চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ০২ মার্চ, ২০২১

সর্বশেষ:

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | ২:৩৫ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ শুরু

হ যারা নাগরিকত্ব লাভ করেছে, তাদেরও তালিকা করা হবে হ নতুন আসা রোহিঙ্গাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে পুরাতনরা : পটিয়া ইউএনও

চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ করছে সরকার। স্বাধীনতা পূর্ব-পরবর্তীতে বাংলাদেশ আসা মিয়ানমারের নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া, জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া, বিয়ে-শাদি করে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নাগরিকদেরও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পটিয়া উপজেলায় ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। সকল ধরনের রোহিঙ্গাদের চিহিৃত করার জন্য চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি দিয়েছেন ইউএনও। নগরীর বিভিন্ন বস্তি, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যপাড়া ও জেলার প্রতিটি উপজেলায় নতুন ও পুরোনো সকল রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। একাধিক সূত্রে এই তথ্য জানা যায়।

পরিসংখ্যন ব্যুরো ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শুমারি করেছে। তবে সেই শুমারির তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্র জানায়, নগরীর সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা রয়েছে বাকলিয়া বাস্তুহারা বস্তিতে। ইতিমধ্যেই একাধিক সংস্থা বাকলিয়া বস্তিতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ করছে। বস্তিতে বসবাসরত একাধিক বাসিন্দা ও বাস্তুহারা সমবায় সমিতির একাধিক নেতা জানান, সমিতির সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন প্রকাশ বার্মাইয়া জসিম বা বাস্তুহারা জসিম সমিতির দায়িত্ব পালনের সময় রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন বেশি করেছে। নতুন-পুরোনো মিলে বর্তমানে শতাধিক পরিবারের বসবাস রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই ভোটার হয়েছে। বার্মাইয়া জসিম গত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৫নং বক্সিরহাট ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। জসিম ছাড়াও বাস্তুহারা বস্তিতে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করেছেন সমিতির নারী নেত্রী তানিয়া বেগম। তানিয়াও মিয়ানমারের নাগরিক বলে বস্তিবাসী দাবি করেছে। বাস্তুহারা সমিতির একাধিক নেতা জানান, সরকারের বিভিন্ন সংস্থা প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের তথ্য সংগ্রহ করছে। শুধু নতুন আসা নয়, পুরোনো রোহিঙ্গাদেরও তালিকা সংগ্রহ করছে। নগরীর বিভিন্ন স্থান ও বস্তিতে রোহিঙ্গাদের বসবাস রয়েছে। বাকলিয়া, কালামিয়া বাজার এলাকায় বেশি রয়েছে। পুরোনো রোহিঙ্গারা আত্মীয়তা সূত্র ধরে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ঠাঁই করে দিয়েছে।

শুধু নগরী নয়, জেলার দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রতিটি উপজেলায় রোহিঙ্গাদের বসবাস রয়েছে। বিশেষ করে চন্দনাইশ, পটিয়া, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, বোয়ালখালীতে বেশি বসবাস রয়েছে। চন্দনাইশের দোহাজারীতে শঙ্খ নদীর তীরে রোহিঙ্গাদের বসবাস বেশি। বার্মাইয়া কলোনি নামে বিশাল কলোনি রয়েছে। ২০-২৫ বছর আগে আসা রোহিঙ্গারা এখানে বসতি গড়ে তুলেছে। আত্মীয়তার সূত্র ধরে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই ঢুকে গেছে এই এই কলোনিতে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই কলোনিতে চলে মাদক, ইয়াবাসহ নানা অপকর্ম। স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রশ্রয়ে বার্মাইয়া কলোনির পরিধি বেড়েই চলেছে। রাজনৈতিক নেতারা শঙ্খ নদীর জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি তৈরি করে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পটিয়া উপজেলার রেলস্টেশন সংলগ্ন বার্মা কলোনি রয়েছে। এতে দুই শতাধিক পরিবারের বসবাস রয়েছে। এছাড়াও পৌরসদর, পাহাড়ি এলাকা হাইদগাঁও, কেলিশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাস রয়েছে। সেই সূত্র ধরে নতুন আসা রোহিঙ্গারাও পুরোনো সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। সম্প্রতি হাইদগাঁও এলাকা থেকে নতুন আসা ৪০ জন রোহিঙ্গা আটক করে টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাঠিয়েছিল। পরবর্তীতে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে ফের পটিয়ায় ফিরে আসে।
পটিয়া উপজেলায় রোহিঙ্গাদের তালিকা প্রস্তুত করার জন্য সকল চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এলাকায় এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে।

পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল হাসান পূর্বকোণকে বলেন, ‘রোহিঙ্গা নাগরিকদের তালিকা করার জন্য সকল চেয়ারম্যানদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। যারা নাগরিকত্ব লাভ করেছে, তাদেরও তালিকা করা হবে। কারণ পুরোনো রোহিঙ্গারা নতুনদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে।’ তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালে বড়লিয়া ইউনিয়নের এক রোহিঙ্গা নারীর জন্মসনদ বাতিলের জন্য চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেছিলাম। সেই সনদ বাতিল করা হয়েছে।
বোয়ালখালী উপজেলা সদর গোমদ-ী রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় রোহাইপাড়া নামে একটি পাড়া রয়েছে। ৩০-৩৫ বছর আগে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে এসে এখানে বসবাস শুরু করেছিল। পর্যায়ক্রমে এলাকাজুড়ে বার্মাইয়ারা (রোহাইপাড়া) বসতি গড়ে তুলে। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব রাখে সেই রোহাইপাড়ার ভোটাররা।
সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা, বাজালিয়া, পুরানগর এলাকায় রোহিঙ্গাদের স্থায়ী বসবাস রয়েছে। ভোগৌলিক ও যোগাযোগব্যবস্থা সুবিধার কারণে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের অনেকেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে। এসব উপজেলা ছাড়াও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে রোহিঙ্গারা। বিশেষ করে পুরোনো রোহিঙ্গাদের ছত্রছায়ায় নতুন রোহিঙ্গাদের অনেকেই বিভিন্ন এলাকায় মিশে গেছে।

২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে মিয়ানমার সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে আশ্রয় নেয় বাংলাদেশে। টেকনাফ ও উখিয়ার প্রায় ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা আশ্রয় নেয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে এসেছিল আরও অন্তত তিন লাখ রোহিঙ্গা। প্রায় ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশ সরকারের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেকনাফ-উখিয়া ক্যাম্প থেকে পালিয়ে অনেক রোহিঙ্গা বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে যাচ্ছে। বিশেষ করে ৩০-৪০ বছর আগে আসা রোহিঙ্গাদের পৃষ্ঠপোষকতা ও ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছে নতুন আসা রোহিঙ্গারা।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 466 People

সম্পর্কিত পোস্ট