চট্টগ্রাম বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯

৯ নভেম্বর, ২০১৯ | ৪:৪৯ পূর্বাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

কাল জশনে জুলুসে উৎসব

মুখর হবে নগরী ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) হ জুলুসে সমাগম হবে ৬০ লাখ লোকের হ থাকবে কঠোর নিরাপত্তা

১৯৭৪ সালের কথা। নগরীর ভলুয়ারদিঘির খানকাহ থেকে মাত্র হাজার দুয়েক লোক শুরু করেছিলেন জশনে জুলুস। হযরতুল আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ’র (রহ.) নির্দেশনায় ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে পবিত্র জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) জুলুস বের হয়েছিল। প্রতিবছর জুলুসের পরিধি ও জৌলুস বাড়ছে। এবার ৬০ লাখের বেশি লোক সমাগমের আশা করছেন আয়োজকরা। জুলুসকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্টেপলিটন পুলিশ।

আগামীকাল ১২ রবিউল আউয়াল, রবিবার পবিত্র জশনে জুলুসে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (স.)। এদিনে পৃথিবীতে তশরিফ এনেছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন, তাজেদারে মদীনা প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তাফা (স.)। মহানবী (স.) এর আগমন উপলক্ষে আঞ্জুমান এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট প্রতিবছরের ন্যায় এবারও জশনে জুলুসে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (স.) এর আয়োজন করছে। এই উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা ও আলমগীর খানকাহ শরীফে মাস দুয়েক ধরে প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ৪৬ বছরের ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম’র জশনে জুলুস এবার হবে ৪৮তম আয়োজন। আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট আয়োজিত এ জুলুস শুরু হবে সকাল ৮ টায়। চট্টগ্রাম’র এই জশনে জুলুস অদূর ভবিষ্যতে জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য হবে বলে আনজুমান ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

শুরুর কথা : ১৯৭৪ সালে ভলুয়ারদিঘিস্থ খানকাহ থেকে জুলুস শুরু হয়। পরের বছর থেকে জুলুসে নেতৃত্ব দেন রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরিকত হযরতুল আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ (ম.)। ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত ভলুয়ারদিঘি এলাকা থেকে জুলুস বের হয়ে আসছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় জুলুসের পরিধি বাড়তে থাকে। লোক সমাগম সংকুলান না হওয়ায় ১৯৮৪ সাল থেকে স্থান পরিবর্তন করে ষোলশহর আলমগীর খানকাহ শরীফে আনা হয়। বর্তমানে ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ থেকে জুলুস অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ১৯৮৬ সাল থেকে সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহর (ম.) জুলুসে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। আগামীকালও জুলুসে নেতৃত্ব দিবেন তিনি। ইতিমধ্যে তিনি আলমগীর খানকাহ শরীফে অবস্থান করছেন। এতে আরো অংশগ্রহণ করবেন শাহাজাদা হযরতুলহাজ্ব আল্ল­­ামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ মাদ্দাজিল্লুহুল আলী ও শাহাজাদা আল্ল­­ামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামিদ শাহ্ মাদ্দাজিল্লুহুল আলী। এদিকে,গতকাল শুক্রবার হুজুর কেবলায়ে আলম’র খেতাবতে নামাজে জুমা মোহাম্মদপুরস্থ মসজিদ-এ-তৈয়্যবিয়ায় অনুষ্ঠিত হয় এবং হুজুর কেবলায়ে আলম ও সাহেবজাদাদ্বয় উক্ত দিন বাদ মাগরিব ঢাকা থেকে বিমানযোগে পুনরায় চট্টগ্রাম প্রত্যাবর্তন করেন। উল্লেখ্য, ওইদিন বাদ মাগরিব হতে এশা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ষোলশহরস্থ আলমগীর খানকাহ্-এ-কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়ায় অনুষ্ঠিত পবিত্র গেয়ারভী শরীফে হুজুর কেবলায়ে আলম ছদারত করেন। আজ শনিবার ( ৯ নভেম্বর) হুজুর কেবলায়ে আলম’র ছদারতে বেলা ৩টা হতে দায়ের খায়র মাহফিল জামেয়ার জুলুস ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে।
বর্ণিল সজ্জা : জশনে জুলুস ও মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ষোলশহর জামেয়া আহমাদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসার দুটি মাঠে শামিয়ানা-প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে। মাদ্রাসা, খানকাহ ও আশপাশের ভবনগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে। মাঠের এক কোণে চলছে মেজবানির আয়োজন। এলাকা জুড়ে চলছে ঈদের আমেজ। শুধু তাই নয়, নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়াও অলিগলির সড়কগুলোতে শোভা পাচ্ছে চোখ ধাঁধানো আলোকায়ন, কালেমা খচিত ব্যানার, ডিজিটাল পোস্টার, ফেস্টুন ও তোরণ। বর্ণিল সাজে সেজেছে নগরী। চলছে মাইকিং। এছাড়াও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোয় মাইক লাগিয়ে বিরামহীনভাবে মাইকিং ও হামদ্-না’ত চলছে।

জুলুসের রোডম্যাপ : আগামীকাল রবিবার সকাল ৯টায় জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ থেকে জুলুস বের হবে। এটি বিবিরহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুল, কাতালগঞ্জ, চকবাজার, প্যারেড কর্নার, সিরাজদ্দৌল্লা সড়ক, আন্দরকিল্লা, মোমিন রোড, চেরাগী পাহাড়, প্রেসক্লাব, কাজির দেউড়ি, আলমাস, ওয়াসা, জিইসি মোড়, মুরাদপুর হয়ে পুনরায় জামেয়া মাদ্রাসা মাঠে মিলিত হবে। সেখানে জোহরের নামাজ, ওয়াজ-নসিহত, মিলাদ-কেয়াম ও মুনাজাতের মাধ্যমে কর্মসূচি সমাপ্ত হবে। এছাড়া এবারের জুলুসে কাজীর দেউড়ি মোড়ে অস্থায়ী মঞ্চে হুজুর কেবলা বক্তব্য রাখবেন ও দেশের শান্তি কামনায় মোনাজাত করবেন।

লোক সমাগম : চট্টগ্রাম জেলা, কক্সবাজার, তিন পার্বত্য জেলা ছাড়াও দেশের ৪৫টি জেলা থেকে ভক্ত, অনুরক্ত, মুরিদান, শুভাকাক্সক্ষীরা জুলুসে অংশ নিবেন। ইতিমধ্যেই দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চল ও জেলা থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসা ও খানকাহ শরীফে আসতে শুরু করেছে। ৬০ লাখের বেশি মানুষের সমাগমের আশা করছেন আয়োজকেরা। নারায়ে তাকবির, আল্লাহ আকবর/নারায়ে রেসালত, ইয়া রাসুলাল্লাহ (স.) এবং নবী করিম (স.) শানে দরূদ-সালাম, নাতে রাসুল গেয়ে পায়ে হেঁটে জুলুসে অংশ নিবেন। অগুণিত মানুষের স্লোগানে স্লোগানে ও নাতে-রসুলের সুমধুর সুরে মুখরিত হয়ে উঠবে চট্টগ্রাম। জশনে জুলুছে আগত ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের বহনকারি যানবাহন কর্ণফুলী শাহ আমানত ব্রিজ, অক্সিজেন, এ কে খান ও কুয়াইশ এলাকায় এসে থেমে যাবে। নগরীর অভ্যন্তরে যানজট এড়াতে এ ব্যবস্থা নিয়েছে আয়োজকরা।

নিরাপত্তা : লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে আয়োজিত জুলুসের নিরাপত্তা নিয়ে সচেষ্ট থাকে আয়োজকরা। গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে টহল পুলিশের পাশাপাশি জুলুসের মিছিল যেসব সড়ক প্রদক্ষিণ করবে সেই সব সড়কে পাশ্ববর্তী বিভিন্ন ভবনের ছাদে পুলিশের পাহারা থাকবে। এছাড়াও নিরাপত্তায় আঞ্জুমান সিকিউরিটি ফোর্সের (এএসএফ) পোশাকধারী সদস্য থাকবেন তিন শতাধিক। সাদা পোশাকে নিয়োজিত থাকবেন আরও চারশ। স্বেচ্ছাসেবক থাকবেন আরও তিন হাজার লোক। জুলুস উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের পাশাপাশি অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে বলে জানিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। পোশাকধারী পুলিশের সঙ্গে সাদা পোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন।
আপ্যায়ন : জুলুসের আয়োজন উপলক্ষে কয়েকদিন আগ থেকে মেজবানি খাবার ও তবরুকের ব্যবস্থা করা হয়। মূলত দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুরিদ, ভক্ত, অনুরক্ত, স্বেচ্ছাসেবক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও জুলুসের কাজে নিয়োজিতদের জন্য খাবার ব্যবস্থা রয়েছে। জুলুস ও মিলাদুন্নবীর দিনেও তবরুকের ব্যবস্থা থাকে। এছাড়াও গাউসিয়া কমিটির বিভিন্ন শাখার পক্ষ থেকেও তবরুকের আয়োজন করে থাকে।

The Post Viewed By: 324 People

সম্পর্কিত পোস্ট