চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০১৯

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ | ৪:৪১ পূর্বাহ্ন

কক্সবাজার আরফাতুল মজিদ, কক্সবাজার

চোর সন্দেহে ৫ম শ্রেণির ছাত্রের কারাবাস

পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণ মিলেনি এখনও ঝরে পড়ল পিইসি পরীক্ষা থেকে

কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির মেধাবী ছাত্র শাহ আমিন সদ্য শেষ হওয়া পিএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। নিরীহ মেধাবী ছাত্রকে সম্পূর্ণ সন্দেহভাজন হিসেবে ইনানী ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সিদ্ধার্থ সাহা শারীরিকভাবে নির্মম নির্যাতন করে প্রতিবেশীর ঘরে চুরির মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠান।

এতে মেধাবী শিশু ছাত্রটির ভবিষ্যৎ জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। দীর্ঘ আড়াই মাস ধরে কারাবন্দী থাকায় সে পিইসি পরীক্ষাও দিতে পারেনি। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় শিশুটির মামলা পরিচালনা করতে ও জামিনে মুক্ত করতে পারছে না পরিবারটি। এমনকি গাজীপুর শিশু কারাগারে গিয়ে শিশুর সাথে দেখা করতে অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবারটি। শিশুকে জামিনে মুক্ত করতে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন। চলতি বছরের গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে শিশু শাহ আমিন ঢাকার গাজীপুরস্থ টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আছে। উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের পাইন্যাশিয়া গ্রামের দিনমজুর শামশুল আলমের শিশু ছেলে শাহ আমিন।

জানা যায়, উখিয়া জালিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরুল আমিন চৌধুরীর ভাই পাইন্যাশিয়া গ্রামের মৃত আমিনুল হক চৌধুরীর বসত ঘরে গত ২৬ আগস্ট রাত ৩ টায় চুরির ঘটনা ঘটে। এসময় নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও দামী কয়েকটি মোবাইল সেটসহ প্রায় আড়াই লাখ টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় কারা জড়িত সেটা নিশ্চিত হতে না পারায় দীর্ঘদিন মৃত আমিনুল হক চৌধুরীর পরিবারটি কোন মামলাও করেননি।
এদিকে, চুরির ঘটনার দীর্ঘ ২৪দিন পরে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে স্কুল ছাত্র শাহ আমিনকে উখিয়া ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই সিদ্ধার্থ সাহা ধরে এনে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে। এমনকি জিজ্ঞাসাবাদেও চুরির ঘটনায় জড়িত কিনা স্বীকার করাতে ব্যর্থ হন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পরে শিশু ছাত্র শাহ আমিনকে উখিয়া থানায় সোপর্দ করে। সেই দিন ২০ সেপ্টেম্বর রাতে থানায়ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানেও কোন তথ্য বের করতে ব্যর্থ হন। পরে গৃহকর্ত্রী মৃত আমিনুল হক চৌধুরীর স্ত্রী জাহানারা বেগম বাদি হয়ে উখিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। উখিয়া থানার নিয়মিত মামলা নং-৩৭, জিআর মামলা নং-৪৬৮/২০১৯,তাং-২০/০৯/২০১৯। ধারা-৪৫৭/৩৮০/৩৪ দন্ডবিধি) হিসেবে রেকর্ড পূর্বক স্কুল ছাত্র শাহ আমিনকে ২১ বছর বয়স উল্লেখ করে আদালতে সোপর্দ করা হয়। ওই মামলায় স্কুল ছাত্র শাহ আমিনসহ ৩ জনকে আসামি করা হয়। নিয়মিত মামলাটির এজাহারের ও আসামির চালান ফর্দে ১নং ক্রমিকের আসামি শাহ আমিনের বয়স ২১ বছর উল্লেখ করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সিদ্ধার্থ সাহা শিশু ছাত্র শাহ আমিনকে আদালতে সোপর্দ করলে আদালতও স্বাভাবিক বয়সের আসামি হিসেবেই শিশুটিকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠায়।
কিন্তু জেলা কারা কর্তৃপক্ষ শিশু ছাত্র শাহ আমিনের শারীরিক গঠন পর্যালোচনায় অপ্রাপ্ত বয়সের শিশু বিবেচনা করে শিশু কারাবন্দীদের জন্য নির্ধারিত টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়।
মামলার এজাহারে ১৪ বছরের শিশু শাহ আমিনকে ২১ বছর বয়স উল্লেখ করা হলেও জালিয়াপালং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরুল আমিন চৌধুরী প্রদত্ত জন্ম সনদ ও অনলাইন জন্ম নিবন্ধন তথ্য যাছাই এবং রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমৃত কুমার বড়–য়া প্রদত্ত ৫ শ্রেণি পড়–য়া নিয়মিত মেধাবী ছাত্র ও ১৭ নভেম্বর পিএসসি পরীক্ষার্থী প্রত্যয়ন পত্র পর্যালোচনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এতে দেখা যায়, শাহ আমিনের জন্ম ৮ সেপ্টেম্বর ২০০৫ সালে। সে মতে তার বর্তমান বয়স ১৪ বছর ২ মাস।
রেজুরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অমৃত কুমার বড়–য়া জানান, ‘শাহ আমিন স্কুলের নিয়মিত ও মেধাবী ছাত্র। সে চুরির ঘটনায় জড়িত বা চুরি করেছে তা বিশ্বাস করি না। প্রতিদিন স্কুলে সদা হাস্যোজ্জ্বল, খেলাধুলা ও পড়াশোনায় ব্যস্ত শিশু ছাত্রটির মুখচ্ছবি প্রায় ভাবনায় এলে মনটা হাহাকার করে ওঠে। তার শিশু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পিএসসি পরীক্ষায়ও সে অংশ নিতে পারেনি। এটা খুবই দুঃখজনক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার অনেকেই জানালেন, শিশু ছাত্র শাহ আমিন চুরির ঘটনায় জড়িত ছিল সেটা অবিশ্বাস্য ও হাস্যকর। এমন বয়সের শিশুর পক্ষে রাত সাড়ে ৩ টায় অন্যের ঘরে চুরির মত অসাধ্য কাজ করা অবিশ্বাস্য। প্রাথমিক পর্যায়ে পড়াশুনারত, অবুঝ ও সহজ-সরল একটা শিশু ছাত্রকে কোনও প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী বা নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই শুধু সন্দেহের বশে নির্মম নির্যাতনসহ মারধর করে চুরির মামলায় কারাগারে পাঠানো খুবই অমানবিক।

এদিকে, বসত ঘরে চুরির ঘটনার দীর্ঘ ৩ মাসেরও বেশি সময় পার হতে চলেছে। কিন্তু চুরি হওয়া পরিবারের কোন সদস্য বা প্রতিবেশি, এমনকি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাও এঘটনায় কারা জড়িত তা নিশ্চিত হতে পারেননি। নিরীহ স্কুল ছাত্র শাহ আমিন জড়িত থাকার মত কোন সাক্ষ্য-প্রমাণও মিলেনি। উদ্ধার হয়নি চোরাই কোন আলামতও। স্কুলছাত্রকে আটক করে কারাগারে প্রেরণের দীর্ঘ আড়াই মাস অতিবাহিত হলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সিদ্ধার্থ সাহা নাকি জানেন না, শাহ আমিন স্কুলছাত্র ও ১৪ বছরের শিশু!

তদন্তকারী কর্মকতা ইনানী পুলিশ ইনচার্জ এসআই (নিরস্ত্র) সিদ্ধার্থ সাহা জানালেন, অন্যান্য যে কোন ফৌজদারী মামলাগুলো তদন্তের চেয়ে সিঁধেল চুরির মামলা তদন্ত করা খুবই জটিল ও সময় সাপেক্ষ। মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় কোনও মতামত দেয়া যাবে না। তবে শাহ আমিন যে পিএসসি পরীক্ষার্থী ৫ম শ্রেণির স্কুলছাত্র অথবা শিশু তা তার জানা নেই বলে জানালেন তিনি। জানা গেছে, তিনিই শিশুটিকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতন করেছে, আদালতে সোপর্দ করেছেন।

The Post Viewed By: 62 People

সম্পর্কিত পোস্ট