চট্টগ্রাম সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

১৮ জানুয়ারী, ২০২০ | ৪:০১ পূর্বাহ্ন

সারোয়ার আহমদ

সম্ভাবনার সাথে চ্যালেঞ্জও

বাংলাদেশের সুবিধা আদায়ে প্রয়োজন জোরালো কূটনীতি

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভারতের পণ্যে ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলে বৈদেশিক বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। অবশ্য এজন্যে অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ট্রান্সশিপমেন্ট থেকে যৌক্তিক ও পূর্ণ সুবিধা আদায় করতে হলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক পদক্ষেপ জোরালো করতে হবে। বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংগঠন, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ বন্দর সংশ্লিষ্টরা এমনই মত দিয়েছেন। তারা দৃঢ় আস্থার সঙ্গে বলেছেন, দাবি আদায়ের কৌশল জানলে ট্রান্সশিপমেন্ট ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন ‘জুজু’র ভয় নেই।
বিভিন্ন সময়ে একাধিক দ্বি-পাক্ষিক বৈঠক ও কূটনৈতিক আলোচনার পর অবশেষে ভারত-বাংলাদেশ ট্রান্সশিপমেন্ট পদ্ধতিতে পণ্য পরিবহন করতে যাচ্ছে। যার ট্রায়াল রান হিসেবে চলতি মাসেই দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রান্সশিপমেন্ট পদ্ধতিতে পণ্য ভারতে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে বন্দর সূত্র বলছে, চলতি জানুয়ারিতে দুটি জাহাজ ট্রায়াল শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। কি ধরনের কতটুকু পণ্যবাহী জাহাজ ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য আসবে সে নির্দেশনা এখনো আসেনি।

কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়ে বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি এম এ সালাম পূর্বকোণকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় কূটনৈতিক আলোচনায় অবশ্যই পিছিয়ে আছে। যার কারণে ট্রান্সশিপমেন্টে বন্দর ব্যবহারে চার্জের বিষয়টি ব্যবসায়ী মহলে এসেছে, মিডিয়ার মধ্যে এসেছে এবং জনগণের মধ্যেও আসবে। আর আমাদের এটাও ভাবতে হবে বন্দরের পাশাপাশি ট্রান্সশিপমেন্টে ভারত বাংলাদেশের সড়ক পথও ব্যবহার করবে। ফলে সড়কের উপরেও একটা চাপ আসবে। আর সেটির আর্থিক মূল্য থাকা উচিত। আমাদের চিন্তা করা উচিত আমরা তার কতটুকু পাচ্ছি’।

তিনি আরো বলেন, ‘পৃথিবীর অনেক দেশই ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ভাল আয়ের সুযোগ করে নিয়েছে। আমাদেরও সেই সুযোগটা আছে। সেটি কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যে ঠিক করে নিলে বাংলাদেশ লাভবান হবে’।

এদিকে কোলকাতা থেকে গোহাটিতে পণ্য যেতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ হয়ে সেই পণ্য গেলে খরচ হবে মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ। যার একটি অংশ বাংলাদেশ পাওয়ার যৌক্তিক দাবি রাখে বলে মন্তব্য করে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স এসোসিয়েশন (বাফা)’র সিনিয়র সহ-সভাপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরী মিজান বলেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্টে ভারতের সময় এবং অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। পৃথিবীময় এই ধরনের সুবিধা প্রদানকারী দেশকে তিন ভাগের একভাগ রয়ালিটি দেওয়ার নিয়ম চালু থাকলেও ভারত-বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্টের স্ট্যান্ডিং অফার এগ্রিমেন্টে সেই বিধান নেই’।
বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসঙ্গে আমিরুল ইসলাম চৌধুরী মিজান আরো বলেন, ‘প্রতিটি দেশ তার নিজের স্বার্থ দেখবে। ভারত তার নিজের দেশের স্বার্থ দেখছে, কিন্তু আমার জানা মতে আমাদের দেশের স্বার্থ দেখার মত কেউ নেই। তাই এখনই এসব বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। ট্রান্সশিপমেন্টে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের চার্জ দেশীয় বন্দর ব্যবহারকারীদের সমান রাখা হলে ভারতের পণ্য পরিবহনে যে বিপুল অর্থ সঞ্চয় হবে তার একটি অংশ বাংলাদেশ যৌক্তিকভাবে পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু এই ব্যাপারে আমাদের আলোচনা হয়নি। সরকারের উচিত হবে ট্রান্সশিপমেন্ট চালু করার আগে এটি বিবেচনা করা’।

আমদানির পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ আমলে নেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের লৌহজাত পণ্য যেমন রড এবং সিমেন্ট ভারতে রপ্তানি হতে পারে। সেই সুযোগ কিন্তু আছে। তবে এজন্য আলোচনা বসতে হবে’।

এদিকে, ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর ও দেশের সড়কের অবকাঠামো প্রসঙ্গে চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে বাস্তবিক কথা হলো বন্দর সেবা দিতে কতটুকু প্রস্তুত। সেই প্রস্তুতিটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরে এখন জেটি আছে ১৯টি। কিন্তু আমাদের বরাবরই দাবি ছিল জেটি ৬০টি করা হোক। তাহলে জাহাজ বার্থিং দিতে সমস্যা হবে না। আর বার্থিং দিতে পারলে বন্দরের আয় হবে, সরকারেরও আয় হবে। তাই সেবা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে’।
তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক এখন চার লেন। কিন্তু আমরা বার বার বলেছি এই সড়ক আট লেন করতে হবে। আর ভারী যান চলাচল উপযোগীও হতে হবে। সড়কের অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে চলাচল বাড়বে। এতে দেশের ব্যবসার পাশাপাশি ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশেরও ব্যবসা বাড়বে। এতে আমরাও লাভবান হব। তাই অবশ্যই অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই’।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, ‘বর্তমানে বন্দরে অবকাঠামোগত যথেষ্ট সুযোগ সুবিধা রয়েছে। বন্দরের যেসব ইকুইপমেন্ট রয়েছে সেগুলো দিয়েই আমরা ট্রান্সশিপমেন্টের পণ্য হ্যান্ডেল করতে প্রস্তুত আছি। ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রে বার্থিং প্রায়োরিটি দেওয়ার ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। বন্দরের বার্থিং নীতিমালা অনুযায়ী ট্রান্সশিপমেন্টের জাহাজকেও একইভাবে বার্থিং দেওয়া হবে। আর চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের জন্য অন্যান্য ক্ষেত্রে যে হারে রিভার ডিউস, ল্যান্ডিং ও হোস্টিং চার্জসহ আরো যেসব চার্জ পেয়ে থাকে, সেই একই চার্জ ট্রান্সশিপমেন্টের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে’।

ট্রান্সশিপমেন্ট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘ট্রান্সশিপমেন্টে কার্গোগুলো বা কন্টেইনারগুলো জাহাজ থেকে নামিয়ে একটি নির্দিষ্ট স্লটে বা জায়গায় রাখতে হয় বন্দরের ভেতরেই। দেখতে হবে এই পরিমাণ জায়গা বন্দরের আছে কিনা। বর্তমানে যতটুকু যায়গা আছে তাতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। তাই বন্দরের খুব দ্রুত কিছু জায়গা সম্প্রসারণ করা দরকার। ইয়ার্ড বৃদ্ধি করা দরকার। যাতে ট্রানজিট কার্গোগুলো একোমোডেট করতে পারে’।
তিনি আরো বলেন, ‘পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল এবছরের মধ্যে শুরু হবে বলে শুনেছি। সেখানে চারটি জাহাজ বার্থিং এর ব্যবস্থাও থাকবে। এই টার্মিনালের কাজ দ্রুত শেষ করে চালু করা গেলে জাহাজ জট কমে আসবে এবং ট্রান্সশিপমেন্টেও আর সমস্যা থাকার কথা না’।

The Post Viewed By: 128 People

সম্পর্কিত পোস্ট