চট্টগ্রাম রবিবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২০

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:১৩ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব সংবাদদাতা হ চবি

একমাসে ভুক্তভোগী চবির ৪ ছাত্রী গণপরিবহনে যৌন হয়রানি

গত ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যা। সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে করে পটিয়া থেকে নগরীতে আসছিলেন জেরিন জান্নাত বিথি। বহদ্দারহাট নতুন চান্দগাঁও থানার সামনে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয় বাসটির কন্ডাক্টর। তখন ওই ছাত্রী নামতে চাইলে তাকে গন্তব্যস্থল নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় নামিয়ে দেওয়ার কথা বলে সিটে বসতে বলে কন্ডাক্টর। তবে দুই কন্ডাক্টরের দৃষ্টিভঙ্গি ও ড্রাইভারকে অনিয়ন্ত্রিত গাড়ি চালাতে দেখে সন্দেহ জাগে ওই ছাত্রীর। তৎক্ষণাৎ তিনি নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেই বাধে বিপত্তি। তিনি ৯৯৯ নম্বরে ডায়াল করতে চাইলে কন্ডাক্টর এসে ওই ছাত্রীর হিজাব ধরে টানাটানি শুরু করে এবং ধাক্কাধাক্কি ও চড়-থাপ্পড় মারে। তাকে একপ্রকার জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা করে দুই কন্ডাক্টর। এ সময় লাথি মেরে ওই ছাত্রী এক কন্ডাক্টরকে ফেলে দেন এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকেন। বিষয়টি আশপাশের মানুষের নজরে আসায় চালক বলে ওঠে, অবস্থা সুবিধার না, ফেলে দে। তখন গাড়ির গতি কিছুটা কম থাকায় ছাত্রীটি লাথি মেরে বাসের দরজা খুলে লাফ দেন। শুধু এ একটি ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে এ রকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে যৌন হয়রানির মাত্রা ভয়াবহ রুপ ধারণ করেছে। শুধু গত এক মাসে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের চারজন ছাত্রী চলন্ত বাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

গণপরিবহনে যৌন হয়রানির এই চিত্রকে ‘চরম উদ্বেগজনক’ বলছেন সমাজবিজ্ঞানী, মানবাধিকারকর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তারা। পরিস্থিতির উন্নতিতে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগের ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আড়াই বছরে দেশের বিভিন্ন গণপরিবহনে ৫৩টি বড় ধরনের নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে খোদ চট্টগ্রামে ঘটেছে প্রায় ৮টি। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটছে আরেকটি ঘটনা। এসব অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তির ফলে নারীরা গণপরিবহনে কতটা নিরাপদ তা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনি বিভিন্ন প্রয়োজনে ঘরের বাইরে চলাফেরা করা নারীরাও দিন দিন আতঙ্কিত হয়ে উঠছেন।

সর্বশেষ গতকাল (শনিবার) ক্যাম্পাস থেকে শহরে যাওয়ার পথে এক যাত্রী কর্তৃক যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের এক ছাত্রী। এ ঘটনায় অভিযুক্ত যাত্রী জামাল উদ্দিনকে আটক করে হাটহাজারী পুলিশ। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদ- দেন।
এর আগে ৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে যাত্রীবাহী বাসে যৌন হয়রানির চেষ্টা করেন এক যাত্রী। পরে মানিক মিয়া নামে ওই যাত্রীকে ছয় মাসের কারাদ- দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ছাড়া গত ২৭ নভেম্বর পটিয়া থেকে ফেরার সময় যাত্রীবাহী বাসে আরও এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির চেষ্টা করেন চালকের দুই সহকারী। ঘটনার দুই দিন পর তাদের আটক করা হয়।
এদিকে পরিবহন মালিক বলছেন, শ্রমিকদের নিয়ে কাউন্সিলিং, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অনুভূতি জাগ্রতকরণ এবং ডিউটিরত অবস্থায় নারীদের যৌন হয়রানির মতো অভিযোগ উঠলে ওই পরিববহন প্রতিষ্ঠান থেকে অভিযুক্তকে বহিষ্কার ও শাস্তির ভয় দেখিয়েও কোনো কাজ হচ্ছে না। থামছে না গণপরিবহনে নারী লাঞ্ছনার ঘটনা।

চট্টগ্রাম মেট্্েরাপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘গত কয়েক মাসে কয়েকজন নারী পরিবহনে যৌন হয়রানির শিকারের ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের আমরা বয়কট করেছি’।
তিনি বলেন, ‘এসব ঘটনায় আমরা লজ্জিত বোধ করছি। এ নিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে মালিক পক্ষের দফায় দফায় মিটিং ও কাউন্সিলিং চলছে। আমরা ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছি। একই সাথে চালক ও হেলপারদের পরিচিতি কার্ড সঙ্গে রাখার নির্দেশ দিয়েছি। এছাড়া চালকদের গাড়ির ভেতরে গাড়ির নম্বর রাখারও নির্দেশনা দেওয়া আছে। যাতে এ ধরনের হেনস্থার শিকার যেকেউ তাৎক্ষণিক ‘৯৯৯’ এ কল দিয়ে অভিযোগ দিতে পারেন’।

চট্টগ্রামে গত কয়েক মাসে যৌন হয়রানির যে তথ্য পাওয়া গেছে তা ‘উদ্বেগজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনিরুল হাসান। যৌন হয়রানির মতো অপরাধের প্রবণতা বাড়ার পেছনের কারণ সম্পর্কে তিনি র্প্বূকোণকে বলেন, ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক সমস্যা। সামাজিকতা, মূল্যবোধ ও আইনের শাসনের অভাবের কারণে আমাদের সমাজে যৌন হয়রানির ঘটনা বেড়ে চলছে। তবে আগেও যৌন হয়রানির ঘটনা আমাদের সমাজে বিদ্যমান ছিল। সে সময় হয়তো তা প্রকাশ পেত না। এখন আমাদের মেয়েরা তা প্রকাশ করছে’।

তিনি আরো বলেন, ‘যৌন হয়রানির মতো অপরাধ প্রবণতা রুখতে হলে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পারিবারিক অনুশাসন এবং মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্ক বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত কঠোর শাস্তির মধ্যে দিয়ে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে’।

The Post Viewed By: 143 People

সম্পর্কিত পোস্ট