চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩:৪১ পূর্বাহ্ন

মিজানুর রহমান হ চবি

স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে অনন্য উচ্চতায় চবি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দিবস কাল ৫৩ বছর পূর্ণ করে এখন ৫৪তে পদার্পণের অপেক্ষা

অর্জন এবং সাফল্যে ৫৩টি বছর পার করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘপথ চলায় এই বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে কত রথী-মহারথী। ১৯৬৬ সালে গড়ে তোলা বিশ্ববিদ্যালয় নামক গাছটি এখন রূপ নিয়েছে বটবৃক্ষে। তৎকালীন সময়ে স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হওয়া তরুণেরা ঝুঁকে পড়েছে বার্ধক্যে। তবুও বিশ্ববিদ্যালয় নামক স্থানটি এখনো তারুণ্যের পদচারণায় মুখর। এখনো ক্যাম্পাসে গেলে মায়ায় পড়তে হয় সাবেকদের। এখনো ফেলে আসা দিনের কথা স্মৃতির মনিকোঠায় আছড়ে পড়ে। ভোরের আলোয় চারদিক ছড়িয়ে পড়তেই শাটলের হুইসেলে প্রাণ ফিরে পায় প্রকৃতির

কোলজুড়ে নয়নাভিরাম সবুজের এই ক্যাম্পাস। দেশের অন্যতম সেরা এই বিদ্যাপীঠ সমৃদ্ধ হয়েছে উপমহাদেশের খ্যাতিমান ভৌত বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. জামাল নজরুল ইসলাম, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন, অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আবুল ফজল, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সৈয়দ আলী আহসান, মুর্তজা বশীর, ঢালী আল মামুন, সাবেক ইউজিসির চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মান্নানসহ দেশবরেণ্য বহু কীর্তিমান মনীষীর জ্ঞানের আলোয়। শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির যথেষ্ট সুনাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মো শাহাদাত হোসেন দুটি নতুন মাছের প্রজাতি আবিষ্কার ও শনাক্ত করেছেন, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী রক্ষা ও গবেষণায় অবদানের জন্য আরেক শিক্ষক মনজুরুল কিবরিয়া পেয়েছেন দেশি-বিদেশি নানা সম্মাননা, ড. শেখ আফতাব উদ্দিন কম খরচে সমুদ্র পানি সুপেয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার, ড. আল আমিনের লেখা বই যুক্তরাষ্ট্রের ৬ টি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেফারেন্স বুক হিসেবে নির্বাচন, অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী বঙ্গোপসাগর নিয়ে মানচিত্র তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক স্ব স্ব ক্ষেত্রে রেখেছেন প্রতিভার স্বাক্ষর। পিছিয়ে নেই শিক্ষার্থীরাও। ব্যাঙের নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করে সর্বকনিষ্ঠ বিজ্ঞানী হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ছাত্র সাজিদ আলী হাওলাদার, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে চবির ক¤িপউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র শাখাওয়াত হোসেন ও তার দলের নাম ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে, সাফ গেমসে স্বর্ণপদকজয়ী মাহফুজা খাতুন শিলা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছিলেন। এছাড়া সম্প্রতি গুগলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন সুমিত সাহা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তুলে নেন নিজেদের কাঁধে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গর্ভনর, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক, সদ্য সাবেক মন্ত্রী পরিষদ সচিবসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ১১জন সচিব ও ৩০ জন অতিরিক্ত সচিব পদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চবির সাবেক শিক্ষার্থীরা।

৫৩ বছর আগে চারটি বিভাগ নিয়ে চালু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টির এখন ৪৮টি বিভাগ ও ৭টি ইনস্টিটিউট।
কেবল গবেষণা আর পড়াশুনা নয়, দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে এ বিশ্ববিদ্যালয় রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। ৬৯’র গণঅভুত্থান, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০’র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যার সাক্ষী। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চবির কমপক্ষে ১৫ জন মহানায়ক তাদের নিজের জীবন বিলিয়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মো. হোসেন পেয়েছেন বীর প্রতীক খেতাব।

সবুজ ঘেরা ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন নজরকাড়া সব স্থাপত্যকর্ম। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধানিবেদনের জন্য রয়েছে স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ, শহীদ মিনার। মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বীর সন্তানদের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখেই নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি সম্বলিত “বঙ্গবন্ধু চত্বর”। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্য ‘জয় বাংলা’। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’ ও ‘বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ’। বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপে যেকোনো বিষয়ে গবেষণার ওপর এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি, দুষ্প্র্রাপ্য ও দুর্লভ বই, সাময়িকী, পত্র-পত্রিকা, জার্নাল ও পান্ডুলিপিসহ তিন লক্ষাধিক বইয়ের একটি বিশাল সংগ্রহশালা। বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরে রয়েছে দুর্লভ বেশকিছু সংগ্রহ। এছাড়া দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত সেতু, পাহাড়, ঝরণা, লেক, পাখি, হরিণসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র্য এ ক্যাম্পাসকে করেছে অতুলনীয় ও মনোমুগ্ধকর। একে খান আইন অনুষদ ভবনসহ নানা স্থাপনায় ভরপুর এই বিশ্ববিদ্যালয়। ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে শিক্ষার্থীরা সার্বক্ষণিক ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। পড়ালেখা পাশাপাশি খেলাধুলায় চবির শিক্ষার্থীদের ঈর্ষণীয় সাফল্য। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় বিতর্ক সংগঠন চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (সিইউডিএস) সদস্যরা দেশে-বিদেশে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন।

এত অর্জনের মাঝে বিশ^বিদ্যালয়ে রয়েছে নানা সংকট। তন্মধ্যে যাতায়তে দুর্ভোগ, হলে আসন সংকট অন্যতম। তবুও এগিয়ে চলছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে সময়ের চাকায় চড়ে আগামীকাল সোমবার ৫৩ বছর পূর্ণ করতে চলেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এই উপলক্ষে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে সকলে অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নব নিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শিরীণ আখতার। বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের প্রথম এই নারী উপাচার্য বলেন, ‘সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ৫৩ বছর পার করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে আমি আমার সাধ্য মত চেষ্টা চালিয়ে যাব। আমার সুদক্ষ সহকর্মীদের সাথে নিয়ে আগামীতে পথ চলতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে গুরু দায়িত্ব আমার কাঁধে রাষ্ট্রপতি দিয়েছেন। তা সৎ ও নিষ্ঠার সাথে পালন করবো। আর এই পথ চলায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে একটি পরিবারের মত এগিয়ে যেতে চাই।’

The Post Viewed By: 661 People

সম্পর্কিত পোস্ট