চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ | ৬:০৪ পূর্বাহ্ন

মরিয়ম জাহান মুন্নী হ

ঝরেপড়া শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো

‘আশার আলো শিশু শিখন কেন্দ্র’ নগরীতে ৯৫ টি স্কুল প্রতিস্কুলে ৩০ শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক

শিক্ষা জাতির মেরুদ- আর সেই শিক্ষা অর্জনের অধিকার আছে প্রতিটি শিশুর। তবে অভাবের কারণে শিক্ষা অর্জন থেকে ঝরে যাচ্ছে অনেক শিশু। অল্প বয়সেই হাতে তুলে নিচ্ছে সংসারের ভার। করছে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। অনেক শিশু ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনাও করেছে। কিন্তু অভাবের কারণে পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাবা-মা’র সাথে কাজ করছে তারা। এসব সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের জন্যই ‘সেকেন্ড চান্স এডুকেশন’ প্রকল্প। ২০১৭ সালে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে যুগান্তর সমাজ উন্নয়ন সংস্থা, ইপসা, ঘাসফুল ও দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র নগরীতে ‘আশার আলো শিশুশিখন কেন্দ্র’ এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। এখানে আর্থিক সমস্যার কারণে ঝরে পড়া ও সুবিধাবঞ্চিত শিশু যারা পড়াশোনা করতে পারে না তাদের আবার নতুন করে বিদ্যালয়ে পড়ালেখার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে নগরীর ৪১ টি ওয়ার্ডে ‘আশার আলো শিশু শিখন কেন্দ্র’ নামে ৯৫টি স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। একটি কেন্দ্রে ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষক আছে। এই স্কুলগুলোতে দিনে তিন ঘণ্টা করে শিক্ষাকার্যক্রম চলে। শিশুদের কাজের সময়ের সাথে মিল রেখেই পরিচালিত

স্কুল। নগরীর বলুুয়ার দিঘীরপাড়, লালখানবাজার পোঁড়া কলোনি, বায়েজীদ আমিন কলোনি, পাথরঘাটা আশরাফ আলী রোড, ব্রিকফিল্ড রোড ও তুলাপুকুর পাড় এলাকাসহ আরো বিভিন্ন জায়গায় ‘আশার আলো শিশু শিখন কেন্দ্র’ আছে। এখানে পড়ালেখা করা শিশুরা শহরের বিভিন্ন দোকান, বাসা-বাড়িতে কাজ করে। এদের অনেকের বাবা-মা দিনমজুর, গার্মেন্টস কর্মী, মিল কর্মী, মৎসজীবী, রিক্শাচালক, সিএনজি ট্যাক্সি চালক ও গৃহকর্মী।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ের দেখা যায় শিক্ষার্থীরা ফ্লোরে ইউ আকৃতিতে বসা। সবার সামনেই বই, পাঠক্রমিক কাজ ছড়া, নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়, চিত্রাঙ্গন’র শিক্ষাও আছে।

মিয়াখান নগরে পরিবারের সাথেই থাকে শিক্ষার্থী তানজিনা। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সে চতুর্থ। বাবা বাদাম বিক্রি করে ও মা অন্যের বাসায় কাজ করে। পরিবারের অনেক অভাব। তাই বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও অর্থের অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। মা তাকে অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে দিয়ে দেন। ২০১৭ সেকেন্ড চান্স এডুকেশন প্রকল্প’র যুগান্তর সমাজ উন্নয়ন সংস্থার পরিচালিত মিয়াখান নগর-২ ‘আশার আলো শিশু শিখন কেন্দ্রে’ পড়াশোনা শুরু করে সে। এখনও কাজের ফাঁকে পড়ালেখা করছে।
অভিভাবক রাশেদ আলী বলেন, আমি রিক্শাচালক। আমার মতো মানুষদের খেয়ে পড়ে ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া করানো কষ্টকর। এ স্কুলে আমার ছেলে বিনামূল্যে পড়াশোনা করছে। তাছাড়া সে কাজও করতে পারে।

এ বিষয়ে জেএসইউএস’র নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমীন পারভীন
বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সচেতন। শিক্ষার দ্বিতীয় সুযোগের আইনে যে সকল শিশু ঝরে পড়েছে, তাদের জন্য নিরাপত্তামূলক নেট হিসেবে কাজ করছে এ শিশু শিখন কেন্দ্র। এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানবসম্পদে পরিণত করা ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এ বিদ্যালয়। এ ক্ষেত্রে শহরের বস্তি, দরিদ্র প্রবণ এলাকা ও ভৌগলিক দিক দিয়ে অনগ্রসর এলাকার বিদ্যালয় বহির্ভুত শিশুরা এখানে পড়ালোখার সুযোগ পায়।

আশার আলো শিশু শিখন কেন্দ্রের শিক্ষকরা বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে দারিদ্রতা, দুর্যোগ, পিতা-মাতার দাম্পত্য কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, সচেতনতার অভাব, বাসগৃহ স্থানান্তরসহ নানা কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ৮ থেকে ১৪ বছরের শিশু শিক্ষার্থীরা এ শিখন কেন্দ্রে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠদান করানো হয়। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বাদ পড়া শিশুদের সমপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করার মাধ্যমে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া হয়। যাতে তারা সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারে এবং উপযুক্ত দক্ষতা উন্নয়নমূলক কোর্সে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।

The Post Viewed By: 46 People

সম্পর্কিত পোস্ট