চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২০

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:৪৮ পূর্বাহ্ন

নাজিম মুহাম্মদ

উদ্ধার মোটরসাইকেলের একটি জব্দ, দুটি গোপন!

৩টি মোটরসাইকেল একই পাচারকারীর বাকি দুটি মোটরসাইকেলে একইভাবে ইয়াবা লুকানো ছিলো বলে অভিযোগ

ইয়াবা পাচারে ব্যবহৃত একই পাচারকারীর তিনটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করলেও একটি জব্দ দেখিয়েছে পুলিশ। ঘটনার ১৫দিন পার হলেও বাকি দুটি মোটরসাইকেলের বিষয় গোপন রেখেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। জব্দ দেখানো একটি মোটরসাইকেলে কৌশলে লুকিয়ে রাখা ২১ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে।
অভিযাগ উঠেছে বাকি দুটি মোটরসাইকেলেও একই পদ্ধতিতে ইয়াবা লুকানো ছিলো। আরিফ নামে একজন ইয়াবা পাচারকারীর নগরীর কল্পলোকের ভাড়া বাসা থেকে মোটরসাইকেল দুটি উদ্ধার করা হয়েছে। ঐ বাসায় বেশ কিছু নগদ টাকাও পেয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। ২১ হাজার ইয়াবাসহ যে মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয়েছে সেটিও আরিফের। মোটরসাইকলে দুটি নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে রীতিমতো শিকল দিয়ে তালা মেরে রাখা হয়েছে।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নগর পুলিশের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মিজানুর রহমান বলেন, কল্পলোক আবাসিক এলাকা থেকে দুটি মোটরসাইকেল আনা হয়েছে। তবে এগুলো একই পাচারকারীর কিনা দেখতে হবে। জব্দ করা একটি মোটরসাইকেলের অনুরূপ ওই দুটি মোটরসাইকেলেও সমপরিমাণ ইয়াবা ছিল এ কথার জবাবে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, কী বলেন? এমন ঘটনাতো চোরেও করবে না। গত ১৮ নভেম্বর উদ্ধার করা দুটি মোটরসাইকেল কোন মামলায় জব্দ দেখানো হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডিসি মিজানুর রহমান বলেন, গাড়িগুলো কোন মামলায় জব্দ হয়েছে কিনা তা আমি খোঁজ নিচ্ছি। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে দেখছি। প্রয়োজনে ওই মোটরসাইকেল দুটি ওই মামলায় জব্দ দেখানো হবে। তবে কল্পলোকের ওই বাসায় টাকা পাবার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।
নগর পুলিশের জনসংযোগ শাখা থেকে গত ১৯ নভেম্বর পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ১৮ নভেম্বর নগরীর বাকলিয়া থানার আবদুল্লাহ আল নোমান কলেজ রোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি মোটরসাইকেলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটক করা ওই মোটর সাইকেলে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা ২১ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। গ্রেপ্তার তিনজন হলেন, সাতকানিয়ার সোনাকানিয়া ইউনিয়নের গারাঙ্গিয়া গ্রামের মো. ইছহাকের ছেলে আলমগীর হোছাইন, জনার কেওচিয়া গ্রামের মোহাম্মদ ইদ্রিসের ছেলে ইয়াছিন আরাফাত ও চন্দনাইশের পশ্চিম ধোপাছড়ি গ্রামের মৃত জামাল হোসেনের ছেলে রেজাউল করিম।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর জোনের উপ-কমিশনার মো. মিজানুর রহমানের নিদের্শনায় দুইজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের তত্ত্বাবধানে পুলিশ পরিদর্শক রুহুল আমিনের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ ব্যাপারে তিনজনের বিরুদ্ধে বাকলিয়া থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলাও করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার আসামি ইয়াছিন আরাফাত গত ১৯ নভেম্বর মেট্টোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিউদ্দিন মুরাদের আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি প্রদান করেন। ইয়াছিন জানান, নগরীর টেরিবাজারে ওড়না মেলা নামে তাঁর একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। আরিফ নামে তার এক বন্ধু আছেন। তিনিও টেরিবাজারে কাপড়ের ব্যবসা করেন। গত ১৬ নভেম্বর ইয়াছিন গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ায় গিয়েছিলেন। ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রামে ফেরার পথে বন্ধু আরিফ তাকে সাতকানিয়া থেকে মোটরসাইকেলটি দিয়েছেন। চট্টগ্রাম শহরে পৌঁছার পর আলমগীর হোসেনের কাছে সেটি হস্তান্তরের কথা ছিল। আলমগীর আর আরিফের বাড়ি একই গ্রামে। আলমগীর নগরীর বায়েজিদ টেকনিক্যাল মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। আরিফের দেয়া মোটরসাইকেল নিয়ে কর্ণফুলী ব্রিজ পার হবার পর গোয়েন্দা পুলিশ ইয়াছিনকে আটক করে। তখন আলমগীরকে ফোন করে ডেকে আনলে তাকেও আটক করে পুলিশ। পরে আলমগীরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ইয়াছিনের আনা ওই মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকির ভেতর বিশেষভাবে লুকানো ২১ হাজার ইয়াবা পাওয়া যায়। আরিফের এ ধরনের আরো তিন/চারটি মোটরসাইকেল রয়েছে। এসব গাড়িতে টেকনাফ থেকে ইয়াবা বহন করা হয়। ইয়াবাবহন করার অপরাধে তিনজকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল পাচারকারী আরিফ এখনো পলাতক রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, টেরিবাজার ছমদিয়া মার্কেটে ‘শাহ মজিদিয়া হোসিয়ারি গার্মেন্টস’ নামে আরিফের একটি কাপড়ের দোকান রয়েছে। এক বছর আগেও সে একই মার্কেটে রূপকানিয়া গার্মেন্টস’ নামে একটি কাপাড়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। টেরিবাজার এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, আরিফের গ্রামের বাড়ি সাতকানিয়ার দক্ষিণ রূপকানিয়া গ্রামের গেজার পাড়ায়। তার বাবার নাম নাসির উদ্দিন। ঠিকানার সূত্রধরে দক্ষিণ রূপকানিয়া গেলে স্থানীয় লোকজন জানান, আরিফের বাবা নাসির উদ্দিনের আর্থিক অবস্থা তেমন ভাল নয়। মানুষের বাসা বাড়িতে কাজকর্ম করেন। গত বছর দুয়েক ধরে হঠাৎ আরিফের অর্থ বৈভব বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। চলাফেরায়ও পরিবর্তন আসে। টেরিবাজারে নিজস্ব কাপড়ের দোকান রয়েছে। গ্রামের বাড়িতে ডুপ্লেক্স ঘর নির্মাণের কাজ চলছে।

গত মাস দুয়েক আগে গারাঙ্গিয়া ব্রিজ এলাকা থেকে ইয়াবা নিয়ে দুই যুুবককে আটক করে সাতকানিয়া থানা পুলিশ। পরে জানা যায় ইয়াবাগুলো ছিল আরিফের। ওই সময় থেকে আরিফের ইয়াবা পাচারে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পায়। আরিফ নগরীর বাকলিয়া কল্পলোক আবাসিক এলাকায় মাসকাট টাওয়ারে ভাড়া বাসায় থাকেন।
গতকাল (মঙ্গলবার) বাকলিয়া আবাসিক এলাকায় মাসকাট টাওয়ারে গেলে জানা যায়, গত ১৮ নভেম্বর রাত আনুমানিক একটায় সাদা পোশাকে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে আরিফের বাসা থেকে দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে। ধারনা করা হচ্ছে ওই দুটি মোটরসাইকেলেও ইয়াবা লুকানো ছিলো। বাড়িটির মালিক নুরুল ইসলাম। তাঁর ছেলে রফিকুল ইসলাম সেটি দেখ ভাল করছেন।

The Post Viewed By: 125 People

সম্পর্কিত পোস্ট