চট্টগ্রাম বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯

১০ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩:২৮ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক হ ঢাকা অফিস

উপকূলে আঘাত হেনেছে ‘বুলবুল’

হ সুন্দরবনে আঘাত হেনে কিছুটা দুর্বল হ সরিয়ে নেয়া হয়েছে ১৭ লাখ মানুষ হ পশ্চিমবঙ্গে দুইজনের মৃত্যু

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হেনে অতি প্রবল থেকে কিছুটা দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়েছে ‘বুলবুল’। উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ আরও উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে প্রায় ৮ কিমি/ঘণ্টা বেগে অগ্রসর হয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে খুলনা উপকূল (সুন্দরবনের কাছ দিয়ে) অতিক্রম শুরু করেছে। শনিবার (৯ নভেম্বর) রাত ১১টায় এটি বর্তমানে উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম এলাকায় অবস্থান করছিল। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দেওয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বুলেটিনে (২৭ নম্বর) এমন তথ্যই জানানো হয়েছে।

গতকাল রাত ১১টায় আবহাওয়া অফিসের ২৭তম বুলেটিনে জানানো হয়, অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার। যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।
এর আগে রাত সাড়ে ১০টায় ভারতের আবহাওয়া বিভাগ জানায়, ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। বুলবুল পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসতে আরও ঘণ্টা দুয়েক সময় লাগতে পারে। বুলবুলের প্রভাবে ভারতের ওড়িশা ও কলকাতায় ভারী বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় বহু গাছ উপড়ে গেছে, মৃত্যু হয়েছে অন্তত দুজনের। ঘূর্ণিঝড়টির ব্যাসার্ধ ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। ঝড়টি ঘণ্টায় ১২ কিলোমিটার গতিতে উত্তরপূর্ব দিকে এগোচ্ছে।
এদিকে সরকারের প্রস্তুতি তুলে ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনা অনুযায়ী উপকূলীয় অঞ্চলে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার লোক সরিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, জনগণের পাশাপাশি নৌযান শ্রমিকসহ সাগরে থাকা সকলকে সরিয়ে আনা হয়েছে। এ সব কাজে নৌবাহিনী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ সার্বক্ষণিক তদারকি করে চলেছে। তাছাড়া, প্রস্তুত রাখা হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ১৫৪৬টি স্বাস্থ্য টিম।

ঘূর্ণিঝড়ের জন্য মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে নয় নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো নয় নম্বর মহবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।
কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে চার নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এছাড়া বুলবুল অতিক্রমের সময় উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৮০-১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এর আগে গতরাত সাড়ে ৭টা নাগাদ বাংলাদেশে আঘাত হানে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। ঘূর্ণিঝড়ের অগ্রবর্তী অংশ সুন্দরবনের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অংশের উপকুলে প্রথমে আঘাত হানে। তছনছ করে দিয়েছে দুবলার চরের অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) দুবলারচর ভিএইচএফ স্টেশনের অপারেটর মো. কাশেম এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের দুবলারচরের অস্থায়ী শুঁটকি পল্লী এলাকার আলোরকোল, মেহেরআলীর চর, মাঝেরকেল্লা, অফিসকিল্লা ও শেলারচরে ২২ বছর আগে নির্মিত হওয়া জরাজীর্ণ ৫টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে ৬ হাজারেরও বেশি জেলেরা আশ্রয় নিতে পেরেছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে স্থান সংকুলন না হওয়ায় শুঁটকি পল্লীসহ ঝড়ের কারণে সাগর থেকে আসা আরও কয়েক হাজার জেলে নৌযানে করে ছোট-ছোট খালে আশ্রয় নিয়েছে।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর দুপুরে সিডর এভাবেই প্রথমে আঘাত হানে এবং বিকাল থেকে তা প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতিবেগে দুবলার চরের জেলে পল্লীগুলি তছনছ করে দেয়। সিডরের মতই বুলবুলের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলে এ দিন জানান আবহাওয়াবিদরা।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ পরবর্তী দুর্যোগ মোকাবিলায় আধুনিক সরঞ্জাম নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর বিশেষ দল। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ মোকাবিলায় ও দুর্যোগ পরবর্তী সব প্রকার সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব পদাতিক ডিভিশন। ইতিমধ্যে সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন সম্পন্ন হয়েছে।

নৌবাহিনীর তরফে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়- ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম, সেন্টমার্টিন ও খুলনাসহ উপকূলীয় এলাকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ১০টি যুদ্ধজাহাজ ও নৌ কন্টিনজেন্ট প্রস্তুত রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, সাতক্ষীরায় ৫টি, চট্টগ্রামে ৩টি ও সেন্টমার্টিনে ২টি যুদ্ধজাহাজসহ নৌ কন্টিনজেন্ট ও মেডিকেল টিম মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া বিভাগের (বিএমডি বা বাংলাদেশ মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট) বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এ বার বাংলাদেশের উপকূলবর্তী ১৯ জেলায় ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’ এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর মধ্যে ১৩ জেলা বেশি ঝুঁকিতে। ঝড়ের সঙ্গে উপকূলীয় জেলা এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরাঞ্চলে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-৭ ফুট উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাস হতে পারে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম রুহুল কুদ্দুস বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের জন্য সুন্দরবন একটা বড় বাধা বলতে পারেন। এ বন আমাদের অনেকটাই রক্ষা করবে। যেহেতু এটা প্রবল ঘূর্ণিঝড়, তারপরও এবারও ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, রাত ৯টার দিকে জোয়ারের বা জলোচ্ছ্বাসের সর্বোচ্চ উচ্চতা ২ দশমিক ৮৫ মিটার হতে পারে পশুর নদীতে। পশুর নদী ছাড়াও খুলনা ও বরিশালে যেসব নদীতে জোয়ার থাকবে সেখানে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

The Post Viewed By: 100 People

সম্পর্কিত পোস্ট