চট্টগ্রাম সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

২০ জানুয়ারী, ২০২০ | ৫:৫৪ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোই লক্ষ্য

নৌ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সাথে বন্দর ব্যবহারকারীদের সভায় সবারই একই সুর হ মামলা-হামলা যাই হোক, কোন অবস্থাতেই কর্ণফুলী নদীর উচ্ছেদ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং বন্ধ রাখা যাবে না হ ৬ লক্ষ কোটি টাকার বাজেটে ভূমিকা থাকবে ব্যবসায়ীদের

নৌ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত দিতে পারবো এবং সুপারিশ করতে পারবো। কিন্তু সমাধান দিতে পারবে নৌ মন্ত্রণালয়। নৌ মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় নিজেদের মধ্যে বৈঠক করলে বন্দরের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দ্রুত সময়ে শেষ হবে। বন্দর কাস্টমস এখন বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। তাই এই দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করতে হবে। আর বিদেশি বন্দরগুলোতে কীভাবে কাস্টমস এর কাজ হয় সেগুলোর বিদেশে গিয়ে আমাদের কাস্টমস কর্মকর্তাদের ট্রেনিং নিয়ে আসতে হবে’।

ব্যবসায়ীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এবছরের বাজেট হবে ৬ লক্ষ কোটির বেশি। এতে বন্দর ব্যবহারকারী অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের ভূমিকা থাকবে’।
গতকাল রবিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে নৌ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সাথে বন্দর ব্যবহারকারীদের সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী ৫০বছরের কার্যক্রমের কথা মাথায় রেখে সাজানো হচ্ছে। ৫০ বছর পর বন্দরের উপর চাপ কেমন হবে তা এখই ভাবতে হবে। বন্দরের ভবিষ্যৎ কী হবে সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা মাফিক কাজ চলছে। এর পাশাপাশি পায়রা ও মংলা বন্দরকেও চট্টগ্রাম বন্দরের পরিপূরক হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা চলছে। যাতে বৈদেশিক বাণিজ্যে পথ আরো বিস্তৃত হয়’।

নিজেদের সমালচনা করে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। বন্দরের সাথে অনেকগুলো মন্ত্রণালয় জড়িত। তাই অনেক ক্ষেত্রে কোন জরুরি সিদ্ধান্ত নিতেও সময় লেগে যায়। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে যত ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় করতে হয় তার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া আছে। বে টার্মিনাল মিরসরাই পর্যন্ত করার প্রস্তাব করবো। এছাড়া বন্দরের জন্য ডেডিকেটেড সড়ক ও রেল পথ এর ব্যবস্থা করতে প্রস্তাব করবো। আর নদী নদী রক্ষা কমিশনকে কর্ণফুলী নদী রক্ষার জন্য প্রযোজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে করণীয় উদ্যোগ নিতে বলবো।’
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘বন্দরের সক্ষমতার ৬০ শতাংশ ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু আমরা ব্যবহার করছি প্রায় ৮০ শতাংশের উপরে। তাই কীভাবে বন্দরের উপর চাপ কমানো যায় তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিবো। আর আইএসপিএস পলিসি চেক করে বন্দরের নিরাপত্তা আরো জোরদার করা ব্যবস্থা করা হবে’। বন্দর চেয়ারম্যান আরো বলেন, বন্দরে এখন কনটেইনার আছে ৩২ হাজার টিইইউস। এর মধ্যে ১ হাজার দিন বয়সীও আছে। দ্রুত কনটেইনার না নিলে আইনের আশ্রয় নেবো আমরা। বর্তমানে বন্দরে ১৭টি জেটি আছে। আর নির্মাণাধীন আছে আরো ৬টি। জেটি তৈরি হবে চাহিদার ওপর’।

ট্রান্সশিপমেন্ট প্রসঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্টর ট্রায়াল রানের বিষয়ে কলকাতা বন্দর চেয়ারম্যান এবং আমি বন্দর চেয়ারম্যান আলোচনা করছি। নিয়ম মাফিক কাগপত্র ঠিক হলে দুটি ট্রায়াল রান তারিখ নির্ধারণ হবে।
সভায় চিফ হাইড্রোগ্রাফার কামান্ডার আরিফুর রহমান একটি বিশদ তথ্য চিত্র প্রদর্শনীতে জানান, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৭০ভাগ কন্টেইনার যায় রাজধানীতে। এর ৯৪ শতাংশ যায় সড়ক পথে এবং বাকি ৪শতাংশ যায় রেল পথে। একাজে বন্দরের প্রতিনিয়ত প্রচুর ট্রাক-ভ্যান প্রবেশ করে। শুধু গত বছরের ১৯ আগস্টই ৭ হাজার ট্রাক-ভ্যান বন্দরে প্রবেশ করেছে’।

বন্দরে খালি কন্টেইনার প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, ‘২০১৮ সালে বন্দরে ভেতরে কন্টেইনার ছিল ১৪ লক্ষ ২১হাজার ৪৩৯ টিইইউএস। এর মধ্যে শুধু খালি কন্টেইনার ছিল ৭ লক্ষ ১হাজার ২৯৪ টিইইউস। এই খালি কন্টেইনারগুলো বন্দরের উপর অযথা বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তাই আমদানিকারকদের উচিত হবে যত দ্রুত সম্ভব খালি কন্টেইনার বন্দর থেকে বের করে নেওয়া’।
বন্দরের ভেতরের পরিত্যক্ত অকশন শেড প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, ‘বন্দরের ভেতরে একটি অকশন গোলা পরিত্যাক্ত অবস্থায় আছে। এটি ভেঙে কন্টেইনার ইয়ার্ড নির্মাণ করা গেলে বন্দরের সক্ষমতা আরো কিছু বাড়বে’।
চট্টগ্রাম চেম্বারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বে-টার্মিনাল নির্মানে একটি নির্দিষ্ট টাইম ফ্রেম থাকা দরকার। এর কোন কাজ কখন শেষ হবে তা পরিষ্কার করা দরকার। কারণ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বে-টার্মিনালের কোন বিকল্প নেই। আর দেশের সড়ক পথের অবকাঠামো উন্নয়নের করা ছাড়া ট্রান্সশিপমেন্ট সফল হবে না। এজন্য ঢাকা-চট্টগ্রামের সড়ক চার লেনের পরিবর্তে আট লেইন করা দরকার। সেই সাথে দ্রুত আউটার রিং রোডের কাজ শেষ করা দরকার’।
কর্ণফুলী নদী প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণ হলো কর্ণফুলী নদী। তাই ক্যাপিটাল ড্রেজিংএর কাজ কোন ভাবে বন্ধ রাখা যাবে না। মামলা-হামলা যাই হোক, কোন অবস্থাতেই কর্ণফুলী নদীর উচ্ছেদ ও ক্যাপিটাল ড্রেজিং বন্ধ রাখা যাবে না। আর চট্টগ্রামে কোন ট্রাক টার্মিনাল নেই। যার কারণে যেখানে সেখানে রোডের মধ্যে ট্রাক রাখতে হয়। যার ফলে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট’।

আলোচনা সভায় বিজিএমইএর প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম বলেন, ‘২০২১ সলে বাংলাদেশ ৫০ বিলিয়ন ডলার এক্সপোর্ট-এ যাবে এমন আশা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। কারণ এবারই প্রথম আমরা ৬/৭শতাংশ নেগেটিভ এক্সপোর্ট করেছি। আমরা যে হোঁচট খেয়েছি সেটি থেকে এখনই শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন’।
বন্দর প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘বন্দরের কস্ট ও লিড টাইম কমাতে হবে। আর বন্দর থেকে রেলওয়ে পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা করতে না পারলে প্রয়োজনে বেসরকারি খাতে নিয়ে যেতে হবে রেলওয়েকে’।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সহ-সভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে আরো বার্থ অপারেটর নিয়োগ করা প্রয়োজন। আর বার্থ অপারেটর ও শেড অপারেটর আলাদা করতে হবে। যাতে কারো হাতে জিম্মি না থেকে নিজ পছন্দে অপারেটর বেছে নেওয়া যায়। আর পুরো বন্দরের ভেতরের সব জায়গা সিসিটিভি’র আওতায় আনতে হবে। অনলাইনে কন্টেইনার ইনডেন্ট এর ব্যবস্থা করতে পদক্ষেপ নিতে হবে। আরএমজি সেক্টরের জন্য পোর্ট চার্জ কমাতে হবে’।
সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু বলেন, ‘বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এর জন্য অপারেটর নিয়োগ এবং লেবার নিয়োগে আলাদা টেন্ডারের ব্যবস্থা করতে হবে। আর বন্দরের নিজস্ব লোকবল বাড়াতে হবে। জেটি, ইয়ার্ড ও ইক্যুইপমেন্ট বাড়াতে হবে’।
শিপিং এজেন্ট এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরী এবং পরিচালক শাহেদ সরওয়ার বলেন, ‘অকশন নিয়ে বন্দর ও কাস্টমস এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা আছে। এটি কমাতে হবে। আর বন্দরের ভেতরে দীর্ঘদিন আটকে থাকা রিফার কন্টেইনারের বিদ্যুৎ বিল শিপিং এজেন্টকে দিতে হয়। নিয়ম না থাকলেও অনেকটা জোর করেই এই বিল আমাদের কাছ থেকে আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। এটি সংশোধন করা দরকার’।
তারা আরো দাবি জানান, ‘বন্দরের বার্থিং ডিলে কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আর প্রতি বছর লেবার কস্ট যাতে ১০ শতাংশ যাতে না বাড়ানো হয় সেজন্য যা করা দরকার করতে হবে’।

এদিকে বন্দরের বার্থ অপারেটর বাড়ানো ব্যাপারে ভিন্নমত জানিয়ে বার্থ অপারেটর এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ফজলে ইকরাম বলেন, ‘বন্দরে বার্থ অপারেটর আছে ১২টি। আর জাহাজ বার্থ করা যায় মাত্র ১৩টি। তাহলে কেন শুধু শুধু বার্থ অপারেটর বাড়াতে হবে’। তিনি আরো বলেন,
বাফার পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, বন্দরে রপ্তানি কন্টেইনার স্ক্যানিং সঠিকভাবে হচ্ছে না। স্ক্যানিং না হলে রপ্তানি কার্গো যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টে জটিলতা তৈরি করবে। তাই জরুরিভিত্তিতে স্ক্যানিং মেশিন বাড়াতে হবে। আর এলসিএল পণ্যের জন্য বন্দরের বাইরে শেডে আনার সুযোগ দিতে হবে। হেজার্ড কার্গোর কনটেইনার রাখার জন্য ডাম্পিং শেড দেওয়া যেতে পারে।

এদিকে সভায় উপস্থিত কাস্টমসের সহকারী কমিশনার বলেন, ৯৮ শতাংশ পণ্য পরীক্ষা ছাড়াই যাচ্ছে। গোপন সংবাদ থাকলে কনটেইনার লক করা হয়। দিনে এ ধরনের ৪-৫টি কনটেইনারের বেশি নয়। শুল্কায়ন ২৪ ঘণ্টা চললেও জেটিতে হচ্ছে না।
সাভায় সংসদীয় কমিটির সদস্য রণজিৎ কুমার রায়, মাহফুজুর রহমান, ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, এসএম শাহজাদা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুছ ছাত্তার, উপ সচিব বেগম মালেকা পারভীন, ড. দয়াল চাঁদ মন্ডল, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উপ পরিচালক আবদুল জব্বার, সিনিয়র সহকারী সচিব এসএম আমিনুল এবং বিকেএমইএ’র পরিচালক মোহাম্মদ হাছান।

এছাড়া মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ, সদস্য (প্রশাসন) মো. জাফর আলম, সদস্য (প্রকৌশল) ক্যাপ্টেন মহিদুল হাসান চৌধুরী, সদস্য (হারবার এন্ড মেরিন) কমডোর শফিউল বারী, চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান, সচিব মো. ওমর ফারুক, ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান, উপ সচিব আজিজুল মওলা প্রমুখ।

The Post Viewed By: 191 People

সম্পর্কিত পোস্ট