চট্টগ্রাম রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৬ আগস্ট, ২০১৯ | ২:১১ এএম

নাজিম মুহাম্মদ

৯ গ্রুপে ৫০ জন চোর

চুরিতে সাংকেতিক শব্দ

দলনেতাসহ গ্রেপ্তার ১১

ওরা পঞ্চাশজন চুরি করে দেশজুড়ে। বাসাবাড়ি নয়, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তারা চুরি করে লাখ লাখ টাকা। একটি প্রতিষ্ঠানের তালা কাটতে তাদের সর্বোচ্চ সময় লাগে তিন মিনিট। চোরের এ বিশাল গ্রুপের দলনেতা কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার বরকান্দা গ্রামের মৃত আলি মিয়ার ছেলে মো. হানিফ (৪০)। ডান হাত বিকলাঙ্গ থাকায় হানিফকে লোকজন তেমন সন্দেহ করে না। তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসাবে কাজ করে নরসিংদীর রায়পুরের মৃত আলাউদ্দিনের ছেলে কামাল হোসেন (২৮)। পঞ্চাশজনের চোরের দল ৯ গ্রুপে ভাগ হয়ে চুরি করে সারাদেশে। এদের মধ্যে দলনেতা হানিফসহ এগারোজনকে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালী থানা পুলিশ। বিশেষ করে ঢাকার গুলশান, মহাখালি, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ি, ব্রাহ্মণপাড়া, কুমিল্লা, সিলেট কোতোয়ালী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম শহরে তারা অভিনব কায়দায় চুরি করে। চুরি করার আগে টার্গেট করা প্রতিষ্ঠান দিনের বেলায় তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে নেয়। কিভাবে চুরি করবে, টার্গেট করা দোকানে কি পরিমাণ বেচাকেনা হয়, চুরি করার পর কোনপথে নিরাপদে চলে যাবে, চুরি করতে কতজন জনবল লাগবে, কি ধরণের যন্ত্রপাতি লাগবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে চুরি করার চূড়ান্ত মতামত দেন কামাল।

নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মেহেদী হাসান জানান, বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টার্গেট করে নগদ টাকা ও মূল্যবনা মালামাল চুরি করে তারা। বারো বছরের অধিক সময় ধরে তারা চুরির কাজে জড়িত। চুরি করার জন্য তাদের নিজস্ব সাংকেতিক শব্দও রয়েছে। নয়টি গ্রুপে চোরের দলে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০ জন। এক গ্রুপ ধরা পড়লে অন্য গ্রুপ চুরি করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে সহযোগীদের জামিনের ব্যবস্থা করে। কেউ গ্রেপ্তার হলে জামিন না হওয়া পর্যন্ত সংসার খরচের জন্য টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।

যেভাবে চুরি করে : পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, সাধারণত কাপড়, মুদি দোকান, বিভিন্ন কোম্পানির ডিস্ট্রিবিউটর অফিস দিনের বেলায় ঘুরে ঘুরে টার্গেট করে ওরা। দলনেতা হানিফ মূলত এ কাজটি করে থাকে। তার ডান হাত বিকলাঙ্গ থাকায় লোকজন তাকে তেমন সন্দেহ করে না। টার্গেট করার পর সেকেন্ড ইন কমান্ড কামালকে সংবাদ দেয়া হয়। পর্যবেক্ষণ করে চুরি করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়ার পর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যারা চুরি করবে তাদেরকে সংবাদ দেয়া হয়।
নগর পুলিশের দক্ষিণ জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ মোহাম্মদ আবদুর রউফ জানান, দোকানের শার্টারের প্রস্ত ছোট হলে লাগানো তালা কেটে তারা প্রবেশ করে। আর শার্টারের প্রস্ত বড় হলে দু’ পাশে টেনে ফাঁক করে একজন অথবা দু’জন ভেতরে প্রবেশ করে। পথচারীদের দৃষ্টি আড়াল করতে চুরি সংগঠিত দোকানের সামনে লুঙ্গি বা বিছানার চাঁদর কিংবা ছাতা মেলে কৌশলে তালা কাটার কাজটি করে।

চুরিতে সাংকেতিক শব্দ : সাধারণ মানুষ কিংবা আইনশ্ঙ্খৃলা বাহিনীর চোখ এড়াতে চুরির কাজে সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে হানিফের চোরের দল। যেমন- দোকানকে বলা হয় ‘অফিস’, তালাকে বলা হয় ‘আম’, তালা কাটার কার্টারকে বলা হয় ‘গাড়ি’, বিছানার চাঁদরকে বলা হয় ‘ঠোঙ্গা’, দোকানের ভেতরে চুরি করতে যে প্রবেশ করে তাকে বলা হয় ‘অফিসম্যান’, পুলিশকে ডাকা হয় ‘ তেইল্যাচোরা’ (তেলাপোকা), সংবাদদাতাকে ডাকা হয়‘ লাইনম্যান’, চুরি করাকে বলা হয় ‘ডিউটি’, চুরির টাকাকে বলা হয় ‘ ব্যবসা’, একলাখ টাকাকে বলা হয় ‘একটাকা’।

কোতোয়ালী থানার পরিদর্শক (ওসি) মো. মহসিন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কোতোয়ালী থানা এলাকায় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এরমধ্যে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা, অন্য একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১২টি ল্যাপটপ, সাড়ে পাঁচশো পেনড্রাইভ, প্রায় ৫’শ পিস মেমোরি কার্ডসহ প্রায় ১২ লাখ টাকার মালামাল চুরি হয়। গোপান সংবাদের ভিত্তিতে লালদিঘি এলাকার একটি হোটেল থেকে এগারোজন চোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। দলনেতা হানিফ, কামাল ছাড়া চোর গ্রুপের আরো নয় সদস্য হচ্ছে, ভুজপুরের লিয়াকত হোসেন, কুমিল্লার মুরাদনগরের আকরাম প্রকাশ আরমান, একই এলাকার মো. তৌফিক, ব্রাহ্মণপাড়ার মো. মাসুম, আনোয়ারার নয়ন মল্লিক, কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের মো. মিলন, একই এলাকার জামাল উদ্দিন, মুরাদনগরের কামাল ওরফে ভুসি কামাল ও একই এলাকার মো. মিজান।

The Post Viewed By: 542 People

সম্পর্কিত পোস্ট