চট্টগ্রাম শনিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২০

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৫:২৮ পূর্বাহ্ন

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম হ হাটহাজারী

সদরে কিছুটা সেবা, প্রত্যন্তে মেলে না হাটহাজারী

হাটহাজারী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সেবা পাওয়া দুষ্কর। বেশিরভাগ ডেইরি ও পোলট্রি খামারি সরকারি সেবা না পেয়ে বেসরকারি সেবা গ্রহণ করেই তাদের খামার পরিচালনা করছেন। তবে উপজেলা সদরের খামারিরা উপজেলা পশু সম্পদ কার্যালয়ের মাধ্যমে কিছু সেবা পেয়ে থাকেন। সদরের বাইরের বিভিন্ন ইউনিয়নের একাধিক খামারি জানিয়েছেন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা সরকারি প্রাণী হাসপাতালের সেবা না পেয়ে চড়ামূল্য দিয়ে বেসরকারি সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এদিকে জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ইউএলও) জানিয়েছেন সীমিত জনবলের কারণেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দূরের ইউনিয়নসমূহে কাক্সিক্ষত সেবা দেয়া যায় না। উপজেলা প্রাণি সম্পদ কার্যালয়ে বর্তমানে জনবলের মধ্যে রয়েছে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ইউএলও) একজন, ভেটেরিনারি সার্জন একজন, উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা তিনজন, কম্পাউন্ডার একজন, ড্রেসার একজন, কৃত্রিম প্রজনন মাঠ সহকারী একজন, অফিস সহকারী একজন ও অফিস সহায়ক একজন। একজন ড্রেসারের পদ থাকলেও বর্তমানে তা শূন্য রয়েছে। সূত্র জানায়, প্রাণিসম্পদে সমৃদ্ধ হাটহাজারীতে বর্তমানে ৪০০টি বাণিজ্যিক মুরগির খামার রয়েছে। ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালী জাতের এসব মুরগির খামারে উৎপাদিত হচ্ছে মাংস ও ডিম। তাছাড়া একদিনের মুরগির বাচ্চা উৎপাদনকারি ব্রিডার ফার্ম রয়েছে দুইটি। দেড় শতাধিক ছাগলের খামারে রয়েছে ৪০ হাজারের অধিক ছাগল। উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ মাদার্শা, ছিপাতলী,

মেখল ইউনিয়নে রয়েছে দেড় সহস্রাধিক মহিষ। সব মিলিয়ে হাটহাজারীতে মোট গরু আছে লক্ষাধিক। ১৪ ইউনিয়ন ও একটি সিটি কর্পোরেশন ওয়ার্ড মিলে ৫টির উপরে গরু রয়েছে এমন বাণিজ্যিক গরুর খামার আছে হাটহাজারীতে ১২০টি। এরমধ্যে বুড়িশ্চর ইউনিয়নে ১৮টি, শিকারপুরে ১১টি, চিকনদ-ীতে ২৩টি, দক্ষিণ মাদার্শায় ১০টি, উত্তর মাদার্শায় আটটি, মেখল ইউনিয়নে সাতটি, ফতেপুরে ১০টি, ছিপাতলীতে পাঁচটি, নাঙ্গলমোড়ায় তিনটি, গড়দুয়ারায় সাতটি, হাটহাজারী পৌরসভায় পাঁচটি, মির্জাপুরে তিনটি, ধলইয়ে-১০টি, ফরহাদাবাদে সাতটি, গুমানমর্দন ইউনিয়নে ১০টি, সিটি কর্পোরেশন ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে ১৫টি গরুর খামার রয়েছে। হাটহাজারীতে পারিবারিকভাবে কবুতর পোষা হয় প্রায় ১০ সহস্রাধিক। রয়েছে টার্কি এবং কোয়েলের খামারও।

সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা সদরের আশেপাশের ইউনিয়নসমূহের মধ্যে হাটহাজারী পৌরসভা, ফতেপুর ও মেখল ইউনিয়নে খামারিরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে কিছু সেবা পেলেও দূরবর্তী অন্যান্য ইউনিয়নের খামারিরা চিকিৎসা সেবা পায় না। দূরের ইউনিয়নগুলোর প্রতিষ্ঠিত খামারিরা উপজেলা প্রাণি সম্পদ কার্যালয়ের পরামর্শ ও কিছু চিকিৎসা সেবা পেলেও এসব এলাকার প্রান্তিক ক্ষুদ্র খামারিরা কোন ধরনের সুযোগ সুবিধা পায় না বলে অভিযোগে প্রকাশ। খন্দকিয়া এলাকার পোলট্রি খামারি মিনহাজুর রহমানসহ একাধিক খামারি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, খামারের প্রয়োজনের সময় প্রাণি সম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করেও কোন সহযোগিতা পাই না। তাই বাধ্য হয়ে আমরা বেসরকারি চিকিৎসকের দ্বারস্থ হই। এতে আমরা আর্থিক ক্ষতিসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি শিকার হই। আমরা এ অবস্থার অবসান চাই। চিকনদন্ডি ইউনিয়নের লালিয়ারহাট এলাকার মাহবুব ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারি মাহবুব আলম বলেন, আমরা কখনো উপজেলা প্রাণি সম্পদ অফিসের চিকিৎসা সেবা পাইনা, তাছাড়া দীর্ঘসুত্রিতার কারনে সেবা পেতে অনেক হয়রনির সম্মুখীন হতে হয়। একারণে প্রাণি সম্পদ কার্যালয়ে না গিয়ে গরুর কৃত্রিম প্রজননসহ সব ধরনের চিকিৎসা সেবার জন্য স্থানীয় বেসরকারি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই।

সিটি কর্পোরেশন ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের খোশাল শাহ মসজিদ এলাকার সাঈদ এগ্রো এবং আমেনা ডেইরি ফার্মের স্বত্বাধিকারী আইনে মাস্টার্স করা মো. সাইদুজ্জামানও অনেকটা একই সুরে বলেন, উপজেলা সদর এলাকার ইউনিয়নসমূহের খামারি এবং উপজেলার প্রতিষ্ঠিত কিছু খামারি সেবা পেলেও প্রত্যন্ত এলাকায় উপজেলা লাইভষ্টক অফিসের কাক্সিক্ষত সেবা মিলেনা । তিনি বলেন গবাদি পশু একটি লাইভ প্রোডাক্ট, যখন গরু কিংবা অন্যান্য পশু পাখির সমস্যা দেখা দেয় তখনই সেবা প্রয়োজন। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে উপজেলা লাইভষ্টক অফিস তাৎক্ষণিক কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চিকিৎসা সেবা দিতে পারে না, এতে খামারিরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসক কিংবা হাতুড়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। ফলে বেশিরভাগ খামারি অপচিকিৎকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি বলেন, সম্প্রতি লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগ দেখা দেয় উপজেলার বিভিন্ন গরুর খামারে। ভয়াবহ এ রোগের ভাইরাস আফ্রিকা থেকে ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশে ছড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এ রোগ দেখা দিলে সচেতন খামারিরা উপজেলা লাইভষ্টক অফিসসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে সেবা নিয়ে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দেয়। তার খামারের তিনটি গরুও এ রোগে আক্রান্ত হয়েছিল, বর্তমানে কিছুটা ভালোর পথে। কিন্তু উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক খামারিরা চিকিৎসা সেবা ও উপযুক্ত পরামর্শ না পেয়ে এ রোগের ভয়াবহতায় দিশেহারা হয়ে পড়েন। অনেক খামারি রোগ সামাল দিতে না পেরে ফার্মের মূল্যবান গরু স্বল্পমূল্যে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নাবিল ফারাবি দৈনিক পূর্বকোণ’কে বলেন, লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) রোগটি গত কোরবানির ঈদের পর থেকে ব্যাপক আকারে দেখা দেয়। হাটহাজারীর অন্তত ৫ হাজার গরু এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকাতে দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় এ রোগ। এ রোগে গরু মারা না গেলেও চিকিৎসার খরচ বেড়ে যায় এবং চামড়া ও মাংসের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। হাটহাজারীতে জানামতে এ রোগে কোন গরু মারা যায়নি দাবি করে তার দাবি, হাটহাজারীতে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে আছে। উপজেলা সদরের বাইরে দূরবর্তী এলাকায় খামারিরা চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ডা. নাবিল বলেন, হাটহাজারী উপজেলায় মাত্র তিনজন উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা দিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাক্সিক্ষত সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য ন্যূনতম এক জন উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্যান্য পদেও লোকবল বাড়াতে হবে। ইচ্ছা থাকা সত্বেও শুধুমাত্র জনবল সংকটের কারনেই আমরা প্রান্তিক পর্যায়ে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা দিতে পারছি না।

The Post Viewed By: 132 People

সম্পর্কিত পোস্ট