চট্টগ্রাম বুধবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২০

১৫ জানুয়ারী, ২০২০ | ৩:৩৭ পূর্বাহ্ন

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

এক বছরে ভোট কমেছে ৫৪ শতাংশ

নির্বাচনকে অবিশ্বাস, অনীহা ও ভীতিকর অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে : প্রফেসর সিকান্দর খান

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পশ্চিম কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয় (পুরুষ ও মহিলা) ভোটকেন্দ্রে গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শতভাগ ভোট পড়েছিল। নৌকা পেয়েছিল ২৪৮৫ ভোট। ধানের শীষ পেয়েছিল ৭৩৬ ভোট। এক বছর পর উপনির্বাচনে এই কেন্দ্রে ভোটের হার নেমে এসে দাঁড়ায় ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমদ পান এক হাজার ৬৭২ ভোট। আর ধানের শীষ পেয়েছে মাত্র ১১ ভোট। এটি মোছলেম উদ্দিনের পাড়ার কেন্দ্র। সেই হিসাবে মোছলেম উদ্দিন আরও বেশি ভোট পাওয়ার কথা ছিল।

শুধু তাই নয়, মোছলেম উদ্দিনের একই এলাকার পাঠানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গত নির্বাচনে নৌকা ভোট পেয়েছিল ১৮০১ ভোট। ধানের শীষ পেয়েছিল ৮৫৭ ভোট। ভোটের হার ছিল ৭৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। উপনির্বাচনে নৌকা পেয়েছে ১৪৬১ ভোট। ধানের শীষ পেয়েছে ৪২ ভোট। এলাকার টানে এই কেন্দ্রেও নৌকা আরও বেশি ভোট পাওয়ার দাবিদার।

এছাড়াও নগরীর পাঁচলাইশের এয়ার আলী হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ ভোট পড়েছিল। উপনির্বাচনে ভোট পড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। শহীদপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গত নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৯৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। উপনির্বাচনে পড়েছে ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। মুরাদপুর মূক ও বধির বিদ্যালয়, জহুর আহমদ চৌধুরী সিটি করপোরেশন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আরবান হাসপাতাল কেন্দ্র, আমিন জুটমিল অফিসার্স ক্লাব কেন্দ্রেও শতভাগ ভোট পড়েছিল। উপনির্বাচনে জহুর আহমদ সিটি করপোরেশন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, মূক ও বধির কেন্দ্রে ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ, আমিন জুটমিল অফিসার্স ক্লাবে ১৫ দশমিক ৩০ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শতভাগ ভোট পড়ার বিষয়ে সিইসি কে এম নূরুল হুদা বলেছিলেন, ‘শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়।’ ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গত ১৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এক বছরের মাথায় ভোটের হার অস্বাভিক কমে গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। এক বছর পর উপনির্বাচনে ভোটের হার হচ্ছে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে ভোটের হার কমেছে ৫৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। তবে এটি হচ্ছে উপনির্বাচন। এই ভোটে ক্ষমতার পটপরিবর্তন বা সরকারের পালাবদলের কোনো সুযোগ ছিল না। তাই ভোটের হার কম ছিল বলে নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রামের সভাপতি প্রফেসর সিকান্দর খান ভোটের হার কমে যাওয়ার বিষয়ে বলেন, ‘উপনির্বাচন বলে সরকার পরিবর্তনে যোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করেনি ভোটাররা। তাই ভোটার উপস্থিতি কম ছিল বলে মনে হচ্ছে।’ তবে গত নির্বাচনের চেয়ে আশাব্যঞ্জক হচ্ছে, এই নির্বাচনে প্রচার-প্রচারনায় প্রার্থী ও কর্মীরা মাঠে ছিল। বিরোধীদলের মধ্যে উৎসাহ কাজ করেছে। ভোটে হাল ছেড়ে দিয়ে অর্ধেক পথে উঠে যায়নি। এজেন্ট দিতে পেরেছে। আগের নির্বাচনে তো সেই সুযোগ পায়নি।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৭৬ দশমিক ৭২ শতাংশ। আর উপনির্বাচনে ভোটের হার নেমে এসেছে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশে। এক বছরের মাথায় এসে ৫৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি। এই আসনে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৬২ শতাংশ। নির্বাচনপ্রতি ভোটের হার অস্বাভাবিকভাবে কমে আসছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিল।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, অপরাজনীতি, ভয়-ভীতি, আতঙ্ক আর অবিশ্বাসের কারণে দিন দিন ভোটের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। আর নির্বাচন কমিশনের দাবি, ইভিএম ছিল নতুন কনসেপ্ট। হয়তো তাই ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।
উপনির্বাচনে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যালট পেপারে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ৬টি আসনে ইভিএম মেশিনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ করা হয়েছিল। ভোটের হার ছিল ৬২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর ৬টি আসনে গড়ে ছিল ৫১ দশমিক ৪২ শতাংশ। সবচেয়ে কম ছিল ঢাকা-১৩ আসনে। ভোটের হার ছিল ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনের শহীদনগর সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোটভর্তি স্বচ্ছ ব্যালটবাক্স দোতায় নিয়ে যাওয়ার একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল বিবিসি বাংলায়।

২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাচনেও ইভিএম মেশিনে ভোট গ্রহণ করা হয়। এই নির্বাচনে ভোটের হার ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ।
২০১১ সালে সীমিত আকারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬টি আসনে ইভিএমের মাধ্যমে প্রথমবার ভোট গ্রহণ করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশন কে এম নূরুল হুদা ইভিএম ব্যহারের বিষয়ে বলেছিলেন, ‘ইভিএম ব্যবহার করলে রাতের ভোটের সমস্যা এড়ানো যাবে।’
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার মুহাম্মদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘ইভিএম আমাদের নতুন কনসেপ্ট। তাই আমরা ইভিএম প্রদর্শন ও মক ভোটিং করেছি। ভোটাররা আসেনি। তাই মনে হয়, ভোটের হার কম ছিল।’ এছাড়াও বৈরী আবহাওয়ার কারণেও ভোটের হার কম ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে ঘটনা প্রবাহ ভোটের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন ভোটাররা। একসময়ে ভোট ছিল উৎসবের, আনন্দ-উল্লাসের। এখন ভীতি-শঙ্কা আর আতঙ্কে পরিণত হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক এডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে মানুষের মধ্যে একটা ধারণা থাকে, ভোট দিলেও জিতবে, না দিলেও জিতবে। তাই ভোটের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম ছিল।’
নির্বাচন নিয়ে গবেষণা করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সুজনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইভিএমে ভোট ও ভোটের হার দুটিই কমে আসছে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে (১৫ জানুয়ারি ২০১৯) বলেছিলেন, ‘নির্বাচন আচরণবিধি ব্যাপক লঙ্ঘনের কারণে নির্বাচন অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য হিসেবে আলোচিত হয়েছে।
সুজনের সম্পাদক এডভোকেট আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব। কিন্তু অতীতের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে না পারা, ভোট দিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়া, রাতে ব্যালটে সিল মারা-নানা কারণে ভোটের প্রতি মানুষের মধ্যে ভীতি আর অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্ক আর অবিশ্বাস দেখা দিয়েছে।’
নাগরিকদের প্রতিনিধি নির্বাচনের একমাত্র মাধ্যম নির্বাচন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে মানুষের মধ্যে অপ্রিয়, অবিশ্বাস, অনীহা, আতঙ্ক, ভীতিকর অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।’ ইভিএমের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, ‘বুথের মধ্যে বিশেষ দলের লোকজন টিপে দিচ্ছে। একই ঘটনার যে পুনরাবৃত্তি ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে। ভোটকে মানুষ এখন আর উৎসব মনে করে না। আগ্রহ, আন্তরিকতা ও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। ২২ দশমিক ৯৪ হওয়ার এটাই কারণ। এটা একটি অশনিসংকেত।’

ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন বলেছেন, ‘ইভিএম পদ্ধতিতে সকলের উৎসবমুখর পরিবেশ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়েছে। ইভিএম সঠিক ছিল, তা প্রমাণিত হয়েছে। মানুষ তা গ্রহণ করেছে। উপনির্বাচনে সাধারণত আগ্রহ কম থাকে।’

The Post Viewed By: 106 People

সম্পর্কিত পোস্ট