চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৯ নভেম্বর, ২০১৯ | ৪:৪৮ পূর্বাহ্ন

ইমাম হোসাইন রাজু

ছোট পদের ‘বড়কর্তা’ নজরুল

হ নগরে স্ত্রীর নামে আড়াই কোটি টাকার ফ্ল্যাট হ বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি হাটহাজারীতে হ অফিস না করেই তোলেন বেতন

চাকরি করেন চেইনম্যানের (শিকল বাহক)। তবে দাপট বড় কর্তার চেয়েও বেশি। কথায় কথায় দিয়ে থাকেন চাকরিচ্যুতি ও বদলির হুমকি। দেনা-পাওনার হিসাব নিয়েও তিনি খুব কঠোর। তিনি ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নজরুল ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার বিপুল পরিমাণের নগদ অর্থ ও কোটি টাকার চেকসহ দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হন তিনি। নজরুল ইসলামের এমন অবৈধ কাজে সরাসরি সহযোগিতা করতেন স্বয়ং উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। যার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন ‘হোয়াটসঅ্যাপ’র মাধ্যমে। তার ইন্ধনেই চতুর্থ শ্রেণির এই কর্মচারী কয়েক বছরের ব্যবধানে ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ’ হয়ে গেছেন। শুধু উর্ধ্বতন এই কর্মকর্তাই নয়। নজরুল ইসলামের সাথে সখ্যতা আছে ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কতিপয় কানুনগো, সার্ভেয়ার, অফিস সহকারীর সাথেও। শুধুমাত্র গড়ে তোলা সিন্ডিকেটের কারণেই তাদের সঙ্গে এমন সখ্যতা তার।

দুদকের এই অভিযানের পর একে একে বেরিয়ে আসছে ‘থলের বিড়াল’। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া নজরুল এই সিন্ডিকেটের ৯ সদস্যের নাম উল্লেখ করেছেন দুদকের কাছে। যাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছে দুদক। হয়তো এদের মধ্যে কেউ কেউ ফেঁসে যেতে পারেন, এমন দাবি দুদক কর্মকর্তাদের।
এদিকে, নজরুল ইসলামকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিনের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাকেসহ গ্রেপ্তার হওয়া জেলা প্রশাসান কার্যালয়ের অফিস সহায়ক তসলিম উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
খবর নিয়ে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে অফিস সহায়ক হিসেবে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় যোগ দেন হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুর বালুখালী গ্রামের মরহুম আলী আহমদের ছেলে নজরুল ইসলাম। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে পাখা মেলতে থাকে নজরুলের। একে একে শুরু হয় নজরুল সিন্ডিকেট। মূলত ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রাপ্যতা পেতে এলএ শাখায় যোগাযোগ করলে এই সিন্ডিকেট সদস্যরা প্রথমেই নজরুলের সাথে যোগাযোগ করতে বলতেন। নজরুলের কথায় সাড়া না দিলে নানাভাবে হয়রানি হতে হয় ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিককে। বলা চলে পুরো এলএ শাখা জিম্মি এই চেইনম্যানের হাতে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলএ শাখার এক কর্মকর্তা পূর্বকোণকে বলেন, ‘ তিনি (নাঁংঠ) তথ্য উপাত্ত নিয়ে জমির মালিকদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা উত্তোলন করে দেয়ার প্রলোভন দেখান এবং ঘুষ হিসেবে নগদ টাকা ও অগ্রিম চেক গ্রহণ করেন। তবে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় নজরুলকে একনামে সবাই চেনেন ‘মিস্টার ১২ পার্সেন্ট’ হিসেবে। কেননা প্রতিজনের কাছ থেকে তিনি ১২ শতাংশ টাকা অগ্রিম পাওয়ার পরই কেবল ভূমি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করতেন।

আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ নজরুল : চাকরি মাত্র ২১ বছরের মাথায় পুরোপুরিই ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ’ হয়ে ওঠেছেন চেইনম্যান নজরুল। যিনি গত কয়েক বছরে গড়ে তুলেছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি। যার অধিকাংশ স্ত্রীর নামে রয়েছে। রয়েছে নিজের ব্যবহৃত একটি ‘প্রাডো’ গাড়ি। বৃহস্পতিবার দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযানে এই গাড়ির তথ্যও বেরিয়ে আসে। এছাড়া নগরীর ও. আর নিজাম রোড আবাসিক এলাকার তিন নম্বর সড়কের ‘জুমাইরাহ পয়েন্ট’ নামক একটি ভবনের চতুর্থ তলায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা দিয়ে কিনেছেন একটি ফ্ল্যাটও। ফ্ল্যাটটি কিনেছেন স্ত্রীর নামে। হাটহাজারীর নিজ গ্রামে গড়েছেন বিলাসবহুল দোতলা একটি বাড়ি। এরমধ্যে নগরীর চিটাগাং শপিং সেন্টারে নিজ ও স্ত্রীর নামে কেনা আছে তিনটি দোকান। যার একটি ‘আনুকা ফ্যাশন’, অপরটি ‘ইয়ানা ফ্যাশন’ এবং নিচতলায় ফাস্টফুডের দোকান রয়েছে। এ তিনটি দোকানেই নজরুল সরাসরি দেখাশোনা করেন। নজরুলের বড় ছেলে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন বলেও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।

অফিস না করেই তোলেন বেতন : ২০১৭ সালে বর্তমান ভূমিমন্ত্রীর নির্দেশে এই নজরুল ইসলামকে ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদ অফিসে সংযুক্তি করা হলেও ঠিকমতো অফিস করতেন না নজরুল। শুধু প্রতিমাসের বেতন তুলে নিতেন নির্ধারিত সময়ে । এই কাজেও নজরুলকে সরাসরি সহযোগিতা করতেন উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। যারা নজরুলের মিনি এলএ শাখা হিসেবে পরিচিত ‘আনুকা ফ্যাশন’ নামের এই দোকানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।
জানতে চাইলে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সায়েদুল আরেফিন গতকাল রাতে মুঠোফোনে পূর্বকোণকে বলেন, ‘দুদকের অভিযানের পরই আমি জানতে পেরেছি। শুনেছি গত ৬ মাস আগে তিনি এখানে এসেছেন। তবে ২০১৭ সালে যোগ দিয়েছেন তা জানতাম না। আর উনার কাজ ছিল, চিঠি আদান-প্রদানের। তাই উনাকেও ভালো করে চিনি না’।
রিমান্ডের আবেদন করবে দুদক : দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া নজরুল ইসলাম ও তছলিমকে জিজ্ঞাসাবাদের রিমান্ড আবেদন করবে তদন্তকারী কর্মকর্তা। গতকাল শুক্রবার আদালতে হাজির করা হলেও আগামী সোমবার দুইজনকে আরও জিজ্ঞাসাবদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের পিপি কাজী ছানোয়ার আহমেদ লাভলু পূর্বকোণকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার দুই জনকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের কারাগারে পাঠান। আগামী সোমবার তাদের আবার আদালতে হাজির করা হবে। অধিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তখন তাদের রিমান্ড চাওয়া হতে পারে’।

The Post Viewed By: 104 People

সম্পর্কিত পোস্ট