চট্টগ্রাম শনিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

৮ নভেম্বর, ২০১৯ | ৩:০৭ পূর্বাহ্ন

ইমাম হোসাইন রাজু

দিনে অফিস জেলা প্রশাসনে রাতে বসে ‘আনুকা’য়

এলএ শাখার অবৈধ লেনদেন হ ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাসহ সিন্ডিকেড সদস্য ১০ জন হ জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যাতায়াত হ চলে লেনদেনের ভাগাভাগি

নগরীর ২ নম্বর গেট চিটাগাং শপিং সেন্টারের দ্বিতীয় তলার ‘আনুকা ফ্যাশন’। চারদিকে সাজানো সারি সারি পাঞ্জাবি-শার্ট। সাধারণ দশটি পঞ্জাবির শো-রুমের মতো দেখতে হলেও এর বাস্তব চিত্র খুবই ভয়ংকর। নামমাত্র এ শো-রুমের আড়ালেই চলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার (ভূমি অধিগ্রহণ) সকল অবৈধ লেনদেন। যেখানে কৌশলে দোকানের ভেতর তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট কামরা। এই কামরাতেই প্রতিদিনের যাতায়াত রয়েছে স্বয়ং এলএ শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। গতকাল (বৃহস্পতিবার) দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের অভিযানে এমন চিত্র ওঠে আসে।

অভিযোগ রয়েছে, দিনের বেলায় জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে অফিস করেই সন্ধ্যার পর থেকেই ‘আনুকা ফ্যাশন’র ছোট্ট কামরায় বসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাতের অফিস। যেখানে বসে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ভূমি শাখার টাকা লেনদেনের ভাগাভাগিও হয়ে থাকে। আর এসব কাজ হয় জেলা প্রশাসকের প্রথম সারির এক কর্মকর্তার নেতৃত্বেই। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা নজরুল ইসলাম বাবুকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও বিভিন্ন গ্রাহকের কমিশনের কোটি টাকার চেকসহ গ্রেপ্তারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

এলএ শাখার সিন্ডিকেটের ‘সিগন্যাল’ :

এলএ শাখার অন্তত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীই এই সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করেন। মূল হোতা এলএ শাখার প্রথম সারির কর্মকর্তা হলেও তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন গ্রেপ্তার হওয়া নজরুল ইসলাম। ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা পান, সেই টাকা ছাড় করাতে এই চক্রকে কমিশন দিতে হয়। এই চক্রটি কমিশন না দিলে মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে। নজরুলের ‘আনুকা’ নামের দোকানটি সবার কাছে পরিচিত মিনি এল এ শাখা হিসাবে। যেখানে ছুটির দিনেও চলে এমন অবৈধ লেনদেন। যাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাগজপত্র নিয়ে এখানে আসতে বলা হতো। কমিশন পেলেই তবে টাকা ছাড় পেতেন। যা অগ্রিম দিয়ে দিতে হয় ক্ষতিগ্রস্তদের। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নানাভাবে হয়রানি করে এই সিন্ডিকেট।

দুদক ও এলএ শাখার সূত্রে জানা যায়, কোন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার প্রাপ্যতা আদায়ে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় যোগাযোগ করলে সার্ভেয়ার ও কর্মকর্তারা এই নজরুলের সাথে প্রথমে যোগাযোগ করতে বলেন। আর নজরুল তাদের শপিং কমপ্লেক্সের এই দোকানে নিয়ে এসে কমিশনের বিষয়টি প্রস্তাব দেন। কমিশনের চেক বা নগদ টাকা হাতে পেলে নজরুল ‘সিগন্যাল’ দিতেন এলএ শাখায়। এ সিগন্যাল পাওয়ার পর অফিস সহকারী (নজরুলের আপন চাচাতো ভাই) সায়েম চেক ইস্যু করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তা হস্তান্তর করতেন। আর এসব কাজে সহযোগিতা করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারী। এছাড়া এই সিন্ডিকেটে নাম রয়েছে এলএ শাখার একাউন্ট অফিসার লালু ও অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নিপুতি শীলের। যারা নিয়মিতই ‘আনুকা’ ফ্যাশনের যাতায়াত করেন।

নজরুলের দোকান ও বিলাসবহুল ফø্যাট-গাড়ি :
নজরুল ইসলামের ‘আনুকা ফ্যাশন’ নামের এই দোকান ছাড়াও একই মার্কেটে তার নামে রয়েছে তিনটি দোকান। মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় দুটি এবং অপরটি নিচ তলায়। অভিযান চলাকালিন সময়ে দুদক কর্মকর্তারা নগরীর
ওআর নিজাম রোডের আবাসিক এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান পায়। পরে ওআর নিজাম রোড আবাসিকের ৩ নম্বর রোডের ‘জুমাইরা পয়েন্ট’র চার তলায় ৪০৪ নম্বর ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় দুদক। ওই ফ্ল্যাটটি তার স্ত্রীর নামে কেনা বলে জানিয়েছেন নজরুল। ফ্ল্যাটটির বর্তমান মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা বলে ধারণা করছেন দুদকের কর্মকর্তারা। পাশাপাশি ভবনের গ্যারেজে তার একটি প্রাইভেট কারও পাওয়া গেছে। যা দুদক কর্মকর্তারা জব্দ করেন।

এদিকে এলএ শাখার এই কর্মচারীর নগদ ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং গাড়ির সন্ধান পেয়ে বিস্মিত হন স্বয়ং দুদক কর্মকর্তারা। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটা কিভাবে সম্ভব। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার ফাইল কিভাবে অফিসের বাইরে গেল। কি পরিমাণ দুর্নীতি হলে এ অবস্থা হতে পারে’।
এলএ শাখার নথিপত্র ও গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ শাখা) আমিরুল কায়সার মুঠোফোনে পূর্বকোণকে বলেন, ‘এলএ শাখার নথিপত্রতো দূরের কথা, কোন কাগজ অফিসের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমি বিষয়টি বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদের মাধ্যমে জেনেছি। আর দুদক যে সকল কাগজ উদ্ধার করেছে হয়তো এসব কোন দলিল হবে। এগুলো এলএ শাখার নয়’।

The Post Viewed By: 394 People

সম্পর্কিত পোস্ট