চট্টগ্রাম সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:৫৫ পূর্বাহ্ন

সুকান্ত বিকাশ ধর হ সাতকানিয়া

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রাখাল চন্দ্র চৌধুরী

লাতু বর্ডারের যুদ্ধে ৮ হানাদার ও ২ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান

২১ নভেম্বর রাতে ভারতীয় বিএসএফ এর সর্বাত্মক সহযোগিতায় ডাক বাংলোতে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমি ছিলাম সার্চ গ্রুপে (সামনে থেকে যুদ্ধ মোকাবেলা)। আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে আমরা এগুতে থাকি। আক্রমণের জন্য কমান্ডারের কোন সংকেত না পেয়ে পিছু হটার সংকেত দুটি লাল বাতি জ্বলে উঠতে দেখলে পিছনে চলে আসি। এসময় হানাদাররা গুলি শুরু করলে আমরা সুরমা নদীতে ঝাঁপ দিই। সমতলে উঠলে তখন হানাদারদের গুলি আমার পিঠের ডানপাশে লেগে আমি আহত হই। আরেক মুক্তিযোদ্ধা আক্তারও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। ভারতের মাসুমপুর হাসপাতালে অপারেশন করে আমার শরীরে থাকা গুলি বের করা হয়। সতকানিয়ার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রাখাল চন্দ্র চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, আমার পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা থাকায় মূলত সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে জড়িত থেকে অনেক মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছি। লেখাপড়াতেও বেশিদূর আগাইনি। কালিয়াইশ বিওসির মোড় এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অবস্থান নিলে পুরো পাড়ার লোকেরা ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমি ২১ বছরের যুবক। বান্দরবানের পাহাড়ি পথ দিয়ে টাকার বিনিময়ে এক দালালের মাধ্যমে হেঁটে হেঁটে থানছি বলিপাড়া পৌঁছি। আবার একই দালাল সেখান থেকে পাহাড়ের ছড়া দিয়ে আমাদের রাঙামাটির গুয়াইছড়ি নিয়ে যাওয়ার পথে উপজাতী ডাকাতের কবলে পড়ে স্বর্ণ ও টাকা লুট হয়। আমাদের দলের মধ্যে আমি সাধন দে, গোপিনাথ দে, মৃত নারায়ন দেসহ ৫/৬ জন যুবক ছিলেন। পরে ওই দালাল অস্ত্রধারী ৪ জন ইপিআর সদস্যকে ঘটনাস্থলে ডেকে নিয়ে আসলে ইপিআর এর গুলিতে ৪ ডাকাত ঘটনাস্থলে মারা যায়। আমাদের হাতে থাকা দা দিয়ে অনেক ডাকাতকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে তাদের ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিই। পরে আমরা গুয়াইছড়ি বাজারে গিয়ে খোলা মাঠে অবস্থান নিই।

রাখাল চৌধুরী বলেন, গুয়াইছড়ি থেকে ঠেগার পাহাড় হয়ে ভারতের পার্বা ক্যাম্পে পৌঁছি। পরে দেমাগ্রি যাই। দেমাগ্রির ডিসির কাছ থেকে একটি ট্রাক নিয়ে আমাদের তিন পরিবার ও সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ার মিহির নন্দীসহ তার এক পরিবার লোংলে ডিস্ট্রিক্ট পৌঁছি। সেখানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২ দিন থাকার পর শীলচর রেলওয়ে প্লাটফর্মে পৌঁছি। পথের মধ্যে আমার ছোট বোন সীতা চৌধুরী রক্ত আমাশয়ে মারা যায়। সেখানেই তাকে দাহ করা হয়। পরে সেখানে ভারতের সেনাবাহিনীর অফিসার কর্নেল বাগচীর যুবকদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তব্যে আমি উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য ট্রেনিংয়ে যেতে তালিকাভুক্ত হই। সেখান থেকে ২২ জন যুবককে শীলগুড়ি লোহার বন নিয়ে অস্ত্র ও গ্রেনেড নিক্ষেপের ট্রেনিং দেয়া হয়। এক মাসের মত প্রশিক্ষণে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি, এসএলআর, স্টেনগান ও ৩৬ হ্যান্ড গ্রেনেড প্রশিক্ষণ দেয়া হয় আমাদের। ৫০/৬০জনকে প্রশিক্ষণ দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর বল দেব সিং নামে এক অফিসার।

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা রাখাল চৌধুরী আরো বলেন, শীলগুড়ি থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ট্রাক যোগে বদরপুর জংশন হয়ে নিয়ে যাওয়া হয় লাতু বর্ডারে। সেখানে আমাদের হস্তান্তর করা হয় ৪নং সেক্টরে। এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল চিত্তরঞ্জন দত্ত। সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল এম.এ রব ও কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন সাদেক আহমদ। লাতু বর্ডারে ১৫ দিন অবস্থানকালে হানাদার বাহিনীর উপর ৩/৪টি অপারেশন পরিচালনা করা হয়। হানাদারদের ঘাটিতে প্রথমবার অতর্কিতে আক্রমণে ৮ জন পাক সৈনিক মারা যায়। গাজীপুর ও বরিশালের মারা যায় ২ জন মুক্তিযোদ্ধা। তাদের নাম জানা নাই। আমাদের ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী এক পাড়ায় পাক-বাহিনীর আনাগোনা দেখে ছদ্মবেশে ওই পাড়ায় ঢুকে ৫ হানাদার সদস্যকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে আসি। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে এ ক্যাম্পের সবাই মিলে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে বিজয় উল্লাস করি। উল্লেখ্য, রাখাল চৌধুরী ব্যক্তিজীবনে দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। তারা সবাই বিবাহিত। বেঁচে আছেন স্ত্রীও।

The Post Viewed By: 117 People

সম্পর্কিত পোস্ট