চট্টগ্রাম রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১১ অক্টোবর, ২০১৯ | ১:০০ পূর্বাহ্ণ

ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন

শুদ্ধি অভিযানের সাফল্য চাই

“রাজনীতি” বা “রাষ্ট্রনীতি” একটি বিজ্ঞান; বহুল পঠিত ও চর্চিত বিষয়। সরাসরি চর্চা না করলেও এর বলয় ও প্রভাব থেকে কেউ মুক্ত থাকতে পারে না। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ জনগণ রাজনীতিচর্চাকে পছন্দ করেন না। অনেক সময় চালাকি, প্রতারণার প্রতিশব্দ হিসেবেও রাজনীতি শব্দটা ব্যবহার করা হয়। ছাত্ররাজনীতি এখন রীতিমত বিষ ফোঁড়া। গত ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের নির্মমভাবে খুন হওয়ার পর থেকে ছাত্ররাজনীতি আরো বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শিক্ষাঙ্গন রাজনীতি মুক্ত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। রাজনৈতিক শক্তির অপব্যবহার বা অপরাজনীতিই এসব কিছুর জন্য দায়ি। কিন্তু রাজনীতি যতই অপছন্দ হোক না কেন, এ নীতিই সবনীতির রাজা অথবা প্রধাননীতি। সর্বনীতি আবর্তিত হয় রাজনীতির আলোকে। সহজ ভাষায় রাজনীতিবিদরাই স্ব স্ব দেশের অন্যান্য নীতি নির্ধারণ করেন। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হয় তাঁদের হাতে। তাই যে দেশের রাজনীতিবিদ যেমন সে দেশের সার্বিক ভালো-মন্দ, উন্নয়ন-অবনতি, সেরকমই হয়ে থাকে।

বাঙ্গালী জাতির ভাগ্যোন্নয়নের রাজনীতির ইতিহাস সুদীর্ঘ। বহু আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রক্তিমসূর্য উদিত হয়। লক্ষ লক্ষ প্রাণ আর মা-বোনের ইজ্জত-আব্রুর বিসর্জনের মাধ্যমে এসেছে কাক্সিক্ষত সেই স্বাধীনতা। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার ৪৮ বছরে এসেও স্বাধীনতার সুফল-কুফল নিয়ে হিসাব কষতে হয় জনগণকে। যদিও যুক্তির বিচারে স্বাধীনতা সংগ্রামের অপরিহার্য্যতাকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না, তবুও ইনিয়ে-বিনিয়ে আবুল তাবুল বকতে দেখা যায় অনেককে। এর অন্যতম কারণ হলো প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির গড়মিল।

স্বাধীনতার প্রশ্নে বাঙালীর যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেটি স্বাধীনতা-উত্তর পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী দেশগড়ার ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি রাজনীতিবিদরা। ফলে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যেকারণে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হয়েছিল সেরকম ইস্যু স্বাধীন বাংলাদেশেও দেখা গেছে। গণতন্ত্র, সুশাসন, সুসমবন্টন, সুবিচার, বাক স্বাধীনতা, ভোটাধিকার, অবাধ-নিরপেক্ষ নির্বাচন, মানুষের মৌলিক চাহিদা ইত্যাদি ইস্যুতে স্বাধীন বাঙ্গালীর রক্ত ঝরেছে বহুবার। এর কারণ, সচেতন মহল ও রাজনীতিবিদদের অজানা নয়। তবে সেটাকে প্রত্যেক পক্ষ আপন আপন সুবিধা মতে ব্যাখ্যা করে থাকেন। স্বাধীনতার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি মিল ঘটাতে যা দরকার সেগুলো গত ৪৮ বছরে দেশের বুদ্ধিজীবী, কলমসৈনিক, সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, ধর্মীয় ব্যক্তিগণ বলে আসছেন। দুর্নীতি, দুঃশাসন, দুর্বৃত্তায়ন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দলীয়করণ, মাদক, জুয়া, ব্যভিচার, তদবিরবাজি, ঘুষের ছড়াছড়ি, মুদ্রা পাচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে স্ব স্ব অবস্থান থেকে তাঁরা বলেছেন এবং কাজ করেছেন।

তবুও দুর্নীতিতে এ দেশ বার বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। উল্লেখিত অপরাধগুলো সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা তো পায়নি; বরং সাত তলা আর গাছ তলার ব্যবধান সূচিত হয়েছে দিন দিন। এগুলোর বিরুদ্ধে আইন আছে, তবে প্রয়োগ হয়েছে খুবই কম। কারণ, রক্ষক যখন ভক্ষক, তখন প্রয়োগ করবে কে? কিন্তু ইতিমধ্যে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর সর্বত্র টনক নড়েছে। এটি এখন দেশের প্রধান আলোচনার বিষয় হয়েছে। আর তা হলো “ঘর থেকে এ্যকশান শুরু করা” এবং “যে-ই হোক, যা-ই হোক ছাড়বনা” নীতি ঘোষণা করা। পাশাপাশি উক্ত ঘোষণার বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হওয়া। প্রধানমন্ত্রীর এমন দ্ব্যর্থহীন ঘোষণায় প্রভাব পড়েছে সর্বমহলে। যারা কোন না কোনভাবে ক্যাসিনো, দুর্নীতি, টেন্ডারবাজির সাথে জড়িত তাদের সুরও পাল্টে গেছে। শোরগোল শুরু হয়েছে চতুর্দিকে। সাধুবাদ দিচ্ছে অনেকেই। কারণ, এ জায়গাতে রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট ছিল এতদিন। আরেকটি কারণ ছিল, আইন শুধু সাধারণ জনগণ এবং বিরোধী দলের জন্য; সরকারী দলের লোক অথবা কোনভাবে সরকারী দলের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকলে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা। এবার কিন্তু জি কে শামীম, খালেদ ভূঁইয়াদেরকে দিয়ে শুরু হয়েছে শুদ্ধি অভিযান। মুক্তিযোদ্ধা ক্লাবেও অভিযান চালানো হয়েছে। “রাঘব বোয়ালরা ছাড় পাবে না” বলেও দৃঢ়তার সাথে বলা হচ্ছে। সরকারপ্রধানের এমন দৃঢ়তা, দ্ব্যর্থহীনতা এবং একনিষ্ঠতা দেখে জনগণ আশার আলো দেখছে, যারা বিগত দিনে বার বার প্রতারিত হয়েছে। আইনের শাসন, ন্যায় বিচার, নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় সেবা যথাযথ ভোগ করতে পারেনি। মনে করতে পারেনি যে, এ দেশ আমার। বরং যখন যারা ক্ষমতায় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সব তাদের অধিকার- অনেকটা এ নীতিতেই চলেছে দেশ। যে কারণে দেশে বহু দলের জন্ম হয়েছে। একেক দলের একেক নীতিচর্চা করতে গিয়ে জনগণ শতধা বিভক্ত হয়েছে। যে দলই ক্ষমতাই এসেছে, জনগণ তাঁদেরকে দেখেছে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে। সরকার ও বিরোধী দলের বড় এজেন্ডা ছিল নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন। তারা সাধ্যমত নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে বৈকি! সে ধারাবাহিকতায় জনসেবার পরিবর্তে রাজনীতি একটি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক পদ হয়েছে কাড়ি কাড়ি টাকা কামানোর ভারী লাইসেন্স। যখন যারা ক্ষমতায় তখন তাদের বা তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের পোয়াবারো হয়েছে। আঙ্গুল ফুলে হয়েছে কলা গাছ। রাজনৈতিক অনেক কর্মীর সদিচ্ছা থাকলেও তারা সেরকম কর্মসূচি পায়নি। বেশিরভাগ কর্মসূচি পেয়েছে কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ি আর নৈরাজ্যের। সৎ আমলারা কোণঠাসা ছিলেন চাটুকার, দুর্নীতিবাজ ও স্বার্থান্ধদের দৌরাত্ম্যের সামনে। দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, লেখালেখি, বক্তৃতার সাথে রাজনীতিচর্চার দূরত্ব ছিল যোজন যোজন।

দুর্নীতি, ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি ইত্যাদিতে হাত দিয়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথেই হাঁটছেন। তিনি যদি বাংলাদেশকে দুর্নীতি, মদ-জুয়া, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, তদবিরবাজি, অসামাজিক কার্যকলাপ থেকে মুক্ত করতে পারেন অতীতের সবকিছু চাপিয়ে তিনি হতে পারেন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেত্রী; বাংলার আপামর জনগণের আস্থার বাতিঘর। আল্লাহ তায়ালা যদি সহায় হোন, এ পিচ্ছিল পথ পাড়ি দেয়া তাঁর পক্ষেই সম্ভব। কারণ, তিনিই বাঘা বাঘা নেতাদেরকে সংস্কারপন্থী হওয়ার কারণে নাকানি-চুবানি খাইয়েছেন। বিশ্বসংস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান করেছেন। জনভারে নুয়ে পড়া বাংলাদেশে প্রায় ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার মহানুভবতা দেখিয়েছেন। তাঁর পক্ষেই সম্ভব পরিবারতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে দেশপ্রেমিক যোগ্য রাজনীতিবিদ ও যোগ্য শাসক তৈরি করে তাদের হাতে আগামীর বাংলাদেশ তুলে দেয়া। আগামী প্রজন্মের সবার পরম শ্রদ্ধেয় মা হওয়ার সুযোগ তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। জনগণের মন জয় করে আগামীতে অবাধ নির্বাচন দিয়ে জনপ্রিয়তার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার সুযোগ এখন তাঁর হাতে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দলকে জনগণের দল এবং সর্বার্থে সোনার বাংলাদেশ গড়ার দল হিসেবেও প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে। এ পথ বড় পিচ্ছিল, বন্ধুর, দুর্গম। তবে এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার কোন বিকল্প নেই।

বিশ্বের সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রনায়ক হযরত মুহাম্মদ (দ.) প্রথমে নিজের গোত্রের রক্তপণের দাবি বাতিল করে হিংসাত্মক সমাজব্যবস্থার ইতি টেনেছেন। তিনি বলেছেন, যদি আমার মেয়ে ফাতিমাও অপরাধ করে আমি নিজের হাতে তার শাস্তি সুনিশ্চত করবো। মদ-জুয়াকে তিনি নিজের ঘর থেকে প্রথমেই বিতাড়িত করেছেন। তাই তাঁর ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়েছিল অক্ষরে অক্ষরে। এডওয়ার্ড গিবন বলেন, “মাদকের নিষেধাজ্ঞা তাঁর পরিবার থেকে সুনিশ্চিত করা হয়েছিল।”

২০২১ সালে মধ্যআয়ের এবং ২০৪১ সালে উন্নতদেশে পরিণত করার যে ভিশন নিয়ে সরকার কাজ করছে তা শুধু আর্থিক উন্নতি

নির্ভর নয়, সামাজিক ও নৈতিক উন্নতিও এর সাথে জড়িত। আর্থিক উন্নতির সাথে যদি দেশপ্রেম, উন্নত চরিত্র, নৈতিকতার সমন্বয় না হয় তাহলে পশ্চিমা বহু রাষ্ট্রের মত হয়ত অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হবে, কিন্তু বাঙালীর চিরাচরিত মায়া-মমতাপূর্ণ, শ্রদ্ধা-ভালবাসাপূর্ণ, নৈতিকতায় সমৃদ্ধ, সুখী ও শান্তির রাষ্ট্র হবে না। বৃদ্ধাশ্রম আর চাইল্ড কেয়ারের সংখ্যাই বাড়তে থাকবে। অতএব শুদ্ধি অভিযানের বিকল্প নেই, এর সাফল্য চাই।

ি ড. মুহাম্মদ নুর হোসাইন সহযোগী অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

The Post Viewed By: 67 People

সম্পর্কিত পোস্ট