চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ২:৩৭ am

নিজস্ব প্রতিবেদক

আমদানি না করেই তালিকায়!

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লিস্টে ৮ জন’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৮ আমদানিকারকের পেঁয়াজ আমদানির তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিস্ফলা অভিযানে তালিকাভুক্তরা জানিয়েছেন, এক বছরের মধ্যে পেঁয়াজ আমদানি করেননি তারা। কয়েক জনের অস্তিত্বও নেই। আমদানির সত্যতা খুঁজে না পাওয়ায় অঙ্গীকারনামা নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার নেপথ্যে আমদানিকারকদের দুষে আসছে কমিশন এজেন্ট ও আড়তদাররা। সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বার বার বৈঠক করার পরও বাজার স্থিতিশীল করতে পারছে না। আমদানিকারকদের কারসাজির কারণে বাজার অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে দাবি আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের। সেই সূত্র ধরে আমদানিকারকদের নাগাল টেনে ধরার কৌশল নেওয়া নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন জানান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ৮ পেঁয়াজ আমদানিকারকের নাম পাওয়া গেছে। তারা কী পেঁয়াজ আমদানি করেছে, নাকি পেঁয়াজ আমদানির নামে অন্য কোনো পণ্য আমদানি করেছে তা খুঁজে বের করা হবে। যদি পেঁয়াজ আমদানি করে সংকট সৃষ্টি করা হয়, তাহলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ৮ আমদানিকারক হলো, এফ এইচ এ ট্রেডার্স, ঠিকানা হচ্ছে আমানত খান টাওয়ার। পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা ব্যবহার করা হয়নি। ১২১ খাতুনগঞ্জের ফরহাদ ট্রেডিং, আনন্দ মার্কেটের এম এন্ড এম ট্রেডিং। আগ্রাবাদ হাজিপাড়ার ২১নং হালিশহর রোডের শওকত এন্টারপ্রাইজ। মাঝিরঘাটের ৩৭৯/১ ইস্টার্ন রোডের আরটিএস ট্রেডিং এজেন্সি। আগ্রাবাদ শেখ মুজিব রোডের ওয়ালি ম্যানশনের মেসার্স এ আর ট্রেডার্স, আন্দরকিল্লা হাজারী লেনের মেসার্স বসুন্ধরা ইন্টারন্যাশনাল। আগ্রাবাদের দারে শহীদী ভবনের (তয় তলা) প্রগ্রেস ট্রেড ওভারসীজ।

এই ৮ আমদানিকারকের খুঁজে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কাট্টলি সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌহিদুল ইসলাম দুপুর থেকে নগরী আগ্রাবাদ ও হালিশহর রোড এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন।
সরেজমিন দেখা যায়, আগ্রাবাদ প্রগ্রেস ট্রেড ওভারসিজ হচ্ছে একটি সিএন্ডএফ কার্যালয়ের ভেতরে সাব-অফিস ভাড়া নিয়েছে। মালিক মো. জাকারিয়া জানান, ২০১৮ সালে ভারত থেকে একশ টন করে দুইদফায় পেঁয়াজ আমদানির এলসি করেছিল। দুই দফায় ৪০ ও ৩০ টন করে ৭০ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছিলেন। সেবার বিপুল পরিমাণ লোকসান দেওয়ার পর আর পেঁয়াজ আমদানি করেননি। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকা তার নাম কীভাবে এল-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হয় তো ভুলশবত তার নাম এসেছে। তিনি দাবি করেন, তার জানামতে চট্টগ্রামে কেউ পেঁয়াজ আমদানি করে না। ভারতীয় স্থলবন্দর সীমান্তবর্তী আমদানিকারকেরা পেঁয়াজ আমদানি করে।

হালিশহর রোডের হাজিপাড়ার শওকত এন্টারপ্রাইজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। মালিক শওকতুল ইসলাম বলেন, মামার অফিস ব্যবহার করেছেন। এখন তিন ব্যবসা করেন না, চাকরি করেন। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ২১ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছিলেন তিনি। তিনি দাবি করেন, সেবার এক লাখ ২৫ হাজার টাকা লোকসান দেওয়ার পর আর পেঁয়াজের ব্যবসা করেননি।
আগ্রাবাদ ওয়ালি ম্যানশনের এ আর ট্রেডিংয়ের কার্যালয়ের দেখা যায়, মেসার্স রিজিয়া ট্রেড এন্টারন্যাশনালের নামে একটি কার্যালয়ে সাব-অফিস করেছে। মালিক পূজন গুহ বলেন, চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি একশ টন পেঁয়াজ আমদানি করেছেন। এরপর আর পেঁয়াজ আমদানি করেননি তিনি। তিনি বলেন, তার লাইসেন্স ও অন্যান্য ডক্যুমেন্ট হালনাগাদ করা হয়নি।
সকালে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন খাতুনগঞ্জের এম এন্ড এম ট্রেডিংয়ের মালিক মো. গিয়াস উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাল, ডালসহ ভোগ্যপণ্য আমদানি করি। কখনো পেঁয়াজ আমদানি করিনি।’ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকা তার নাম কীভাবে এল-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। ব্যাংক ও অন্যান্য ডক্যুমেন্ট খতিয়ে দেখলে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে।’

জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাওয়া তালিকায় চট্টগ্রামের ৮ আমদানিকারকের নাম পেয়েছি। চলতি বছরের আগস্ট মাসে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এসলি খুলেছিল বলে সেই তথ্যে বলা হয়েছিল। চার আমদানিকারকের কার্যালয় পরিদর্শন ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা যায়, তাদের কেউ এখন আর পেঁয়াজ আমদানি করে না। অধিকাংশই মৌসুমি আমদানিকারক এবং অন্যের অফিসে সাব-অফিস ভাড়ায় নিয়ে অফিস খুলেছে। বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লিখা হবে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তৌহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে তাদের তথ্য দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে পেঁয়াজ আমদানির তথ্য পাওয়া গেলে রাষ্ট্রীয় আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড এন্ড ইন্ড্রাস্ট্রিস এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগির আহমদ বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে পেঁয়াজ আমদানি করে থাকে।’

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘চট্টগ্রামে পেঁয়াজের আমদানিকারক নেই। ভারত সীমান্তবর্তী আমদানিকারক ও কমিশন এজেন্টের মাধ্যমে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে পেঁয়াজ সরবরাহ করা হয়। এখানে শুধু কমিশনভিত্তিতে পেঁয়াজ বিক্রি করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারত সীমান্তের সোনা মসজিদ, হিলি, ভোমরা, বেনাপুলসহ স্থলবন্দরভিত্তিক আমদানিকারকদের নাম-ঠিকানা সরকারের কাছে রয়েছে। তাদের রোধ করতে না পারলে পেঁয়াজের বাজার সামাল দেওয়া কঠিন হবে।’

The Post Viewed By: 682 People

সম্পর্কিত পোস্ট