চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৯

২০ নভেম্বর, ২০১৯ | ২:৫৪ পূর্বাহ্ন

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

হাতিয়ে নিল দেড়শ কোটি টাকা

১৫ আমদানিকারক ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীর হাতে জিম্মি : আড়তদার হ বন্দরে পৌঁছেছে ৪১৩ টন হ কমতে শুরু করেছে দাম

গত দুই মাস ধরে অস্থিরতা চলে আসছে পেঁয়াজের বাজারে। প্রতি কেজি পেঁয়াজ দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। এতে আমদানিকারক ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা অনন্তপক্ষে দেড় শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ভোক্তাদের পকেট থেকে। তারপরও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল আমদানিকারকরা।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে ৪১৩ টন পেঁয়াজ। চীন, মিশর, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা এসব পেঁয়াজ বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। আকাশপথে আসছে পেঁয়াজ। দুই পথে পেঁয়াজ আসায় পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের তেজী ভাব কমে আসছে। তিনদিনের ব্যবধানে পাইকারি মোকামে কেজি প্রতি কমেছে ৮০ টাকা পর্যন্ত। চাক্তাই আড়তদার সমিতির সভাপতি আহসান খালেদ বলেন, ‘আমদানিকারকদের চিহ্নিত করে চাপ প্রয়োগ করলে পেঁয়াজের দাম এতো বেশি হত না। প্রশাসন শুধু আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের উপর চাপ প্রয়োগ করেছিল। মূলে হাত না দেওয়ায় বাজারে সুফল আসেনি।’

আড়তদার সমিতির সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও কাস্টমস কার্যালয়ে আমদানিকারকদের তালিকা রয়েছে। সরকার সেই তালিকা ধরে আমদানিকারকদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে পেঁয়াজের দাম নাগালের মধ্যে থাকত। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিয়ানমার ও ভারতীয় অন্তত ১৫ জন আমদানিকারকের হাতে জিম্মি পেঁয়াজের বাজার। ১৫ জনকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দেশের পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকত বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
ব্যবসায়ী ও আড়তদার সূত্র জানায়, ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণার পর মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করেছিল আমদানিকারকেরা।

৪২ টাকায় কেনা পেঁয়াজ ৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়েছিল। আর খুচরা বাজারে সেই পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১২০-১৩০ টাকা পর্যন্ত। চলতি সপ্তাহে তো পেঁয়াজের দামের রীতিমতো হিমশিম অবস্থা। গত শনিবার পাইকারি বাজারে মিয়ানমারের পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজি প্রতি দুইশ টাকা দরে। খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে আড়াইশ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ চারগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে মিয়ানমারের পেঁয়াজ। শুধু কয়েক দিনেই চক্রবৃদ্ধি লাভে হাতিয়ে নিয়েছে ৩০-৩৫ কোটি টাকা।

গতকাল পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১০০-১২০ টাকা। গত শনিবার তা দুইশ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। চায়না থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকা ও মিশরের পেঁয়াজ ৯০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা দরে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার পেঁয়াজের রপ্তানি মূল্য ৮৫০ ডলার বেঁধে দেয়। তখন পেঁয়াজের দাম কেজি প্রতি ১৭ টাকা বেড়ে বিক্রি হয়েছিল ৫০-৬০ টাকা। পরে রপ্তানি বন্ধ করে দিলে ৯০-৯৫ টাকায় পৌঁছে যায়। তারপরও আগের এলসি করা দুইশ ট্রাকের বেশি পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। এসব পেঁয়াজ দেশে এনে দ্বিগুণেরও বেশি বিক্রি করেছে আমদানিকারকেরা। প্রতি ট্রাকে ৩২০ বস্তা থেকে ৩৫০ বস্তা পর্যন্ত পেঁয়াজ থাকে। প্রতি বস্তায় ৪২-৪৫ কেজি পেঁয়াজ ধরে। সেই হিসাবে পূর্বের দামে কেনা পেঁয়াজে-ই বাজার থেকে অতিরিক্ত হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত ২৫ কোটি টাকা।
একই আমদানিকারকেরা ভারতের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু করেন। সেপ্টেম্বর মাসে ৪২ টাকায় আমদানি করা পেঁয়াজ ৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। গত সপ্তাহে তো দুইশ টাকা ছুঁয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, মিয়ানমার থেকে ১০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। প্রতি কেজি ৪০-৪৫ টাকা লাভে বিক্রি করে বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৪০-৪৫ কোটি টাকা। কয়েক দিনে চক্রবৃদ্ধি হারে মুনাফা লুটে নিয়েছে আরও অন্তত ৩০ কোটি টাকা।

এছাড়াও মিশর, চায়না ও তুরস্ক থেকেও পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে অন্তত একশ কন্টেইনার পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। প্রতি কন্টেইনারে ২৮ হাজার কেজি করে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের দাবি, কেজি ৪০ টাকায় আমদানি করা পেঁয়াজও দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেছে আমদানিকারকেরা। প্রতি কেজিতে ৬০ টাকার বেশি লাভ করেছে বলে দাবি ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের। সেই হিসাবে লাভ লুটে নিয়েছে ১৭ কোটি টাকা। গত কয়েকদিনে লুটে নিয়েছে কয়েক কোটি টাকার অতিরিক্ত মুনাফা।

চাক্তাই আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আহসান খালেদ বলেন, ‘আমদানিকারকেরা শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেল তারা। চট্টগ্রামে আমদানিকারক নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে কমিশন ভিত্তিতে পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়। তবে দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার পর কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে আমদানিকারকরা। দালালের মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি করেছে। আড়তদাররা কিনে এনে পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন।

কার্গো বিমানে পেঁয়াজ আসছে আজ : কার্গো বিমানে আমদানি করা পেঁয়াজের প্রথম চালান ঢাকায় গতকাল পৌছাতে পারেনি। আজ বুধবার এই চালান আসছে। গতকাল এ তথ্য জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, বিমানে আমদানি করা পেঁয়াজের প্রথম চালান মঙ্গলবার আসার কথা ছিল। কিন্তু লোডিংয়ে সমস্যা হওয়ায় ২৪ ঘণ্টা পিছিয়েছে। মন্ত্রী বলেন, পেঁয়াজ নিয়ে বিপদে আছি। তবে বাজারে পেঁয়াজের দাম অনেকটাই কমেছে। পেঁয়াজ লোডিংয়ে সমস্যা হওয়ায় ২৪ ঘণ্টা পিছিয়েছে। তিনি বলেন, বিমানে আনা পেঁয়াজ টিসিবির মাধ্যমে বিক্রি হবে। এ ক্ষেত্রে সরকার ভর্তুকি দেবে। বুধবার পেঁয়াজবাহী কার্গো প্লেন দেশে পৌছাঁলেই চার-পাঁচশ ট্রাক ভরে সারাদেশে ছড়িয়ে দেব, যাতে সব জায়গায় দামটা কমে যায়।

The Post Viewed By: 105 People

সম্পর্কিত পোস্ট