চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১৯ মে, ২০১৯ | ২:১১ অপরাহ্ণ

পূর্বকোণ ডেস্ক

এবার বিলুপ্তির কাতারে মানুষ: হারিয়ে যাচ্ছে এস্কিমোরা

সভ্যতার বিলাসিতা বাড়ছে, বাড়ছে পরিবেশের তাপমাত্রা। বাড়তে থাকা সেই তাপে গলছে মেরুর বরফ, মারা যাচ্ছে সিলমাছ। খাবারের অভাবে ধুঁকে মরছে শ্বেত ভালুক। এই মৃত্যুর তালিকায় এর পরের নামটি মানুষের। যাদেরকে আমরা এস্কিমো নামে চিনি।

আমেরিকায় আইন করে বাতিল করা হয়েছে এস্কিমো শব্দটি। যার আক্ষরিক অর্থ হল, ‘কাঁচা মাংসখেকো’। মেরু অঞ্চলের প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলোর পরিচয় তাই ইনুইট হিসেবে। রিগোলেট ছাড়াও, আলাস্কা, গ্রিনল্যান্ড, সাইবেরিয়ার দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় এই ইনুইটদের দেখা যায়। তাদের জীবনযুদ্ধকে নাম পরিচয়ের স্বীকৃতি দিলেও সেই জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য পরিবেশ দূষণ কমানোর কোন ব্যবস্থা অবশ্য নেয়া হয়নি এখনও।

কানাডার পূর্ব কোণের এক ছোট্ট শহর রিগোলেট। মাত্র তিনশো মানুষকে নিয়ে গড়ে ওঠা এই শহরের তাপমাত্রা সারা বছরই থাকে হিমাঙ্কের নীচে। পৃথিবীর দক্ষিণতম এই শহরে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের উপায় হলো প্রচণ্ড ঠান্ডায় শহর এবং আশপাশের পুকুর-লেক-নদীর জল জমে গিয়ে তৈরি হওয়া পৃথিবীর এক দূর্গমতম প্রাকৃতিক হাইওয়ে। এই হাইওয়ে দিয়েই জীবনযাপনের অতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বহন করে ইনুইটরা। তবে সেই একমাত্র পথটিও এখন

বরফ গলার ফলে ক্রমেই নড়বড়ে আর ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারতেন ইনুইটরা, সেখানে ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে ফাটল, জায়গায় জায়গায় কমছে বরফের ঘনত্ব। স্লেজ-গাড়ি দিয়ে যাতায়াত হয়ে উঠছে বেশ বিপজ্জনক।

এমন একটা সময়ে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা, যেখানে ঠান্ডার অভাবে ইনুইটদের বাঁচা সত্যিই মুশকিল হচ্ছে! সাম্প্রতিক গবেষণা ও তথ্য বলছে, বিশ্ব জুড়ে উষ্ণায়ণের ফলে মেরু প্রদেশের বরফ যত গলছে, ইনুইটদের জীবনও তত বিপন্ন হচ্ছে। বরফ খুঁড়ে তাঁরা তৈরি করতে পারছেন না তাঁদের প্রাকৃতিক বাসগৃহ ইগলু। আবার বাড়ি বানানোর মালমশলা নিয়ে আশাও দায় হয়েছে হাইওয়ের খারাপ অবস্থার জন্য।

ইনুইটদের খাদ্যাভ্যাসও রীতিমতো সঙ্কটে। দীর্ঘদিন ধরে বেশি মাত্রার প্রাণিজ প্রোটিনে আর চর্বিসমৃদ্ধ খাবারে অভ্যস্ত এই সম্প্রদায় দ্রুত তাদের খাদ্যাভ্যাস বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে এক দিকে যেমন দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক অসুখ, পাশাপাশি তাঁরা শিকার হচ্ছেন নানা মানসিক সমস্যারও। এমনকী এই ইনুইটদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা!

ইনুইটদের খাদ্যতালিকার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মেরু ভালুক, সিল মাছ, বিভিন্ন ধরনের অন্য মাছ, বরফের পাখি আর কয়েক ধরনের তিমি মাছ। এদেরও প্রাকৃতিক বাসস্থান বরফই। সেই বরফ কমে যাওয়ায় ভাল নেই তারাও। উষ্ণায়ণের নির্মম শিকার তাদের জীবনও। শহরের গাছ কমে যাওয়ার ফলে যেমন হারিয়ে যাচ্ছে পশুপাখিরা, মেরুদেশের বরফ কমে যাওয়ার ফলেও তেমনই আশঙ্কা জনক হারে কমছে সাদা ভালুক, সিল মাছের সংখ্যা। সম্প্রতি ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের করা একটি ভিডিওচিত্রে দেখা গিয়েছে, কানাডার বাফিন দ্বীপে কী ভাবে না খেতে পেয়ে তিলে তিলে মারা যাচ্ছে একটি মেরু ভালুক।

মূলত সিল মাছের উপরে নির্ভর করেই বেঁচে থাকে এই মেরু ভালুকেরা। এ দিকে বরফের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সিলের বাসস্থান আর প্রজননক্ষেত্র। ফলে সংখ্যা কমছে তাদের। আর না খেতে পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মেরু ভালুক। যার জেরে সমস্যায় পড়ছেন ইনুইটরাও। তাঁদের গোটা খাদ্যশৃংখলই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে।

বিশ্ব জুড়ে তাপমাত্রা বাড়ার এই সমস্যার সরাসরি ক্ষতির প্রভাব যতটা গাছপালা, পশুপাখির উপরে পড়েছে, মানুষের উপরে এখনও ততটা নয়। কিন্তু এই ইনুইটরা ব্যতিক্রম। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বিষয়টা নিয়ে আমরা কম-বেশি সকলেই জানলেও, এটা জানি না যে এই বিপর্যয়ের সব চেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন ইনুইটরা। বরফ গলে যাওয়ায় মেরু অঞ্চলে রীতিমতো ধুঁকছে তাঁদের জীবন। এখনই যদি এই উষ্ণায়ণকে নিয়ন্ত্রণ করার পদক্ষেপ সারা বিশ্ব জুড়ে শুরু না হয়, তা হলে পৃথিবীর একটা বড় অংশ থেকে হারিয়ে যাবে মানুষ। সেই হারিয়ে যাওয়ার তালিকায় সবার আগে ইনুইটদের নামটাই উঠছে।

বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার ফলে ধ্বংসের একদম কিনারায় দাঁড়িয়ে এই বরফের মানুষগুলি। বরফ গলে গেলে আমরা উষ্ণ অঞ্চলের মানুষেরাও কতদিন টিকে থাকবো তাও অবশ্য ভাববার বিষয়!

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট