ্রিম নেয়া গড়ে পাঁচ হাজার টাকা হলেও আটশ’ পরিবারের কাছ থেকে গ্রহণ করেছেন ৪০ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে গত ছয় বছরে বাবুর আয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৮০ হাজার টাকা।
মিনিট হিসেবে পানি বিক্রি : প্রতিটি বাসায় মিনিটি হিসেবে পানি বিক্রি করা হয়। কোথায় পাঁচ মিনিট, কোথাও দশ কিংবা বিশ মিনিটি পানি সরবরাহ দেয়া হয়। আর এ মিনিট হিসেবেই টাকা আদায় করে থাকেন তারা। প্রতিদিন পাঁচ মিনিটি পানি সরবরাহ করা হলে মাসে আট’শ টাকা দিতে হয়। আর দশ মিনিটের উপরে দিলে এক থেকে ১২শ টাকা দিতে হয় পরিবারকে।

মহসীন বলেন, ‘একেক জায়গায় একেক সিস্টেম, কোথায় পাঁচ মিনিটি, কোথায় দশমিনিট আবার বিশ মিনিট দেয়া হয়। কমপক্ষে প্রতিদিন প্রতি বাসায় সাড়ে তিনশ থেকে চারশ লিটার পানি দেয়া হয়। তবে মোট কতটা বাসায় পানি দেয় তা বলতে রাজি না হলেও অনেক বাসায় দিয়ে থাকেন বলে জানান মহসীন। তিনি বলেন, যার যা প্রয়োজন তা হিসেবেই টাকা দিতে হয়।
বাবুর যত নলকূপ : টিপিটি কলোনি ছাড়াও বাবুর আরও চারটি নলকূপ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে। তাদের মধ্যে ওয়ার্লেস কলোনিতে একটা রয়েছে। যা নিজেই দেখভাল করে থাকেন। এছাড়া নিউ ঝাউতলা কলোনি, ডিজেল কলোনি, আমবাগানেও রয়েছে তিনটা। এরমধ্যে আমবাগানেরটি বাহার নামে একজন নিয়ন্ত্রণ করেন থাকেন। বাকিগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন আলম, হান্নান ও শাহাজান নামে তিনজন।
যদিও এসব নলকূপ থাকার কথা অস্বীকার করেন বাবু। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি ছাড়া আর কোন নলকূপ নেই আমার। এটাও আমি বসাতে চাই নাই। শুধুমাত্র স্কুলের কথা চিন্তা করেই বসানো হয়েছে। স্কুলতো আর অর্থায়ন করতে পারে না। তাই আমি নিজেই অর্থায়ন করেছি। এখন ছাত্রছাত্রীরা সুবিধা পাচ্ছে। বাইরেও কিছু পরিবার পানি পাচ্ছে। তারাও সুবিধা পাচ্ছে। একটা জিনিস হচ্ছে এই কলোনির বড় সমস্যা রেলের পানি না পাওয়া। তারা এক ফোটা পানিও দিতে পারে না’।
কিন্তু ডিজেল কলোনির নিজের পৈত্রিক বাসার পাশে যেটা আছে, তা স্মরণ করে দেয়ার পর তিনি বলেন, ‘ওটাতো বহু পুরানো। এটা নিজের জন্য করছিলাম, তারপর আশপাশে সংযোগ দিয়েছি। এখন যদি কেউ বলে, তাহলে বন্ধ করে দিব’।
যদিও টিপিপি ছাড়া বাবুর কয়টি ডিপ আছে জানতে চাইলে মহসীন বলেন, ‘বাবু ভাইর আরোও আনেকগুলো আছে, ডিজেল কলোনি লই পাহাড়িকা আবাসিকে পুরাটাই উনার। এই সাইটের দায়িত্ব আমার। ওনার অনেক ব্যবসা। বিভিন্ন সাইটে বিভিন্ন লোক দিয়ে চালায়। ওয়াসা কোন সময় ডিস্টার্ব করে না। চলতেছেতো। ব্যবসা ভালই হচ্ছে’।
ওয়াসার অনুমতি নেই : নলকূপ বসাতে হলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন হয়। ওয়াসা থেকে একটি লাইসেন্স নিতে হবে। কিন্তু বাবুর আওতায় থাকা চারটি নলকূপের একটিরও লাইসেন্স নেই।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে অনুমোদন নাই। স্কুলের সাইবোর্ডে চলে। স্কুল কেন্দ্রিক হওয়ায় কেউ কিছু বলে না। সবাই মনে করে এটা স্কুলের। এখন যদি কেউ কিছু বলে তাহলে আজকেই বন্ধ করে দেব।
অন্যগুলোর অনুমতি আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, ‘বাসার পাশের এটা অনেক আগের। তা ওয়াসা জানে। এর বাইরে আর কোন ডিপ নেই’।
কাউন্সিলরের আবদারে বসানো হয়েছে ডিপ : কিসের ভিত্তিতে টিপিপি কলোনির নলকূপটি বসানো হয়েছে জানতে চাইলে বাবু বলেন, ‘কাউন্সিলর সাহেব আবদার করেছে, একটা ডিপ বসাতে। তাই উনার আবদারেই এটি বসানো হয়’।
একদিন কাউন্সিলর আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘বাবু স্কুলের এতগুলো ছাত্রছাত্রী, পানির ব্যবস্থা করা যাইতেছে না। মহিউদ্দিন ভাই যেটা দিছে ওটাতো নষ্ট হয়ে গেছে। তুমি ডিপ বসাও। সাথে বাইরে ২/৪ টা লাইন দিবে। দেখবা আস্তে আস্তে সব হবে। তবুও দুই তিন মাস ঘুরাইছি’।
‘একদিন তিনি আবার ডেকে বলেন- বাবু আমার কথাটা তুমি রাখলানা। বল্লামতো দুই চারটা লাইন দিলে সব হবে। এরপর আমি করে দিলাম। উনার আবদারেই এটা বসাই’।
এ প্রসঙ্গে জানতে স্থানীয় কাউন্সিললের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি শহরের বাইরে রয়েছেন বলে জানা যায়। তারপরও মুঠোফোনে দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। যার কারণে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গভীর নলকূপ বসানোর প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘যে কোন নলকূপ করতে হলে ওয়াসার লাইসেন্স নিতে হবে। কিন্তু টিপিপি কিংবা পাহাড়তলী রেলওয়ের কলোনিগুলোতে কোন নলকূপ কিংবা ডিপ বসানো অনুমতিই নেই। তবে এ বিষয়ে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’।

The Post Viewed By: 243 People

সম্পর্কিত পোস্ট