চট্টগ্রাম সোমবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ২:২৪ am

সুকান্ত বিকাশ ধর হ সাতকানিয়া

জীবন সংগ্রামে সফল এম এ মোতালেবের সাথে একান্ত আলাপ

শিক্ষকতা ও সরকারি চাকুরি ছেড়ে শিল্পপতি, এখন জনপ্রতিনিধি

‘সাতকানিয়াকে শিল্প নগরী হিসাবে গড়ে তোলাই হবে লক্ষ্য’

এম এ মোতালেব ব্যবসা সফল এক ব্যক্তির নাম। দেশের গ-ি পেরিয়ে বিদেশের মাটিতেও সফল হয়ে বাংলাদেশকে পরিচিত করায় সরকার তাকে দিয়েছেন সি আই পি উপাধি। মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে নির্বাচিত হয়েছেন সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। জীবনের শুরুতে চলার পথে প্রতিটি বাঁকে বাঁকে বন্ধুর পথ মাড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে একাগ্রতা ও সততার মাধ্যমে পাওয়া সফলতার পাশাপাশি তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়ে অনেক পরিবারকে দিয়েছেন রুটি-রুজির সন্ধান। সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন অনেককে। শিক্ষকতা ছেড়ে সরকারি চাকরি। অতঃপর দুর্নীতির গড্ডালিকা প্রবাহে নিজেকে ভাসাতে না পেরে ছেড়ে দেন সরকারি চাকরি। বাবার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর তামাকুমন্ডি লেইনে গিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। সফল হন জীবন সংগ্রামে। আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান নেতা প্রয়াত আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ও দলের প্রধান শেখ হাসিনার পরামর্শে নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে দীক্ষিত হন মানব সেবার মন্ত্রে। এখন জীবনের শেষ বয়সে এসে

সাতকানিয়াবাসীর জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে মনোনিবেশ করতে চান মানব সেবায়। সাতকানিয়ার ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে একত্রিত করে শিল্প নগরী গড়ে তোলে দূর করতে চান বেকার সমস্যা। বাস্তবায়ন করতে চান-প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ‘ গ্রাম হবে শহর’ এ স্লোগানের। আবার দলীয় নেতা কর্মীদের সাথে একাকার হয়ে এগিয়ে নিতে চান নিজের দলকেও। তাঁকে নির্বাচিত করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দলের প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা ও দলীয় নেতা-কর্মীসহ সাতকানিয়ার সর্বস্তরের মানুষের কাছে। সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি বনফুল ও কিষোয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ মোতালেব সি আই পি সম্প্রতি সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের চিববাড়িস্থ গ্রামের বাড়িতে দৈনিক পূর্বকোণের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেন, সহজ, সরল ও সাবলীল ভঙ্গিতে। আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তাঁর জীবনের দুঃখ, বেদনা ও সুখ স্মৃতির পাশাপাশি আগামীর পথ চলার নানা প্রসঙ্গ।

ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে আসার চিন্তা কিভাবে এবং কি কারণে এ প্রসঙ্গে এম এ মোতালেব বলেন, ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলাম। স্বাস্থ্য বিভাগের সরকারি চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় সক্রিয় হওয়াতে রাজনীতিতে অংশ নেয়া সম্ভব হয় নি। ১৯৯২ সালের দিকে দক্ষিণ জেলা আওয়ামীলীগের তৎকালীন সভাপতি বর্ষীয়ান নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয়। বাবু ভাই বলেছেন- জীবনে টাকা-পয়সা বড় নয়, মানুষের বেশি সেবা করার প্রসারিত প্লাটফর্ম রাজনীতি। পরে ২০০৫ সালের দিকে আমাদের নেত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন বাবু ভাই। এ দু’জনের অনুপ্রেরণায় সর্বোপরি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে জিয়াউর রহমান সহ ষড়যন্ত্রকারীরা ইতিহাস বিকৃতির যে নগ্ন খেলায় মেতেছিল তার সঠিক ইতিহাস জনগণের সামনে তুলে ধরতে এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারীদের দেশ-বিদেশে বড় বড় পদে জিয়াউর রহমান অধিষ্ঠিত করেছিলেন, যা ছিল জাতির জন্য খুবই লজ্জার। মূলত এসব কারণে আমার রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা। একই বছর (২০০৫ সাল) আমাকে সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি ও পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে সভাপতি নিবাচিত করা হয়। এসময় থেকে আমি দলীয় কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ি।

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জেতার কৌশল প্রসঙ্গে মোতালেব বলেন, আওয়ামীলীগের সভাপতি হওয়ার পর ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দলীয় নেতা-কর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে। অন্যদিকে,আমার প্রতিষ্ঠান থেকেও দুঃস্থ ও অসহায় মানুষদের সেবা করে যাচ্ছি অনেক আগে থেকে। বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা দিয়েছি। আমি কোনদিন মানুষের সাথে প্রতারণা ও মিথ্যা কথা বলিনি। যেটা হয়েছে ব্যবসা অথবা ব্যক্তি জীবনে। এমনকি আমার কেউ ক্ষতি করলেও কোন ঝামেলায় না গিয়ে ক্ষতি স্বীকার করে সে জায়গা থেকে ফিরে এসেছি। অনেকেই রাজনীতি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে ভুল বুজেছে। পরে তাদের মধ্যে অনেককে আমি চাকরি ও রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছি। ফলে সব দিক বিবেচনা করে মানুষ আমাকে ভালবেসে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী করেছেন। এটা আমার জীবনে বড় পাওয়া। আমি এখন চিন্তায় পড়ে গেছি কিভাবে মানুষকে দেয়া ওয়াদা ও তাদের প্রতিদান শোধ করব। কিভাবে মানুষের দুঃখ ঘুচাবো।

নির্বাচনে দেয়া ইশতেহার কিভাবে বাস্তবায়ন করবেন এমন প্রসঙ্গে মোতালেব বলেন, এ ইশতেহার পুরোপুরি বাস্তবায়ন একার পক্ষে সম্ভব নয়। চট্টগ্রাম-১৫ ও চট্টগ্রাম-১৪ এ দুই আসনের সংসদ সদস্যদ্বয়দের কাছে পরামর্শ ও সহযোগিতা নিব। আর জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নয়ন করে যাচ্ছেন। এমপিদের সহযোগিতা নিয়ে মন্ত্রণালয়ে আমি নিজে গিয়ে সমস্যাগুলো উপস্থাপন করবো। দুই এমপিকে নিয়ে শতকরা ৮০ ভাগ ইশতেহার আমি পূরণ করতে পারবো বলে আশাবাদী।

এলাকার প্রধান প্রধান সমস্যার বিষয়ে মোতালেব বলেন, মাদক এখন সাতকানিয়ার প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত্রতত্র মাদকের ছড়াছড়ি। ফলে যুবক ও কিশোররা দিন দিন অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন যদি সহায়তা করে অবশ্যই সাতকানিয়া থেকে আমি মাদক নির্মূলে সফল হব। অন্যদিকে, এলাকার আরো বেশি উন্নয়ন প্রয়োজন। অতীতে সমস্যা ছিল যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, সাংসদ হয় বিরোধী দলের। এবার দুই এমপিই আওয়ামীলীগের। আমরা যদি তিন জনপ্রতিনিধি মিলে উন্নয়নের যে ঘাটতি রয়ে গেছে তা পূরণে চেষ্টা করি তাহলে অবশ্যই সমস্যার সমাধান হবে।
সাতকানিয়ার অধিকাংশ লোকতো ব্যবসায়ী। উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের সম্পৃক্ততা থাকবে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাঁশখালী দিয়ে সাতকানিয়ায় গ্যাস সরবরাহে সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। যদি গ্যাস পাওয়া যায়, তাহলে বড় একটি জায়গা নির্বাচন করে একটি ছোট শিল্প নগরী গড়ে তুলব। সেখানে ব্যবসায়ীরা প্লট নিয়ে শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে পারবে। সেখানে ঘর থেকে সকালে বের হয়ে বিকালে চাকরি শেষে বাড়ি ফিরে পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে কাটাতে পারবে সাতকানিয়া জনগণ। তিনি বলেন, সাতকানিয়ার বড় বড় ব্যবসায়ীদের সাথে আমার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও ভাল জানাশুনা রয়েছে। তারা আমার কথা রাখবে। চাকরিজীবী প্রতিটি লোকের পরিবারে থাকবে আর্থিক সচ্ছলতা। এভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্লোগান- ‘গ্রাম হবে শহর’ এটিই বাস্তবায়িত হবে সাতকানিয়ায়। থাকবে না মাদক, সন্ত্রাস, ইভটিজিং ও নারী নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধ মূলক কর্মকা-। উন্নত হবে সাতকানিয়া। দেশের বিভিন্ন স্থানের অবদান রাখতে ছড়িয়ে পড়বে সাতকানিয়ার লোকজন। এ কার্যক্রমে আমার দলের লোকদের কাছ থেকে নেয়া হবে সহায়তা এবং তাদেরও এখানে থাকবে সম্পৃক্ততা।

ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক জীবনে সফলতার মূল চাবি-কাঠি প্রসঙ্গে মোতালেব বলেন, সফলতার মূল মন্ত্র হচ্ছে পূর্ব পরিকল্পনা। থাকতে হবে কাজের প্রতি সু-পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, ভাল ব্যবহার ও সততা। আমি মনে করি কেউ যদি ভাল কাজ সৎ মানসিকতা নিয়ে শুরু করে-একাগ্রচিত্তে ওই কাজে মনোনিবেশ করে তাহলে অবশ্যই সে কাজ সফলভাবে শেষ হবে- তা আমি নিশ্চিত। যেটা জীবনের শুরু থেকে আমার ক্ষেত্রে হয়েছে বা ঘটে গেছে। তিনি আরো বলেন আমি যখন স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে স্টোর কিপারের চাকরি ছেড়ে দিই- তখন আমার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। আর্থিক দৈন্যতার কারণে আমার কাছে ছেলের জন্য আমার স্ত্রীর আবদার একটি দুধের টিনের কৌটা নিয়ে আমি ঘরে যেতে পারিনি। খালি হাতে ঘরে গিয়েছি। পরবর্তীতে চিন্তা করলাম সবাই পারলে আমি পারবনা কেন। তখন আমার বাবার দেয়া ৫ হাজার টাকা নিয়ে নগরীর তামাকুমন্ডি লেইনে গিয়ে ব্যবসা শুরু করি। সেখানে দীর্ঘ ৬ বৎসর একটানা নিরলস পরিশ্রম করে স্ত্রী-সন্তানের মায়া-মমতা ত্যাগ করে ব্যবসার প্রসার ঘটিয়ে আমি আজ এ অবস্থানে পৌঁছেছি।

সংক্ষিপ্ত জীবনী- সাতকানিয়া সদর ইউনিয়নের চিববাড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এম এ মোতালেব সি আই পি প্রাথমিক ও জুনিয়র স্কুলের গন্ডি পার হয় গ্রামের স্কুল থেকে। ১৯৬৮ সালে পদুয়া এ সি এম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৭০ সালে সাতকানিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি ও পরে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বি-এসসি পাশ করেন। পরে পদুয়া হাই স্কুলে এক বছর অনানারি শিক্ষক এবং ১৯৭৪ সালে ছমদর পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতামুলক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করে ১৯৭৬ সালে ৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগে কক্সবাজার জেলায় স্টোর কিপার হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে এ চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন ব্যবসা ও পরবর্তীতে রাজনীতিতে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ২ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক। ছেলে ও মেয়েরা সবাই বিবাহিত। ছেলেরা তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।

The Post Viewed By: 654 People

সম্পর্কিত পোস্ট