চট্টগ্রাম বুধবার, ০৭ জুন, ২০২৩

২২ মার্চ, ২০২৩ | ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ

রাজীব রাহুল 

বিশুদ্ধ পানির নামে চলছে প্রতারণা

পানির অপর নাম জীবন। কথাটা কেবল বিশুদ্ধ পানির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ওয়াসা জন্ম থেকে বলছে ‘ওয়াসার পানি ড্রিংকেবল, ড্রিংকিং ওয়াটার না’ কে মানছে কার কথা। চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন জায়গায় প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান ওয়াসার পানিকেই ড্রিংকিং ওয়াটার বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ফলে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে পানিবাহিত জটিল রোগে। হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য। পূর্বকোণের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন চিত্র। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) কোন প্রকার অনুমোদন ছাড়াই চলছে এসব প্রতিষ্ঠান।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসটিআই চট্টগ্রাম অফিসের সহকারী পরিচালক (সিএম) মোস্তাক আহমেদ জানান, চট্টগ্রামে বিএসটিআই অনুমোদিত ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটারের অনুমোদন রয়েছে ২টি প্রতিষ্ঠানের। তার মধ্যে একটি  নগরীর চান্দগাঁওয়ের সানোয়ারা ড্রিংকস এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের উৎপাদিত ‘ইয়েস’। অন্যটি হলো রাউজান গহিরার শ্রী কু-েশ্বরী ঔষধালয়ের উৎপাদিত ‘সিনমিন’।

 

অন্যদিকে বিএসটিআই অনুমোদিত ড্রিংকিং ওয়াটারের মধ্যে রয়েছে এক কিলোমিটার শাহ আমানত ব্রিজ কানেকটিং রোডের নাজের ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘জারা, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার তাহেরী এগ্রো ফুডস এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘সতেজ প্রিমিয়ার’ ও ‘অ্যাকুয়া হর্স প্রিমিয়ার’, আগ্রাবাদ বেপারী পাড়ার মের্সাস ফ্রেন্ডস কো এন্টারপ্রাইজের ‘ফ্রেন্ডস  কো’। নাসিরাবাদ শিল্প এলাকার জয় ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘মীম সুপার’ সীতাকু- ভাটিয়ারির এসএ  বেভারেজ লিমিটেডের ‘মুসকান’, পটিয়া ধলঘাটের এম এন আর বি ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘সালসাবিল’, বায়েজিদ এ-ব্লকের ফেভারিটা লিমিটেডের ‘ব্লু অ্যাকোয়া’, চান্দগাঁও মোহরা এলাকার উইষ্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের ‘ উইষ্ট’ ও ‘কে-ওয়াটার’ ।

 

তিনি আরও জানান, লাইন্সেস নবায়ন ও প্রক্রিয়াধীন আছে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের। যার মধ্যে নগরীর পূর্ব বাকলিয়া আবদুল লতিফ হাটে অবস্থিত আনন্দ পিওর ড্রিংকিং ওয়াটারের ব্র্যান্ড ‘আনন্দ’, চকবাজার কে বি আমান আলী রোডের ম্যাক বেভারেজের ‘ম্যাক’ এবং মারস (বিডি) ফুড এন্ড বেভারেজের ব্র্যান্ড ‘নিউ ওরিয়েন্ট’, খুলশী জালালাবাদের তাকওয়া এন্টারপ্রাইজের (সিরাজ ফুড প্রোডাক্টস) ‘বাহীব’, কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকার মীর ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘মীর’, বোয়ালখালী পশ্চিম গোমদ-ীর কনফিডেন্স ফুড এন্ড বেভারেজের ‘কনফিডেন্স’, দক্ষিণ-মধ্য হালিশহরের জে বি এন্টারপ্রাইজের ‘দিশা’, উত্তর পতেঙ্গার ‘দাদা’, চান্দগাঁও শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়কের এস এস ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘শীতল’, পশ্চিম বাকলিয়া ডিসি রোডের শাহ গাজী ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘নীড’, সদরঘাট স্ট্যান্ড রোডের ওরিয়েন্টেড রিফাইন্ড ওয়াটার কোম্পানির ‘মাউন্ট’, বাকলিয়া রাজাখালীর মালিক ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘লিন’, আবকবরশাহ সলিমপুর মডেল শিল্প এলাকার মাশরিফা ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ‘মামিয়া’ উল্লেখযোগ্য।

 

তবে সরোজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে বিএসটিআইয়ের কোন প্রকার অনুমোধন ছাড়া চট্টগ্রাম নগরীতে ড্রিংকিং ওয়াটারের কারখানা পরিচালনা করেছেন অর্ধ শতাধিক ব্যবসায়ী। এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন আছে কিনা জানতে চাইলে বিএসটিআই চট্টগ্রাম অফিসের সহকারী পরিচালক (সিএম) মোস্তাক আহমেদ স্বীকার করেন এসব অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিকবার মামলা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানার করার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

 

তাহলে কিভাবে এসব প্রতিষ্ঠান ড্রিংকি ওয়াটারের নামে ওয়াসার পানি জারে ভরে ব্যবসা করছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, বিএসটিআইয়ের আইনে কারখানা বন্ধ বা সিল করার ক্ষমতা নেই আমাদের। এই সুযোগটা এসব অসাধু ব্যবসায়ী নিচ্ছে বলে জানান তিনি।

 

অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, নগরীর বাদশা চেয়ারম্যান ঘাটার নাহার ড্রিংকি ওয়াটার, কালামিয়া বাজারের আয়েশা ড্রিংকি ওয়াটার, তুলাতলি বালুরমাঠ এলাকার ইকো ড্রিংকিং ওয়াটার, তুলাতলি নয়া মসজিদ এলাকার ওয়াইসিস ড্রিংকি ওয়াটার,ডিসি রোড শিশু কবরস্থান এলাকার মা ড্রিংকি ওয়াটার, শমসের পাড়া,  ডেন্টাল হাসপাতালের পাশে স্কাইল্যান্ড ড্রিংকিং ওয়াটার, সিএন্ডবি বালুরটাল এলাকার আল রিয়াদ ড্রিংকিং ওয়াটার, অক্সিজেন মোড় এলাকার ড্রিংকিং ওয়েল ওয়াটার এবং আপন ড্রিংকিং ওয়াটার, একই এলাকার অক্সিজেন ড্রিংকিং ওয়াটার, সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার পিউর এন্ড ফ্রেশ ড্রিংকিং ওয়াটার, ব্যাটারি গলি,মধুবনের বিপরীতে কাউন্সিলর ড্রিংকিং ওয়াটার, জিইসি এলাকার নিডস ড্রিংকিং ওয়াটার, একে খান কমিশনার মঞ্জুর কারখানার পাশে সাজিদ ড্রিংকিং ওয়াটার, ব্যারিস্টার কলেজ মদিনা ড্রিংকিং ওয়াটার, এনায়েত বাজার রাণীর দিঘির পাড় এলাকার  ডিউ ড্রপ ড্রিংকিং ওয়াটার ।

 

চট্টগ্রাম ড্রিংকিং ওয়াটার ওনার এসোসিয়েশনের সভাপতি ফয়সাল আব্দুল্লাহ আদনান বলেন, আমার সংগঠনে নগরে আছে ৪৮টি ও বিভাগে আছে ১২৭টি ড্রিংকি ওয়াটার প্রতিষ্ঠান। নগরে ৩৭টি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদন ছিল ২০২০-২১ পর্যন্ত। পরে বিএসটিআই লাইন্সেস পাওয়ার শর্ত হিসেবে ৯টি প্যারামিটার সংযোজন করে । যার তিনটি শর্ত বাংলাদেশে পূরণ করা সম্ভব নয়। কারণ আমরা নদীর পানি প্রসেস করি এটাতে প্লেটস (অনুজীবাণু) আগে ১ হাজার রাখা হলেও এখন ১০০ করা হয়েছে। যা শুধুমাত্র পর্বতের পানি প্রসেস করলে পারা যাবে। যেমন বাইরে থেকে আসা ‘ইবিআইএন’ ও ‘টেরিয়ার’ পানি প্রতি লিটার ২৭০ টাকা পড়ে। সেগুলো পর্বত থেকে প্রসেস করা। এছাড়া জার কেলিব্রেশন বিএসটিআই গত বছর থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকায় শুরু করেছে। এর আগে তিনটা ১৯ লিটারের জার নিয়ে আমাদের ঢাকা সাইন্স ল্যাবে যেতে হতো। তখন ফি নিতো সাড়ে ৬ হাজার টাকা। যখন সারা বাংলাদেশ থেকে দুই হাজারের কাছাকাছি প্রতিষ্ঠানের চাপ পড়ে তারা তখন ফি বাড়িয়ে ৪৭ হাজার দুইশ টাকা করে। চট্টগ্রাম থেকে জারে করে স্যাম্পল নিয়ে যেতে সাত আট ঘণ্টা পর এগুলোর মান কিভাবে ঠিক থাকবে। এসব বিষয়ে বিএসটিআইয়ের সহযোগিতা পাচ্ছি না আমরা। তাই অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান আবেদন করে বসে আছে।

 

লাইন্সেস জটিলতা নিয়ে চান্দগাঁও এলাকার এস এস ফুড এন্ড বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘শীতল’ ড্রিংকিং ওয়াটারের মালিক সজীব রায় জানান, গত দেড় বছরে নগরীতে প্রায় চল্লিশটিরও বেশি প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অনেক চেষ্টা করেও অনুমোদন পায়নি। আমার মতে ড্রিংকিং ওয়াটার ব্যবসায়ীদের নিয়ে সরকারের আরও ভাবা উচিত। কিভাবে আমরা জটিলতা ছাড়া বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করতে পারবো এবং তা ভোক্তার কাছে পৌছাতে পারবো।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট