চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২২ অক্টোবর, ২০১৯ | ২:১৪ পূর্বাহ্ণ

মোস্তফা মোহাম্মদ এমরান

মৃত দুই ব্যক্তিকে বিক্রেতা দেখিয়ে জাল দলিলে বিএস খতিয়ান!

চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি

মৃত দুই ব্যক্তিকে বিক্রেতা দেখিয়ে জাল সাফ কবলা তৈরির পর ওই দলিল ভূমি অফিসে দাখিল করে ৭ ব্যক্তির নামে বিএস খতিয়ান তৈরির চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির খবর পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, মৃত দুই ব্যক্তির একজনের মৃত্যু হয় ১৯৭৫ সালের আগে, অন্যজনের মৃত্যু হয় ২০০০ সালের পূর্বে। চন্দনাইশ উপজেলার গাছবাড়িয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রারের নামে সিল-স্বাক্ষর জাল করে উপজেলার বৈলতলী ইউনিয়নের জাফরাবাদ মৌজার ৭ শতক (সাড়ে তিন গন্ডা) ভূমির ক্রেতা দেখানো হয় মোহাম্মদ শাহ আলমসহ ৭ জনকে। আর দলিলদাতা দেখানো হয় জাফরাবাদের মৃত মকবুল আলীর ছেলে আহমদ মিয়া ও আলী আহমদের স্ত্রী মেহরাজ খাতুনকে। দলিলটি সম্পাদন ও রেজিস্ট্রির তারিখ দেখানো হয়েছে ২০০৯ সালের ৯ মার্চ, দলিল নম্বর ৪৬২, যার ক্রমিক নম্বর ৪৬৪। এই ভুয়া ও জাল দলিলটি চন্দনাইশ সহকারী কমিশনার (ভূমি, এসিল্যান্ড) অফিসে দাখিল করে মো. শাহ আলম গংয়ের নামে নামজারি করে নেয় শাহ আলমসহ ৭ জন। নামজারি জমাভাগ মোকাদ্দমা নম্বর-৩-১০৫/২০১৮ মূলে ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিলের এসিল্যান্ডের আদেশে শাহ আলম গংয়ের নামে বিএস নামজারি খতিয়ান ৩০৮৮ সৃষ্টি হয়।

ভুয়া দলিল গ্রহীতার সকলেই চন্দনাইশ জাফরাবাবাদ এলাকার বাসিন্দা। তারা হলেন, মৃত দলিলুর রহমানের ছেলে মো. শাহা আলম, ভেট্টা মিয়ার ছেলে বদিউল আলম, মৃত আলী আহমদ ও দলিলদাতা মিহরাজ খাতুনের ছেলে আবদুল করিম, মৃত আবদুল মোতালেবের ৪ ছেলে এয়ার মোহাম্মদ, শাহির মোহাম্মদ, জয়নাল আবেদীন ও মো. জাকারিয়া। এ ৭ জন পরস্পর চাচাতো-জ্যাঠাতো ভাই বলে জানা গেছে।

পূর্বকোণের অনুসন্ধানে জানা যায়, এ জায়গার মালিক ছিলেন জাফরাবাদ এলাকার সাহেব জান নামের এক মহিলা, সাহেব জানের এক ছেলে আহমেদ মিয়া, দুই মেয়ে আমেনা খাতুন এবং লহ্মীজান। মূলতঃ আমেনা খাতুন ও লহ্মীজানকে বঞ্চিত করতে এ জালিয়াতি করা হয় বলে জানান আমেনা খাতুনের ওয়ারিশ আবদুস সাত্তার। এ ভূমির আহমেদ মিয়ার প্রাপ্ত অংশ আহমেদ মিয়া অনেক আগে মিহরাজ খাতুনের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু জালিয়াতকারীরা অপর দুই ওয়ারিশের অংশসহ আত্মসাত করার উদ্দেশ্যে এ জালিয়াতি করে।

এ ব্যাপারে বক্তব্যের জন্য চন্দনাইশ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিবেদিতা চাকমার মুঠোফোনে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে অফিস সহকারী দিদার ফোনে জানান, রবিবার থেকে তিনি ছুটিতে আছেন। তাছাড়া নামজারির ব্যাপারে অফিসের আরেক কর্মচারী শ্যামলের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
ভুয়া দলিলমূলে নামজারির ঘটনা বিষয়ে জানতে পেরে এ ব্যাপারে পূর্বকোণের অনুসন্ধানে নানা বিষয় উঠে আসে। গাছবাাড়িয়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাসি করে ৪৬২ নম্বর দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলে দেখা যায়, রেজিস্ট্রিকৃত মূল দলিলের সাথে মো. শাহ আলমগংয়ের দলিলের মিল নেই। ওই দলিলের দাতা একই উপজেলার কানাইমাদারীর মৃত শৈলেন্দ্রের ছেলে বিনয় বড়–য়া, আর দাতা হলেন হোছনে আরা বেগম। ওই দলিলের তফসিলের মৌজা কানাইমাদারী।
এদিকে, জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি দলিলে ব্যবহৃত স্ট্যাম্পের সত্যতা যাচাই করতে চট্টগ্রাম ট্রেজারি অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, দলিলটিতে ব্যবহৃত চ- ৫০২৭৩৬২ স্ট্যাম্পটি ট্রেজারি থেকে বাজারে সরবরাহ করা হয় ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর, চ-৬৫০৬৯২৭-৯ নম্বরের স্ট্যাম্প তিনটি ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর, ট-৩১৪৭০৯৭ থেকে ৩১৪৭১০৫ সিরিয়ালের ৫টি স্ট্যাম্প বাজারে ছাড়া হয় ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি। অথচ, এসব স্ট্যাম্প ব্যবহার করে যে সাফ কবলাটি তৈরি করা হয়েছে তার রেজিস্ট্রি তারিখ দেখানো হয় ২০০৯ সালের ৯ মার্চ।

এদিকে, সম্পত্তির বিরোধ নিয়ে দাতা আহমদ মিয়াকে বিবাদি করে ’৭৩ সালে একটি পক্ষ পটিয়া মুন্সেফ আদালতে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন। পটিয়া দ্বিতীয় মুন্সেফ আদালতের মামলা নম্বর ৩৮/১৯৭৩। এ মামলার ৯ নম্বর বাদি ছিলেন আহমেদ মিয়া। আহমেদ মিয়ার ওয়ারিশরা ওই মামলায় ১৯৭৫ সালে হাজির হয়ে আহমেদ মিয়ার মৃত্যুসনদ দাখিল করেন এবং আহমেদ মিয়ার স্থলে ১৯৭৫ সালের ১০ ডিসেম্বর মামলায় বিবাদি হিসেবে পক্ষভুক্ত হন। অপরদিকে, খোদ জাল দলিলের গ্রহীতাগণ চন্দনাইশ সহকারী জজ আদালতে দায়ের হওয়া অপর – ২৪/২০০০ নম্বর মামলার আরজিতে স্বীকার করেন, মেহেরাজ খাতুন অনেক আগে মৃত্যুবরণ করেছেন।

এদিকে, জাল দলিলের দাতা হিসেবে দেখানো আহমদে মিয়া ও মেহেরাজ খাতুনের জাতীয় পরিচিতি নম্বর উল্লেখ করা হয় যথাক্রমে ১৫১১২৯৫১৭১১৬৯ ও ১৫১১২৯৫১৭১০৩৬। এ নম্বর দুটি চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচনী অফিসে খোঁজ করে পাওয়া যায়নি। এদিকে, জাল দলিলের গ্রহীতার মধ্যে মিহরাজ খাতুনের ওয়ারিশ আবদুল করিমও রয়েছেন। দলিলে আবদুল করিমের বয়স উল্লেখ করা হয়েছে ৭০ বছর, আর তার মা মেহেরাজ খাতুনের বয়স উল্লেখ করা হয় ৬৯ বছর।
একাধিক আইনজীবী বলেন, সঠিক দলিল দাখিল করার পরও নামজারি করার ক্ষেত্রে সরেজমিনে তদন্ত করতে হয়। ঘটনাস্থলে যেতে হয়। যাদের খতিয়ান থেকে জায়গা কর্তন করে নামজারি করা হবে তাদেরকেও নোটিস দিয়ে জানাতে হয়। এক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বা কর্মচারী অফিসে বসেই সার্ভে রিপোর্ট দিয়ে দেন বলে এরকম ঘটনা ঘটেছে। সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গেলে দলিল জাল হওয়ার ঘটনা ধরা পড়তো। তারা বলেন, জাল দলিলে ব্যবহৃত স্ট্যাম্পগুলো ট্রেজারি থেকে বের হয় ২০১৮ সালের ১৫ জানুয়ারি, আর নামজারির আদেশ হয় ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল। তাই এ জালিয়াতি সম্পন্ন হয়েছে ১৫ জানুয়ারির পর থেকে এ সাড়ে তিন মাসে।
জানতে চাইলে ভুয়া দলিলের গ্রহীতা বদিউল আলম পূর্বকোণকে বলেন, এ দলিলের ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আমি ভুয়া করিনি। আমার চাচাতো ভাইয়েরা এসব জানেন। তার চাচাতো ভাই কারা জানতে চাইলে তিনি দলিলের গ্রহীতা এয়ার মোহাম্মদসহ ৪ ভাই ও অন্যান্য গ্রহীতার কথা উল্লেখ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা আমাকে দলিলে স্বাক্ষর করতে বলেছে তাই করেছি। আমি কিছু জানি না। এক পর্যায়ে জাল দলিলমূলে নামজারি করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, নিরূপায় হয়ে এসব করা হয়েছে।

জাল দলিলের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ জাফরাবাদ ইউনিয়নের শামসুল ইসলামের ছেলে জিয়াউল হক বলেন, মেহেরাজ খাতুনের মৃত্যুর পর আদালতে খতিয়ান সংশোধনীর একটি মামলা হয়। ওই মামলায় মেহেরাজ খাতুন মৃত্যুবরণ করেছেন বলে উল্লেখ করেন তার ওয়ারিশরা। কিন্তু সুবিধা করতে পারবে না দেখে মামলার বাদি মামলাটি আর চালায়নি। পরে তারা আমাদেরকে খরিদা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য এ জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেয়।

জানতে চাইলে জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মোহাম্মদ আইয়ুব খান পূর্বকোণকে বলেন, যে কোন ভূমির নামজারি করার সময় সরেজমিনে তদন্ত করতে হয়। ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার একটি সার্ভে রিপোর্ট দেয়। তিনি বলেন, মৃত মানুষকে দাতা দেখিয়ে ভুয়া দলিল তৈরির পর ওই দলিলে নামজারি খতিয়ান হওয়ায় এটা সুস্পষ্ট যে, সার্ভেয়ার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে সরেজমিনে তদন্ত করেননি। তাই এর দায় জালদলিল তৈরিকারীর মতো সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসও এড়াতে পারেন না। সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট শেখ ইফতেখার সাইমুল চৌধুরী বলেন, এজন্য ভূমি অফিসের গাফিলতিকে দায়ী করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

The Post Viewed By: 685 People

সম্পর্কিত পোস্ট