চট্টগ্রাম শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯

সর্বশেষ:

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ

রেজা মুজাম্মেল

কিশোর অপরাধের রাশ টানতে হবে

‘কিশো র’ শব্দটি কানে আসলেই একটু আদর, একটু ভালবাসা-ভাললাগা, কিছুটা আবেগ কিংবা হৃদ্যতা মনে ভেসে ওঠে। সন্দেহ নেই, বয়সটাও আদুরে। কোমলমতি চেহারাটাকে ভালবাসতে সবারই মন চায়। কঠোর মানসিকতার মানুষও কিশোর-তরুণ বয়সীদের ভালবাসে। বয়সটাই এমন।
কিন্তু এখন? কিছু কিছু কিশোরের অসংলগ্ন আচরণের কারণে মানুষের স্মৃতিúটে এখন সে ধরনের সহানুভূতি কমই জেগে ওঠছে। এর সঙ্গতকারণও আছে। এতসব কারণ এখন কমবেশি সবার কাছেই পরিষ্কার। বর্তমান সময়, অবস্থা, প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি- সামগ্রিক দৃশ্যপট বিবেচনায় কিশোর অপরাধের বিষয়টি এখন কঠিন বাস্তবতা। প্রতিনিয়ত এ বাস্তবতা কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আগামীতে এ পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তাও বলা দুরূহ। বরং অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ কঠিন পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে কিনা কিংবা আদৌ সম্ভব কিনা তাও বলা যাচ্ছে না।

দুই. নিকট অতীতেও সন্ধ্যার পর কিশোর বয়সী কেউ বাসার বাইরে থাকত না। বলা যায়, পরিবার থেকে এমন অনুমতি ছিল না। অনেকটা নিষিদ্ধই ছিল। সন্ধ্যার পর বাইরে থাকাটা কোনো মতেই অনুমিত ছিল না। কেউ কখনো কোনো কারণে যদি সন্ধ্যার পর বাইরে থেকে যেত, তখন তার ওপর অলিখিত ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়ে যেত। ধুরু ধুরু বুক নিয়েই তাকে ঘরে ফিরতে হতো। প্রতিনিয়ত শঙ্কায়-ই থাকতে হতো। মনে মনে ভাবত- ‘জানি না আজ কী হবে। কোন্ ঝড়ো হাওয়া বইবে আমার ওপর।’ এমন কঠোর ও কঠিন মনোভাব নিয়ে বাসায় ফিরতে হতো। তদুপরি বাসায় ফিরেই কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হতো। রীতিমত আদালতের জবানবন্দী দেওয়া বা জেরার মতই অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে কখনো বেত্রাঘাত, কখনো হুমকি-ধামকিসহ নানা শাস্তির সম্মুখিন হতে হতো। কিন্তু এখন? এখন তো প্রায়ই সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা। আগের এসব দৃশ্য, পরিস্থিতি কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার মত কোনো অবস্থাই এখন আর অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ। ফলে পরিবার ও সমাজে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সন্ধ্যার পর একজন শিক্ষার্থী কেন বাসার বাইরে থাকবে? সন্ধ্যার পর বাইরে কিশোর বা শিক্ষার্থীর কাজ কী? সন্ধ্যার পর তো ক্লাস বা কোচিং থাকার কথা নয়। তাহলে কেন একজন কিশোর বা শিক্ষার্থী সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে থাকবে। অভিভাবকই বা কেন তাদের সন্তানদের সন্ধ্যার পর বাইরে থাকার অনুমতি দেবেন। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেতন এবং সতর্ক হওয়া জরুরি। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর চট্টগ্রাম নগরেরর জামাল খান মোড়, কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম এলাকা, চেরাগি পাহাড় মোড়, জিইসি মোড়সহ বিভিন্ন অভিজাত বিপনী বিতানের চত্ত্বরে কিশোর-তরুণদের সরব উপস্থিতি অনেক প্রশ্নেরই উদ্রেক করে। হয়তো কোনো সচেতন অভিভাবক চোখ-কান খোলা রেখে এসব এলাকায় একটু সময় ব্যয় করলে বাস্তব ও কঠিন অবস্থা অবলোকন করার সুযোগ হবে। তবে এমনটি মোটেও নয় যে, এসব স্থানে সব সময় নেতিবাচক কাজ হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা তো ঘটছে বা ঘটবে একদিন। সেই একটি ঘটনাই অনেক কিছু এলোমেলো করে দেওয়ার মতো।
পক্ষান্তরে, নগরে যে হারে উন্মুক্ত স্থান কমে যাচ্ছে, তাতে তরুণ-কিশোরদের সময় কাটানোর মত এতটুকু উপযুক্ত স্থান নেই। এমন অবস্থায় স্বভাবত কিশোর-তরুণরা এসব উন্মুক্ত স্থানে একটু সময় পার করবে, এতে দোষের কি আছে? এমন প্রশ্নও আসতে পারে। কিন্তু প্রশ্নটা সময় কাটানোর নয়, গুরুত্বপূর্ণ এবং মুখ্য বিষয় হলো, সময়টা কখন, কোথায়, কার সঙ্গে এবং কী করে কাটানো হচ্ছে, সেটাই বিবেচ্য। আজকের একটু সময় কাটানোর বিষয়টা একজন কিশোরের আগামী জীবনের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অতএব এখনো সময় আছে সতর্ক, সচেতন, কঠোর ও সাবধান হওয়ার।

তিন. কিশোর-তরুণরা অপরাধে জড়াচ্ছে কেন? বিষয়টি আসলেই একটি গবেষণার। তবে এর অনেক কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সর্বসাকুল্যে কিছু উল্লেখযোগ্য কারণ বলা যায়। এর মধ্যে আছে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের ঘাটতি, সমকালীন প্রেক্ষাপটে পারিবারিক অনুশাসন কমে যাওয়া, বন্ধু নির্বাচনে অপরিণামদর্শীতা, পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ কমে যাওয়া, উন্নত প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্টতা ও অনুকরণ, সুষ্ঠু ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা না হওয়া, ক্রমাগত হারে খেলার মাঠ কমে যাওয়া, সামাজিকভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন না থাকা, প্রতিনিয়তই সাইবার জগতে ডুবে থাকা এবং সেখান থেকে যা শিখছে তা প্রয়োগ করতে গিয়ে বিপথগামী হওয়া। তাছাড়া

ভিন্ন একটি চিত্রও আছে। অনেক পরিবারে দেখা যায় বাবা-মা দু’জনই চাকরিজীবী। ফলে সন্তানের প্রতি তাদের সচেতনতা থাকার কথা সেটা অনেকাংশেই হচ্ছে না। এতে করে সন্তানরা সহজেই বিপথগামী হয়ে উঠছে।
তবে একটি বিষয় খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো পুঁজিবাদি অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে প্রচুর টাকার মালিক হচ্ছে অনেকে। ফলে এসব পরিবারের সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই অর্থের প্রতি প্রলুব্ধ হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই সহজে তাদের হাতে চলে আসছে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ। সেই অর্থ কেউ কেউ ব্যয় করছে নানা অপকর্মে। মিশছে অসৎ সম্পর্কের সঙ্গে।
চার. কিশোর অপরাধ প্রবণতার নতুন সংস্করণ হলো ‘কিশোর গ্যাং’। সাধারণত কিশোর গ্যাং বলতে বোঝায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গড়ে ওঠা কয়েকজনের একটি গ্রুপ বা অভিন্ন এলাকার কয়েকজন কিশোর মিলে তৈরি করা একটি দল। মূলত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়েই গড়ে উঠছে এ ধরনের গ্যাং বা গ্রুপ। স্কুল-কলেজের কিছু ছাত্র আড্ডা দিতে দিতে গড়ে ওঠে ছোট ছোট গ্রুপ। এক সঙ্গে ঘোরাঘুরি, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া, খেলা আর আড্ডার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় পরস্পর বন্ধুত্ব। পরে ক্ষমতা, সিনিয়র-জুনিয়র, আধিপত্য, নেতৃত্ব নিয়ে তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। বন্ধুত্ব রূপ নেয় হিং¯্র ও সহিংসতায়। ঘটায় ছোটখাটো সন্ত্রাস, ছিনতাইয়ের ঘটনা। এই কিশোররা ড্রাগ, খুন, ইভটিজিং, ছিনতাই, মাদকসেবন, চুরি এমনকি ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে। বলা যায়, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর আদনান হত্যার ঘটনার মধ্যদিয়ে কিশোর গ্যাং এর বিষয়টি প্রকাশ পায়। এরপর থেকে শুরু হয় কিশোর গ্যাং এর নানা অপকা-।
পাঁচ. কিশোর অপরাধের কারণে পরিবার ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। মা-বাবা প্রতিনিয়তই চিন্তিত থাকেন সন্তানদের নিয়ে। কখন কোন দুঃসংবাদ কানে বাজে। একজন বিপদগামী কিশোরের জন্য একটি পরিবার যারপরনাই শঙ্কিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি একটি পরিবারের জন্য হয়ে ওঠে চরম অভিশাপ। কিন্তু এমন আতঙ্কিত সময় পার আর কত? সবাই চান এ সমস্যার রাশ টানতে।

এর জন্য প্রয়োজন পরিবারের কর্তাব্যক্তি, অভিভাবক, সমাজ এবং দায়িত্বশীলদের সতর্ক ও সচেতনতা। কিশোর-তরুণদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ। কিশোরদের সামাজিক-পারিবারিক সহযোগিতা প্রদান। সুষ্ঠু-সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ দেয়া। সৃষ্টিশীল, মননশীল ও শৈল্পিক কর্মকা-ে আগ্রহী করে তোলা। পাঠ্যবই ও বাহ্যিক জ্ঞান আহরণে আকৃষ্ট করা। নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়া। তবেই কিশোর-তরুণ হবে বিপদমুক্ত। সমাজ হবে জ্ঞাননির্ভর। দেশ পাবে মেধাবী সন্তান।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

The Post Viewed By: 83 People

সম্পর্কিত পোস্ট