চট্টগ্রাম শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

সর্বশেষ:

২৪ আগস্ট, ২০১৯ | ৩:১৫ এএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

ডলার নাছিরের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

ক্রিকেট জুয়ায় বাড়ি বিক্রি!

পানওয়ালা পাড়ায় সর্বস্বান্ত ব্যবসায়ীসহ বহু লোক

আসল নাম মো. নাছির উদ্দিন। নগরীর আগ্রাবাদ পানওয়ালাপাড়ায় যাকে ডলার নাছির বলেই সবাই চেনেন। ব্যক্তিগতভাবে কিছু না করলেও ডলার নাছির বর্তমানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। বিভিন্ন সময় চলা ক্রিকেট খেলায় জুয়ার আসর বসিয়ে কৌশলে মানুষকে ঠকানোই তার কাজ। বর্তমানে নাছির কোটিপতি। অনেকেই তার জুয়ার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে এখন পথের ফকির।
এই যেমন একই এলাকার ফোন ফ্যাক্স ব্যবসায়ী জাফর সাদেক। কয়েক মাস আগেও যিনি পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন, সেই জাফর সাদেক এখন পথের ফকির। নাছিরের জুয়ার ফাঁদে পড়ে পৈত্রিক সম্পত্তি হারিয়ে এখন অন্য এলাকায় গিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন তিনি।

জাফর সাদেক পূর্বকোণকে বলেন, ‘গত ৩ মাস আগে চলা আইপিএল ক্রিকেটে নাছিরের সাথে বাজিতে বসি। এতে আমি কয়েক ম্যাচ হেরে গেলে আর খেলবো না বলে চলে আসি। কিন্তু সে (নাছির) আমাকে চাপ সৃষ্টি করে খেলার জন্য। বাধ্য হয়ে তার সাথে নিয়মিত খেলে আসছি। যার কারণে আমার পৈত্রিক সম্পত্তি যা ছিল, তা বিক্রি করে তাকে এক কোটি টাকা দিয়েছি। কিছু টাকা বাকি ছিল বলে সে এসে আমাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ওই টাকাও নিয়ে গেছে। আমার আর কিছুই নাইরে ভাই। আমি ফকির হয়ে গেছি’।

শুধু ব্যবসায়ী জাফর সাদেক-ই নয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একই এলাকার এমন আরও কয়েকজনকে ফাঁদে ফেলে পকেট পুতুর করে ছেড়েছেন নাছির। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে স্কুল ছাত্রকেও জড়িয়েছে জুয়ার আসরে।
তাদের মধ্যে গার্মেন্টস ব্যবসায়ী মো. আলম। যিনি বর্তমানে তিন তলা বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। জুয়া খেলায় নাছিরের কাছে ১৬ লাখ টাকা দেনা হয় আলমের। টাকা না দিতে পারায় একই এলাকার আলমের মালিকানাধীন তিনতলা বাড়িটি নাছিরের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন । এ প্রসঙ্গে আলম পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রথম থেকে আমি আমার বাড়ির উপরের দুই তলা বিক্রি করে দিয়েছিলাম। সর্বশেষ খেলায় আমার কাছে প্রথমে ১৬ লাখ টাকা পাওনা হয় নাছির। কিন্তু টাকা দিতে না পারায় তিনি বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। পরে আমাকে ১৪ লাখ টাকা দিবেন বলে আমার বাড়ির নিচতলা তার নামে লিখে দিতে বলেন। আমিও বাধ্য হয়ে তার কাছে নিচ তলা লিখে দিই। কিন্তু তিনি আর আমাকে কোন টাকাই দেয়নি। এখন শুনি আমি ওই বাড়ির দুই এবং তৃতীয় তলা যাদের কাছে বিক্রি করেছি, তারাও ওই বাসা ছেড়ে দিয়েছে নাছিরের কাছে’। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি ভুল করেছি ভাই। আমার এমন ভুলে আজ পথে বসেছি। এমন ভুল যেন আর কেউ না করে। আমি খেলতে না চাইলেও সে (নাছির) জোর করে খেলায় বসাতো’। না খেললে হুমকিও দিতো বলে জানান তিনি।

স্থানীয়রা জানায়, বছর দু’য়েক আগে অন্য এলাকা থেকে এসে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে নাছির। পুলিশের সাথে তার সম্পর্ক থাকায় স্থানীয়রা ভয়ে তার সাথে কথাও বলেন না। মাঝেমধ্যে একাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে এসে এলাকায় মহড়া দিয়ে থাকেন নাছির। যাতে করে এলাকাবাসী তাকে আরও ভয় পায়। তাই কেউ তার বিরুদ্ধে কথাও বলতে চাইতো না।
এদিকে, নাছিরের এমন কর্মকা-ের বিরুদ্ধে গতকাল (শুক্রবার) জুমার নামাজের পর মানববন্ধন করেছে এলাকাবাসী। যদিও মানবন্ধন চলাকালীন পুলিশ এসে বাধা দেয়। এসময় মানবন্ধনের ব্যানারও ছিঁড়ে ফেলে পুলিশ সদস্যরা এবং উপস্থিত জনগণকে স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য করে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুলিশের সাথেই সখ্যতা রয়েছে নাছিরের। যার কারণে মাঝেমধ্যে পুলিশ দিয়েই এলাকাবাসীকে হুমকি-ধমকিও দিয়ে থাকেন তিনি। সখ্যতা থাকার কারণে নাছির কমিউনিটি পুলিশের ১০৭ নম্বর বিট পানওয়ালা পাড়ার সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন। যদিও এসব বিষয় অস্বীকার করেছেন স্বয়ং ডবলমুরিং থানা পুলিশ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আকবর আলী পূর্বকোণকে বলেন, নাছির এলাকার ছেলে নয়। কিন্তু তার প্রভাব অনেক বেশি। পুলিশ তার বিরুদ্ধে কিছুই করে না। গতকাল (শুক্রবার) নামাজের পর এলাকাবাসী তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করলে পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেয় এবং ব্যনার কেড়ে নিয়ে যায়। তার কারণে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আমরা অব্যশই তার বিচার দাবি করি’।
এসব বিষয়ে জানতে নাছিরের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে কল দিয়ে পূর্বকোণ পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোন কেটে দেন। এরপর একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডবলমুরিং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুদীপ কুমার পূর্বকোণকে বলেন, ‘এমন নামে আমাদের কেউ পুলিশ বিটের সদস্য নয়। তাছাড়া এ বিষয়ে এতদিন কেউ অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে পুলিশ অব্যশই ব্যবস্থা গ্রহণ করতো’।

মানবন্ধনে বাঁধা দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমনটি হওয়ার কথা নয়। এলাকাবাসী মানববন্ধন করলে পুলিশ কেন বাধা দিবে। আমি খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাচ্ছি। তবে এ বিষয়ে ওসি আর কিছুই জানাননি প্রতিবেদককে’।

The Post Viewed By: 3178 People

সম্পর্কিত পোস্ট