চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:৫৯ পূর্বাহ্ন

নাজিম মুহাম্মদ

পুলিশের হাতে পুলিশ ধরা!

চুরি হচ্ছে জব্দ গাড়ির যন্ত্রাংশ গভীর রাতে ‘সরল মনে’ জব্দ কারে ঢুকেছিলেন কনস্টেবল পলাশ

নিয়ম না থাকলেও নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে রাখা হয়েছে জব্দ করা বিভিন্ন ধরনের যানবাহন। সচল অবস্থায় এসব যানবাহন জব্দ করা হলেও কিছুদিন যেতে না যেতে চুরি হয়ে যাচ্ছে জব্দ করা যানবাহনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। শুধুই নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে তা নয়। একই অবস্থা নগর পুলিশের ডাম্পিং স্টেশন ও থানাগুলোতেও। নিজে প্রাইভেটকার চালিয়ে প্রকৃতির ডাকে রাত দুটো বাজে নগরীর লালদিঘির পাড় নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে গিয়েছিলেন কনস্টেবল পলাশ চন্দ্র দে। যথারীতি নিজস্ব কারটি (চট্টমেট্রো-গ-১২-৪৮১৯) পার্কিং করে তিনি প্রাকৃতিক কর্ম শেষ করে ফেরার পথে অন্ধকারে থাকা জব্দ করা একটি প্রাইভেটকারের ভেতর আলো দেখতে পান। পলাশের মনে হয়েছে কারের ভেতরে সাপের মাথায় মনি-মুক্তা জ্বলছে। মুক্তার লোভে তিনি গভীর রাতে অন্ধকারে থাকা কারের ভেতরে ঢুকে পড়েন। টুং টাং শব্দ শুনে গোয়েন্দা কার্যালয়ে থাকা এক পুলিশ সদস্য এগিয়ে গেলে কারের ভেতরে পলাশকে আবিষ্কার করেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা মুঠোফোনে কনস্টেবল পলাশের ছবিও তুলেছেন। আসলে মনি-মুক্তা কিছুই নয়। জব্দ করা গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরি করতে গিয়েছিলেন পলাশ এমনটি ধারণা পুলিশ কর্মকর্তাদের। গত সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে এ ঘটনা ঘটেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তার পলাশের প্রাইভেটকারটি দুই তিন দিন রেখে পরে ছেড়ে দেয়। তবে পলাশের দাবি-তিনি সরল মনে অন্ধকারে প্রাইভেট কারের ভেতরে ঢুকেছিলেন। ক্ষোভের সাথে বলেন, কত পুলিশ ইয়াবা নিয়ে ধরা পড়ে তাদের নিয়ে কোন কথা নেয়। আমি সরল বিশ্বাসে একটি কাজ করে ফেলেছি তা নিয়ে আপনাদের এত মাথাব্যাথা কেন বুঝতে পারছি না।

কনস্টেবল পলাশ নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনে যানবাহন শাখায় (এমটি) কর্মরত। মিরসরাই করের হাট এলাকার সুনীল চন্দ্র দে’র ছেলে পলাশ নগরীর হাইলেবেল রোডে বসবাস করেন। চলাফেরা করেন প্রাইভেটকারে। রয়েছে বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কনস্টেবল পলাশ জানান, তিনি নগর পুলিশের যানবাহন শাখায় কর্মরত আছেন। পারিবারিকভাবে তার দুটো গাড়ি রয়েছে। কোনটির মালিক তিনি নন। তবে দেখাশোনা করেন। তবে বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কালো রঙের যে প্রাইভেটকারটি নিয়ে গভীর রাতে লালদিঘির পাড়ে গোয়েন্দা কার্যালয়ে গিয়েছিলেন সেটির রেজিস্ট্রেশন পলাশের নামে।

লালদিঘির পাড়ের গোয়েন্দা কার্যালয়ে গভীর রাতে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঘটনার রাতে আমার অন্য একটি প্রাইভেটকার পুলিশ লাইনে রেখে ওই গাড়ির চালক স্বপনকে নিয়ে স্টেশন রোডের হোটেল নিজাম এ রাতের খাবার খেতে যাই। খাওয়া দাওয়া শেষে স্বপন চলে যায়। আমি সিনেমা প্যালেসের ওখানে গাড়ির চাকায় বাতাস দিতে যাই। এ সময় আমার প্রকৃতির ডাক আসলে কার নিয়ে লালদিঘির পাড়ে নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে যাই। রাত তখন প্রায় দুটো বাজে। গেটে যথারীতি নিজের পরিচয়ও দিয়েছি।

পলাশ বলেন, প্রাকৃতিক কর্ম শেষ করে ফেরার পথে জব্দ করা একটি প্রাইভেটকারের ভেতর কিছু একটা জ্বলতে দেখি। আমার মনে হয়েছে সাপের মাথায় মনি-মুক্তা জ্বলছে। তাই সরল মনে অন্ধকারে প্রাইভেট করের ভেতর ঢুকি।

তিনি বলেন, সিনিয়র স্যাররা বিয়ষটি তদন্ত করছেন। সরল মনে একটি কাজ করতে গিয়ে অহেতুক ঝামেলায় পড়েছি। জব্দ করা কারের ভেতরে থাকা ছবি তোলা প্রসঙ্গে পলাশ বলেন, যে পুলিশ সদস্য আমার ছবি তুলেছে সেটি ওখানকার নয়।

গভীর রাতে জব্দ করা প্রাইভেটকারের ভেতরে থাকা ছবিটি কীভাবে আসলো জানতে চাইলে পলাশ কোন সদুত্তর দেয়নি।
নগরীর লালদিঘির পাড়, মনসুরাবাদ, ষোল থানায় বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে বিভিন্ন মামলায় জব্দ করা দামি প্রাইভেটকার, মোটর সাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহন। সচল অবস্থায় যানবাহনগুলো জব্দ করা হলেও কিছুদিন যেতে না যেতে দেখা যায় যানবাহনগুলোর বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ধীরে ধীরে চুরি হয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে যানবাহনের কঙ্কাল পড়ে থাকে।
নগর ট্রাফিক পুলিশের উত্তর জোনের উপ কমিশনার (ডিসি) মো. আমীর জাফর জানান, মামলা হবার পর জব্দ করা আলামত আদালতের মালখানায় থাকার কথা। স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিভিন্ন থানায় জব্দ করা মালামাল রাখা হয়। থানায় একজন মালখানা অফিসারও আছেন। তিনি জব্দ করা মালামালের হিসাব রাখেন। এরবাইরেও সদরঘাট ও মনসুরাবাদের সিএমপির দুটি ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে। সেখানে জব্দ করা বিভিন্ন ধরনের যানবাহন রাখা হয়। ডাম্পিং স্টেশনে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আছেন যিনি আলামতগুলো তদারকি করে থাকেন। তবে নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে জব্দ করা মালামাল তদারকি করতে কোন কর্মকর্তা আছেন কিনা তা আমার জানা নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, নিয়ম অনুযায়ী মালখানা হচ্ছে দুটি। একটি আদালতের মালখানা অন্যটি থানার মালখানা। থানায়ও বেশিদিন রাখার নিয়ম নেই।

উক্ত কর্মকর্তা বলেন, নগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে জব্দ করা মালামাল রাখার কোন নিয়ম নেই। তাই সেখানে কোন মালখানাও নেই। তদারকি কর্মকর্তাও নেই। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কোন আসামি গ্রেপ্তার করলে সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করেন। কারণ গোয়েন্দা কার্যালয়ে মামলা করার কোন নিয়ম নেই। জব্দ করা মালামালও সংশ্লিষ্ট থানায় রাখার কথা। তা কিন্তু হচ্ছে না। তদারকি না থাকার কারণে জব্দ করা যানাবাহনের যন্ত্রাংশ চুরি হচ্ছে।

The Post Viewed By: 1096 People

সম্পর্কিত পোস্ট