চট্টগ্রাম বুধবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯

১৮ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:২৩ পূর্বাহ্ন

শাহিদ হাসান

কিংবদন্তি লেখকদের উপেক্ষা নোবেল কমিটির

এবার ১০ অক্টোবর সাহিত্যে দু’জনকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। ২০১৯ সালের জন্য সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার অস্ট্রিয়ায় পেটার হান্ডকে আর ২০১৮ সালের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পোল্যান্ডের ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুক। এই প্রথম একই দিনে দু’জন লেখক নোবেল পুরস্কার পেলেন, যা বিশ^সাহিত্য পড়–য়াদের মনে অন্য রকম অনুভূতি জাগ্রত করবে।

প্রতি বছর নোবেল নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা চলে। সে-সব লেখকদের নাম বারবার উচ্চারিত হয় এবং যাদেরকে নোবেল পুরস্কার দেয়া উচিত বলে মনে করেন বিশ্বের সচেতন পাঠক-সমাজ তাদের অনুমান প্রায়বার মিথ্যা প্রমাণিত করে পাঠকের নাম তালিকার বাইরে সুইডিশ একাডেমি অন্যজনকে পুরস্কৃত করেছে। সুইডিশ একাডেমি লিও তলস্তয়কে নোবেল না দিয়ে যখন সমালোচনা হজম করতে পেরেছে তখন এ-ব্যাপারে আর কিছুই বলার থাকে না। বেশ ক’বছর ধরে স্নায়ুর চাপ সহ্য করছেন জাপানি ভাষার লেখক হারুকি মুরাকামি এবং তার ভক্ত সমাজ।

গেলো বছর যৌন কেলেঙ্কারির কারণে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার স্থগিত করে নোবেল কমিটি বলেছিলো ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীর নাম ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ীর নামের সাথে ঘোষণা করা হবে। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এক বছরের জন্য থেমে থাকলেও সুইডিশ সোসাইটির ১০০ সদস্য মিলে সাহিত্যে নোবেলের পরিবর্তে শুধুমাত্র ২০১৮ সালের জন্য ‘নিউ একাডেমি প্রাইজ’ প্রবর্তন করেন। সেই পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ফ্রান্সের বিখ্যাত সেগু উপন্যাসের লেখক ম্যারিস কোনডে, ব্রিটিশ লেখক নীল গাইমান, ভিয়েতনামে জন্মগ্রহণকারী কানাডিয়ান লেখক কিম থুয়ে-এর সাথে মুরাকামির নাম ছিলো। কিন্তু মুরাকামি নিজের নাম প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়ে বলেছিলেন, “সাহিত্যে নোবেলের বিকল্প হিসেবে নিউ একাডেমি প্রাইজকে আমি সমর্থন করি না।”

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাহিত্যিকের ভৌগলিক অবস্থান, ভাষা, লিঙ্গ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা বিষয় বিবেচনা করে নোবেল কমিটি। সাধারণত বোদ্ধা পাঠক-সমাজ অনুমান করে, যে বছর চীনের মো ইয়ান পুরস্কার পেলেন, তখন সবাই ধরে নিলেন মুরাকামির নোবেল প্রাপ্তি বহু দূর এবং কোনো এশিয়ান এই পুরস্কার আপাতত পাবেন বলে মনে হয় না। বিশ্বের অন্যান্য পুরস্কারের বেলায় দীর্ঘ তালিকা, সংক্ষিপ্ত তালিকা এবং বিচারকদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু নোবেলের বেলায় তা প্রকাশ করা হয় না। সুতরাং অনুমান করা কঠিন।

বর্তমানে বিশ^সাহিত্যে মুরাকামি ছাড়াও জীবিত আছেন সিরিয়ার কবি অ্যাদোনিস, কেনিয়ার কথাসাহিত্যিক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো, আমেরিকার কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস, আলবেনিয়ার লেখক ইসমাইল কাদারে, স্প্যানিস ঔপন্যাসিক হাভিয়ার মারিয়াস, নরওয়ের নাট্যকার জন ফসে, দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উন, আইরিশ ঔপন্যাসিক জন বানভিল প্রমুখ।
অ্যাদোনিসের নাম ল্যাডব্রক্সের বাজির তালিকায় অনেক বছর ধরে অবস্থান করছে। এছাড়াও অ্যাদোনিসের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনার কারণ হলো আরব বিশ্বে তার মতো প্রভাবশালী কবি আর নেই।

চিনুয়া আচেবের চেয়ে বয়সে প্রায় দশ বছরের ছোট নগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো। নোবেল কমিটি আচেবেকে সম্মানিত করতে পারেনি, কিন্তু নগুগির মতো একজন শক্তিশালী ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক ও শিক্ষাবিদ আফ্রিকান সাহিত্যের আন্তর্জাতিক লেখকদের মধ্যে অগ্রণী। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগের লেখকদের সেতুবন্ধন সৃষ্টিতে কাজ করেছেন নগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো। সঙ্গত কারণ তিনি সাহিত্যে নোবেল পাবার যোগ্যতা রাখেন বলে বিশে^র অনেকে সাহিত্য-তাত্ত্বিক মত প্রকাশ করেছেন।
১৯৮৬ সালে নাইজেরিয়ার নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক ওলে সোয়েঙ্কা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। ২০০৩ সালে জে এম কোয়েটজি, ইতোমধ্যে আর কোনো কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান নোবেল পুরস্কার পাননি। সুতরাং নগুগি এবার পাবার যোগ্যতম লেখক ব্যক্তিত্ব।

আমেরিকার আরেক কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস শক্তিমান লেখক। প্রাণবন্ত উপস্থাপনা তার লেখার প্রধান গুণ। টনি মরিসন ১৯৯৩ সালে নোবেল পাবার পর দু’যুগেরও বেশি সময় পার হয়েছে। এবার ওটস বা অন্য কোন আমেরিকান নোবেল পাবার যোগ্য ছিল।
ভৌগলিক ও লিঙ্গ বিচারে আমেরিকার প্রতিবেশি দেশ কানাডার নারী লেখক এলিস মুনরো দু’বছর আগে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন বলে আমেরিকার নারী লেখক জয়েস ক্যারল ওটসের সম্ভাবনা কম ছিল। তাছাড়া ২০১৫ সালে আরেক নারী লেখক সোয়েতলানা অ্যালেক্সিয়েভস তো পেলেনই।

আলবেনিয়ার কথাসাহিত্যিক ইসমাইল কাদারে এবার নোবেল পাবার যোগ্য ছিলেন। ষাটের দশক থেকেই তিনি আলবেনিয়ার নেতৃস্থানীয় লেখক। ১৯৬৩ সালে তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জেনারেল অব দ্য ডেড আর্মি’ প্রকাশ পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাদারে কবি হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তার উক্ত উপন্যাসটি তাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। এছাড়া কয়েক দশক জুড়ে তার নামটি পাঠকদের মুখে উচ্চারিত হয়ে আসছে।
ফ্রান্স-প্রবাসী চেক কথাসাহিত্যিক মিলান কুন্ডেরা জনপ্রিয়তার মাপকাঠি পার হয়ে গেছেন অনেক আগে। অজানা কারণে নোবেল পুরস্কার তার ভাগ্যে জোটেনি।

মো ইয়ান পেলেও দক্ষিণ কোরিয়ার বর্ষীয়ান কবি কো উনের সম্ভাবনাও ছিল এ-বছর। বয়সের বিচারে নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচির নাম উচ্চারিত হয়েছে কারো কারো মুখে। তার বয়স কম হলেও এই বয়সে তার লেখার মান কোনো অংশে কম নয়। আচেবের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি।
এছাড়াও মিশরের নারী লেখক নাওয়াল আল সাদাউই, হাঙ্গেরির ঔপন্যিাসিক-নাট্যকার পিটার নাদাস, সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, স্পেনের ঔপন্যাসিক হুয়ান মারসে, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদী, রুশ কথাসাহিত্যিক মিখাইল শিসকিন, বেলজিয়ামের কবি লিওনার্দ নোলেনস প্রমুখের যে কেউ নোবেল পুরস্কার পেতে পারতো।
কিন্তু বিশ^বাসীকে আশ্চর্য করে দিয়ে ২০১৯ আর ২০১৮ সালের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন উল্লেখিত দু’জন।
পেটার হান্ডকের সাহিত্যিক মনোজগৎ এবং নোবেল বিতর্ক :
এ-বছর উপন্যাস ও নাটকের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন অস্ট্রিয়ান পেটার হান্ডকে। চিন্তা-উদ্দীপক লেখক হিসেবে তার ব্যাপক পরিচয় রয়েছে সাহিত্য জগতের পাঠকের কাছে। একই সাথে লেখালেখির জন্য তিনি বেশ সমালোচিত। তার নোবেল প্রাপ্তির সংবাদে শুনে বিশে^ অনেক পাঠক খুশি হতে পারেনি । ইংরেজি ভাষার পাঠকরা পিটার হান্ডকের সম্পর্কে বলেন, তিনি পাঠকের নজরে এসেছেন শুধুমাত্র তার চিন্তা-উদ্দীপক রচনার জন্য, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় থট-প্রভোকিং।
১৯৬৬ সালে প্রকাশিত পুবলিকুমস-বেশিমফুং (ইংরেজিতে অনূদিত হয় ১৯৭১ সালে) বা ‘অফেনডিং দ্য অডিয়েন্স’ বা ‘ইনসাল্টিং দ্য অডিয়েন্স’ নাটকে দেখা যায়, চরিত্ররা নাটকের ব্যাকরণের সূত্র মানছে না, তাছাড়া নির্মাণের দিক থেকেও পিটার তার চরিত্রদের দিয়ে বাজেভাবে তির্যক কথা বলাচ্ছেন, বেশিরভাগ সময়ে যা অশ্লীলতার পর্যায়ে চলে যায়। নাটকের কোনো প্লট বা গল্প নেই। থিয়েটারের সকল চিরন্তন রীতিনীতিকে পাশ কাটিয়ে এ-ধরনের রচনার জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছেন পেটার। ১৯৭০ সালে ইসরাইলি নাট্য-পরিচালক নাফতালি ইয়াভিনের পরিচালনায় লন্ডনে প্রদর্শিত হবার পর থেকে তার নাটকের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।

নাটক সম্পর্কে পিটার বলেছিলেন, ‘অন্য কোনো জগতের নয়, নাটকের পৃথিবী সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পরিকল্পনা থেকে এই ধরনের নাটক লিখেছি। পরিকল্পনা ছিল দর্শকদেরকে তাদের নিজের দিকে ঠেলে দেয়ার। আমি নাটকের মাধ্যমে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছি সবসময় দর্শকরা পুরো নাটক সচেতনভাবে এবং ভিন্ন চেতনা দিয়ে যেন দেখে।’ পেটারের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাটক ‘দ্য আওয়ার্স উই নিউ নাথিং অব ইচ আদার’। এই নাটকটিও থিয়েটারের প্রচলিত ফর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। নাটকটি শুধুমাত্র প্লটকে কেন্দ্র করে লেখা, নির্দিষ্ট কোনো ডায়লগ নেই।

১৯৭০ সালে প্রকাশিত উপন্যাস ‘দি অ্যাংস্ট দেস টর্টবের্টস ফর্ম এলফমেটার’, ইংরেজিতে ‘দ্য ফেয়ার অব দ্য কিপার’ শিরোনামের দু’টি ক্রাইম নভেলের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, উপন্যাসের মূল চরিত্র পদে পদে একেক জনকে খুন করে। এক পর্যায়ে সে তার মাকেও খুন করে। পিটার এভাবে এমনকিছু বলছেন যেন পাঠক উত্তেজিত হতে বাধ্য হন।
গত ক’দিন আগে নোবেল কমিটি তাকে ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক হিসেবে ঘোষণা করেছে। নোবেল পাবার আগে থেকে পিটারের সাহিত্যকর্ম সমালোচিত। বেশ আগে থেকে ব্যক্তি পেটার তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সমালোচিত। ৯০-এর দশকে যুগোস্লাভ যুদ্ধের পর সার্বিয়ার পক্ষ নেয়া এবং সার্বিয়ার গণহত্যাকে সমর্থন পিটারের রাজনৈতিক দর্শনকে যতটা না প্রশ্নবিদ্ধ করে, তার চেয়ে পরবর্তীকালে সার্বিয়ার অন্যতম প্রধান নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট স্লোবোডান মিলোসেভিকের সঙ্গে নিয়মিত ওঠাবসা এবং বিশেষ করে তার মৃত্যুর পর শোক অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় সার্বিয়ার প্রতি মমত্ববোধ প্রদর্শন পিটারকে সমালোচনার মুখে ফেলে। এখন মূল কথা হচ্ছে, যে-কোন লেখকের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই তার লেখায় প্রকাশ ঘটে। এর অন্যতম কারণ তিনি যা তার মনোজগতে ধারণ করেন তা তার বাক্যের মাধ্যমে অনায়াসে লেখা হয়। একজন বোদ্ধা পাঠক তা ধরতে পারেন। মানবতাবোধ বর্জিত লেখক পিটার হান্ডেকে লেখায় চেতনে বা অবচেতনে তা অবশ্যই রয়েছে। লেককের চিন্তার প্রতিফলন ঘটে তার লেখায়, সুতরাং পিটার হান্ড এ-রীতির বহির্ভুত নন। যদি বহির্ভূত হন তা হলে দ্বিচারী। এ-মানসিকতার লেখককে পুরস্কৃত করেছে নোবেল কমিটি। এতে উৎসাহী হবে মানবতা বিরোধী লেখকগোষ্ঠী ও রাজনীতিবিদরা।

পিটারকে বিজয়ী ঘোষণা করা কমিটি বলেছে, ‘মানুষের অভিজ্ঞতাকে সুনির্দিষ্ট করে নতুন ধরনের ভাষা তৈরির মধ্য দিয়ে প্রভাব বিস্তারের জন্য সাহিত্যকর্মে তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হল।’ যদি তাই হয় যাদের নাম এ-লেখায় উচ্চারণ করা হয়েছে তারা কি নোবেল কমিটির ঘোষণা মতে যোগ্যতা রাখে না? মূলত বর্তমান বিশে^র সর্বক্ষেত্রে আমরা মানবতা বিরোধী দুষ্টচক্রের খেলা দেখছি। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর পিটার হান্ডকে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “আশ্চর্যের ব্যাপার। এটা নিশ্চয়ই সুইডিশ একাডেমির জন্য একটি সাহসী সিদ্ধান্ত।” এ উক্তি ব্যাখ্যা এভাবে করা যায়, মানবতা বিরোধী কাজ করলেও নোবেল পাওয়া যায় এবং এ-রকম সাহসী সিদ্ধান্তের প্রশংসা তিনি ছাড়া আর কেবা করতে পারেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০১৪ সালে অস্ট্রিয়ান সংবাদমাধ্যম ‘দি প্রেসে’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পিটার হান্ডকে বলেছিলেন, “নোবেল পুরস্কারের আর মূল্য নেই। এই পুরস্কার বন্ধ করে দেয়া উচিত।” তিনি যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন তখন তো মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, পিটার কি নোবেল প্রত্যাখ্যান করবেন?

পিটার নোবেল পেয়েছেন এই ঘোষণার পর সুইডিশ একাডেমির বিরুদ্ধে বিশ্বের বাঘা বাঘা সাহিত্য-সমালোচকরা নিন্দার ঝড় তুলেছেন পিটারের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তাদের মধ্যে সালমান রুশদি বলেছেন, ‘আমি তার বিপক্ষে অনেক দিন আগে লিখেছি, এখনো তার বিপক্ষে অটল।’ কসোভর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়াতে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ের গভীর প্রদেশে ক্ষত সৃষ্টি করলো।’
গার্ডিয়ানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে স্লোভেনিয়ান দার্শনিক স্লাভিয়ো জিজেক বলেছেন, ‘যিনি ২০১৪ সালে বলেছেন নোবেল পুরস্কার বন্ধ করা দরকার, তাকেই নোবেল দিয়ে প্রমাণিত হলো নোবেল কেনো বন্ধ হওয়া উচিত। এক যুদ্ধাপরাধীকে কীভাবে নোবেল পুরস্কার দেয়া যেতে পারে? তাকে সাহিত্যে নোবেল দেয়া বন্ধ করে বরং আমাদের সময়ের হিরো জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে শান্তিতে নোবেল দেয়া হোক।’ সুতরাং সব মিলিয়ে পিটার হান্ডকের নোবেল প্রাপ্তি পৃথিবীব্যাপী এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
২০১৮ সালের নোবেল বিজয়ী ওলগা তোকারজুক:

এ বছর ২০১৮ সালের সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন ওলগা তোকারজুক । তার লেখালেখির মর্ম ও মজ্জায় সর্বদা প্রবহমান মানুষের সীমা অতিক্রমের গল্প। তার লেখার বিষয় এবং শৈলী সম্পর্কে দ্য আইরিশ টাইমসে প্রকাশিত মাইকেল ক্রোনিন নিবন্ধেবলেছেন, পোল্যান্ডের হাসপাতালের একটি ওয়েটিং রুম। এ-সময়ের অন্যতম লেখক ওলগা তোকারজুক সেখানে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আসতেন। তার চিন্তন প্রক্রিয়ার বিষয়টি তিনি আমাকে বললেন, এই মহাবিশ্ব এবং তার অণু-পরমাণু সম্পর্কে আমরা বেশ ভালোই জানি। কিন্তু সে তুলনায় আমাদের দেহ বা আত্মা সম্পর্কে আমরা খুব একটা জানি না। আমাদের ভেতরে ক্ষুদ্রবিশ্ব সম্পর্কে প্রায় অজানা ।

‘ফ্লাইটস’ উপন্যাসের জন্য গত বছর ম্যান বুকার পুরস্কার পান। ‘ফ্লাইটস’-এর পাঠকদের তিনি ১৭ শতকের ফ্লান্ডার্স (বেলজিয়ামের উত্তরের দিকের একটি শহর) থেকে ১৮ শতকের ভিয়েনা এবং সেখান থেকে ১৯ শতকের প্যারিসে নিয়ে গিয়েছেন। এ ভ্রমণের মধ্য আলোচনা করেছেন দেহের বিভিন্ন অংশের সংরক্ষণের কৌশল এবং মনঃসমীক্ষণ সম্পর্কে।
ইংরেজিতে অনূদিত তার উপন্যাস ‘ড্রাইভ ইওর প্লাও ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’-এ দেখা যায়, উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ইয়ানিনা দুসেইকো’ চেক রিপাবলিকের অত্যন্ত কাছে বাস করে। গ্রন্থের নায়ক নিয়মিত বর্ডার ক্রস করে, এটা তাকে আনন্দ দেয়, কারণ একটা সময় ছিল যখন তা সম্ভব ছিল না। বারবার দেশের সীমানা পার হতে নায়কের খুব ভালো লাগে।
তোকারজুকের সৃজনশীলতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘সৃজনশীলতা বলতে আমি বুঝি আগের চেয়ে নতুন বিন্যাসে সব সময়ে নিজের আগের লেখা অতিক্রম করে নতুন কিছুর সন্ধান এবং নতুনভাবে বলার চেষ্টা। ইতোমধ্যে যা করে ফেলেছেন বা লিখে ফেলেছেন সেটাকে আর আমি সৃজনশীলতা মনে করি না। নতুন বিষয় ও রীতি নিয়ে সব সময় এগিয়ে যাওয়া উচিত।’
তোকারজুক ১৯৬২ সালে পোল্যান্ডের সুলেখুফে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার ‘হাউস অব ডে, হাউস অব নাইট’ উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি ইংরেজি ভাষার পাঠকদের নজরে আসেন। স্বতন্ত্র রীতির জন্য প্রথম দিকে এই উপন্যাসটি পাঠকদের বিরক্ত বোধ করেছিল। এ-রীতির নামকরণ করা হয় ‘কনস্টেলেশন’। ‘কনস্টেলেশন’ জ্যোতির্বিজ্ঞানে শব্দ। তোকারজুকের আগে সাহিত্যে এ-রীতির প্রচলন ছিল না। ‘কনস্টেলেশন’ রীতিতে লিখে বিষয় ও প্রকরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং এর গভীরে প্রবেশ করলে সহজে দেখা যায়, মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ ও দুর্বলতা নিয়ে লেখিকা বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ।
‘ড্রাইভ ইরর প্লাও ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড’ বইটিকে তোকারজুক ব্যথার বই বলে অভিহিত করেছেন। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইয়ানিনাকে দেখানো হয় প্রাণীদের মুখপাত্র হিসেবে। তোকারজুক বলেছেন, ইয়ানিনা হল সে-সব নির্বাক প্রাণীদের মুখপাত্র যাদের ব্যথা অনুভব করার ক্ষমতা তার আছে।

লেখালেখির প্রারম্ভে এক পার্টিতে একজন সৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়, তখনই তার মাথায় ‘কনস্টেলেশন’ রীতিতে লেখার আইডিয়া আসে। উপন্যাসটি কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমা বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ার হবার পর নিন্দার ঝড় ওঠে। পোলিশ গণমাধ্যম বলে, উপন্যাসটি গভীরভাবে অ্যান্টি-ক্রিস্টিয়ান, যা ইকো-সন্ত্রাসবাদকে উজ্জীবিত করে।
তার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দ্য বুকস অফ জ্যাকব’। উপন্যাসটির মূল উপজীব্য খ্রিস্টান ধর্মে বর্ণিত ইহুদি নেতা জ্যাকব লেইবোউইজ ফ্র্যাঙ্কের ইতিহাস এবং ইহুদি ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম এবং ইসলাম ধর্মের মধ্য দিয়ে জ্যাকবকে ইয়াকুব হবার যে ভ্রমণ সেটা। এখানে উঠে এসেছে ১৮ শতকের পোল্যান্ডও। পোল্যান্ডে একজন ভুক্তভোগী হিসেবে তার জীবন যে-সব সমস্যার মধ্যে দিয়ে অতিক্রম করেছে সে-সব বিষয় তার লেখায় সমালোচনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। এতে ডানপন্থী ও চরমপন্থীরা হুমকি দিয়েছে সে-কারণে তাকে সশস্ত্র দেহরক্ষী নিযুক্ত করতে হয়েছিল। তোকারজুক বলেছিলেন, ‘দ্য বুকস অফ জ্যাকব’-এর বিক্রি প্রমাণ করে পাঠকরা প্রাচীন পোল্যান্ড এবং প্রাচীন জীবন নিয়ে কেমন নস্টালজিক। শুধুমাত্র পোল্যান্ডে বইটি ১ লক্ষ ৭০ হাজার কপির বেশি বিক্রি হয়েছিল।

২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ী পিটার হান্ডকের নোবেল প্রাপ্তি নিয়ে বিশ^ব্যাপী তুমুল বিতর্কের ঝড় উঠেছে। এ-ধরনের মানবতা বিরোধীরা সাহিত্যে এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেলে পৃথিবীব্যাপী অরাজকতা দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাবে তার প্রমাণ সম্প্রতি দেশে-দেশে দৃশ্যমান। সুতরাং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধশালী পৃথিবী টিকিয়ে রাখতে হলো নোবেল কমিটিসহ সচেতন বিশ^বাসীকে মানবতার পক্ষে দাঁড়াতে হবে, তা সম্ভব না হলে আরেকটি মহাযুদ্ধ পৃথিবীতে অনিবার্য এবং শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে মানুষ ডাইনোসরের পথ ধরবে।

The Post Viewed By: 125 People

সম্পর্কিত পোস্ট