চট্টগ্রাম সোমবার, ২০ জানুয়ারি, ২০২০

৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:৪৩ পূর্বাহ্ন

মোর্শেদ নয়ন হ কর্ণফুলী

পাঁচ শতাধিক ডেইরি ফার্ম একজন চিকিৎসকও নেই

কর্ণফুলী

চট্টগ্রামের শহরতলি কর্ণফুলী উপজেলায় প্রায় পাঁচ শতাধিক ডেইরি খামার ও পোল্ট্রি খামার রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য উপজেলায় প্রতিষ্ঠা হয়নি পশু হাসপাতাল। নেই কোন পশু চিকিৎসকও। ২০১৭ সালের ২৯ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে উপজেলার দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয়। আড়াই বছর অতিবাহিত হলেও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও পশু চিকিৎসক পদায়ন করা হয়নি। উপজেলায় সম্প্রতি একজন ভেটেরিনারি পশু সার্জন পদায়ন করা হলেও তার বসার জায়গা নেই। তাকে আবার অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে পটিয়া উপজেলায় পদায়ন করা হয়। ফলে ওই সব খামারে রোগ বালাইয়ের প্রার্দুভাব দেখা দিলে চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য হাতুড়েদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে খামারিরা। অন্যদিকে, কোন কোন খামারি খামারে রোগ বালাইয়ের প্রার্দুভাব দেখা দিলে ছুটেন নগরের অবস্থিত চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) এস এ কাদেরী হাসপাতালে। খামারের গরুর সমস্যা দেখা দিলে

পিকআপ ভ্যানে করে সিভাসুতে নিতে হয়। যাতায়ত অসুবিধা ও দূরত্বের কারণে সময়মত চিকিৎসা সেবা ও ডাক্তারি পরামর্শ না পাওয়ায় বিভিন্ন রোগ বালাইয়ে মড়ক লেগে যায়। এতে খামারিদের ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবার অভাবে বিভিন্ন রোগবালাইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন খামারিরা।
জানা যায়, ডেইরি জোন হিসেবে সারাদেশে পরিচিতি কর্ণফুলী উপজেলার তৃণমূলে সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার লক্ষ্যে এক বছর আগে কর্ণফুলী উপজেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ ভেটেরিনারি ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু)। ক্লিনিক স্থাপনের প্রয়োজনীয় ভূমির ব্যবস্থা হলে নিজস্ব অর্থায়নে এ ক্লিনিক নির্মাণে এক কোটি টাকার তহবিল গঠন করে সিভাসু কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রয়োজনীয় ভূমির অভাবে থমকে গেছে এ উদ্যোগও।

এ বিষয়ে জানতে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় (সিভাসু) উপাচার্য অধ্যাপক ড. গৌতম বুদ্ধ দাশ দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘কর্ণফুলী উপজেলায় শত শত পশু খামার থাকলেও কোন পশু চিকিৎসা কেন্দ্র নেই। ওই সব প্রান্তিক খামারিদের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে একটি স্যাটেলাইট ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাও মাঠ পর্যায়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু বেশ কয়েকজন খামারি ভূমি দানে আগ্রহ প্রকাশ করলেও এখনো কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই ক্লিনিক স্থাপন করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, খামারিদের সহজে সেবা দেয়া যাবে এমন একটা জায়গা খাস জমি বা ব্যক্তি মালিকানা যাই হোক, দাতা ভূমি সিভাসুর নামে রেজেস্ট্রি করে দিলেই আমরা দ্রুত ক্লিনিকের কাজ শুরু করে দিব। এজন্য আমাদের সিভাসু কর্তৃপক্ষ এক কোটির টাকার উপরে একটা তহবিল গঠন করেছে।
জানতে চাইলে খামারি জালাল উদ্দীন রোকন বলেন, ‘কর্ণফুলী উপজেলা ডেইরি জোন হিসেবে সারাদেশে পরিচিতি পেলেও দুঃখের বিষয় হচ্ছে এখানে কোন পশু হাসপাতাল বা উন্নত চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা নেই। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদেরকে শহরের ভেটেরিনারি হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে। এতে অর্থ ও সময় নষ্ট হচ্ছে আবার অনেক সময় সেখানে গিয়ে হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে’।

চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের পোল্ট্রি খামারি জাহেদুর রহমান বলেন, ‘আমার পোল্ট্রি খামারে রোগের প্রার্দুভাব দেখা দিলে পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা নেয়ার জন্য কর্ণফুলীতে কোন ভেটেরিনারি চিকিৎসক নেই। কয়েক মাস আগে মাত্র তিন দিনের মধ্যে অজ্ঞাত রোগে আমার খামারের ৮/৯’শ গ্রাম ওজনের ছয় হাজার ব্রয়লার মুরগি মারা যায়। এতে আমার প্রায় ৯ লক্ষ টাকা লোকসান হয়’।

খামারি জালাল আহমদ জানান, হাঁস, মুরগি ও গরু, বাছুরের স্বাস্থ্য সেবায় কর্ণফুলীতে পশু চিকিৎসক না থাকায় হাতুড়েদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে খামারিরা।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ডেইরী এসোসিয়েশন সভাপতি মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘কর্ণফুলী উপজেলায় পাঁচ শতাধিক ডেইরি খামার রয়েছে। কিন্তু উপজেলা পশু হাপাতাল ও কোন পশু চিকিৎসক না থাকায় সময়মত টিকা, বিভিন্ন রোগ বালাইয়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়াও দক্ষ জনবল ও দুধের ন্যায্য মূল্য না থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে খামারিদের।’

জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘খামারিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও বিভিন্ন রোগ বালাইয়ে চিকিৎসা সেবার জন্য উপজেলায় পশু হাসপাতাল খুবই জরুরি। উপজেলায় একজন ভেটেরিনারী সার্জন পদায়ন করা হলেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় তাকে বসার কোন ব্যবস্থা করে দেয়া যায়নি। তবে বসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আরও চিকিৎসক পদায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রেয়াজুল হক দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘কর্ণফুলী উপজেলা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। ওখানে শত শত খামার রয়েছে। নবগঠিত ওই উপজেলায় এখনও কার্যালয় নেই। ইতোমধ্যে একজন ভেটেরিনারী সার্জন পদায়িত করা হয়েছে। কার্যালয়ের ব্যবস্থা এবং উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাসহ আরও কিছু চিকিৎসক পদায়নের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আশা করি মাস দুয়েকের মধ্যে সবকিছু পুুরোদমে চলবে।

The Post Viewed By: 111 People

সম্পর্কিত পোস্ট