চট্টগ্রাম রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ২:২৪ am

মরিয়ম জাহান মুন্নী

আইয়ুব বাচ্চুর ১ম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

রূপালি গিটারবিহীন এক বছর

‘এই রূপালি গিটার ফেলে একদিন চলে যাব দূরে, বহু দূরে, সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো গোপন করে। মনে রেখো তুমি কত রাত কত দিন শুনিয়েছি গান আমি, ক্লান্তিবিহীন অধরে তোমার ফোটাতে হাসি চলে গেছি শুধু সুর থেকে কত সুরে’। মনে পড়ে সেই রূপালি গিটারের নায়ক আইয়ুব বাচ্চুর কথা। যার গানে মুগ্ধ ছিল লাখ মানুষ। তাঁর জনপ্রিয়তা শুধু নিজ দেশেই নয়, সমানভাবে ছিল বিদেশের মাটিতেও। এমনি এক গুণী শিল্পী ছিলেন এল আ বি ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। একদিন গানের সুরে বলেছেন এই রূপালি গিটার ফেলে চলে যাবো বহু দূরে। আর হঠাৎ একদিন চলেও গেছেন লাখ ভক্তকে চোখের জলে ভাসিয়ে। দেখতে দেখতে এক বছর হয়ে গেল এই রূপালি গিটারের নায়ক চলে গেছেন। আজ ১৮ অক্টোবর তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর ১৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। সেদিন সকালেই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ব্যান্ড তারকা আইয়ুব বাচ্চু আর নেই! খবরটি শুনে অনেকেই বিশ্বাস করতে চাই নি। অনেকে মানতেই পারছিলেন না তাদের প্রিয় ব্যান্ড তারকা আর নেই। তাই তাঁর আপন মানুষ ও ভক্তদের মধ্যে অনেকেই ছুটে যান হাসপাতালে। তেমনিভাবে প্রিয় শিল্পীর মৃত্যুর খবর শুনে তাঁর জন্মস্থান

চট্টগ্রামেও শোকের ছায়া নেমে আসে। কিংবদন্তি এ শিল্পী চট্টগ্রামের এনায়েত বাজার এলাকায় ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশি সঙ্গীতজ্ঞ, গায়ক-গীতিকার, গিটারিস্ট ও টিউনারদের মধ্যে অন্যতম। মূলত এ কিংবদন্তি শিল্পীর গানের প্রতি ছিল অন্যরকম ভালবাসা। তাই ছোট থেকেই পাড়ার বন্ধুদের সাথে আড্ডায় গানের কলি খেলতেন তিনি।

শিল্পীর ছোট বেলার বন্ধু মোহাম্মদ আলী বলেন, আমাদের সবার যখন দেখা হত, ওমনি বাচ্চু গানের কলি খেলার কথা বলতেন। আমরা অন্য সবার মত ক্রিকেট বা অন্যান্য খেলাধুলা কম করতাম। আমরা আড্ডা মেতে উঠতাম নানারকম গানের সুরে। এভাবেই আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কুমার বিশ্বজিৎ, বাচ্চু, পার্থ বড়–য়াসহ সবাই গানের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ে। আর চট্টগ্রামের ঐতিহ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ঐতিহ্য ছিল বিয়েতে ব্যান্ডের গানের আয়োজন করা। ব্যান্ডের গান ছাড়া যেন গায়ে হলুদ কল্পনাই করা যেত না। তাই যখন পাড়ায় কোনো বিয়ে হত শুনতাম সেখানে আমরা চলে যেতাম। এভাবে দেখতে দেখতে আমাদের সেই দলটি ব্যান্ড সঙ্গীত প্রিয় একটি দল হয়ে উঠে। আবার বাচ্চুর বাবার একটি পুরাতন গিটার ছিল। মূলত এই গিটারটি দিয়ে শুরু হয় বাচ্চুর ব্যান্ডের জগতে পা দেয়া। সেই আধা পুরাতন গিটার দিয়ে সে বাজাতো আর মুখে গান গাইতো।

এভাবে আমরা দেখতাম আমাদের বন্ধুদের মধ্যে তাঁর গলার সুর খুব সুন্দরভাবে মিলিয়ে যেত গিটারের সুরের সাথে। তাই আমরাও তাকে উৎসাহ দিতাম। এরপরে পাড়ায় কারো বিয়ে হলে আমাদের দাওয়াত না দিলেও বাচ্চুসহ আমরা গিয়ে সেখানে গান গাইতাম। এভাবে একসময় এলাকার মানুষের কাছে আমাদের দলটি পরিচিত হয়ে উঠে। এরপর কোনো বিয়ে হলে মানুষই বাচ্চুসহ আমাদের ডাকতো। সেই থেকেই ধীরে ধীরে তার পথচলা শুরু। বাচ্চু সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে। তারপর সরাসরি গানের জগতে আসেন ব্যান্ড ফিলিংস-এর মাধ্যমে। ১৯৭৮ সাল থেকে ফিলিংস-এর সাথে তিন বছর চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেলে ইংরেজি গান করেছেন। সত্তরের দশক থেকে বাংলাদেশে শ্রোতাদের কাছে ইংরেজি গান, হার্ড-রক, বুুজ, অল্টারনেটিভ রক, ব্যান্ড মিউজিক এসব জগতের পরিচয় হতে থাকে। ১৯৮০ সালের দিকে তিনি সোলস ব্যান্ডের সাথে গান করতেন। এই দলে ১০ বছর যুক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি গঠন করেন এলআরবি। তাঁর ১৬টি একক অ্যালবাম আছে। আর ব্যান্ড অ্যালবাম করেছেন ১২টি। এর মধ্যে ‘কষ্ট’ ও ‘ফেরারি মন’ এই দু’টি অ্যালবামের গানে দেশজুড়ে আইয়ুব বাচ্চু পরিচিতি পায়।

চট্টগ্রাম মিউজিক ব্যান্ড এসোসিয়েশনের (চমবা) সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আইয়ুুব বাচ্চু ছিলেন অসাধারণ জনপ্রিয়। ব্যান্ডসঙ্গীত বললেই সবার আগে যার নাম মনে আসে তিনি হলেন চট্টগ্রামের সন্তান আইয়ুব বাচ্চু। বাচ্চু ভাই ছিলেন চট্টগ্রামের একটি মূল্যবান রত্ন। তাকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সঙ্গীতের ধারায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী ও গিটারবাদক বলা হয়। ব্যক্তি জীবনেও তিনি অসাধারণ মানুষ ছিলেন। আমাকে ভালবাসতেন নিজের ভাইয়ের মত। এমনিতে পরিবারের সবাই ছিলেন অতিধার্মিক। তাই তাঁর সঙ্গীত জীবনের পথচলা একটু কঠিনও ছিল। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। যেদিন সকালে যখন শুনি বাচ্চু ভাই মারা গেছে আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। খুব কষ্ট হয়েছে তার জন্য। অল্প বয়সেই চলে গেলেন তিনি। তার শেষ যাত্রায় চট্টগ্রামের জামিয়তুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণ জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিলো সেদিন। আজ তাঁর ১ম মৃত্যুবাষিকী উপলক্ষে দোয়া, তাঁর কবর জিয়ারত ও এতিমদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি আমরা।

সন্ধ্যা সাতটায় তাঁর স্মরণে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

The Post Viewed By: 134 People

সম্পর্কিত পোস্ট