চট্টগ্রাম শনিবার, ০১ এপ্রিল, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ | ১২:১৬ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাঙালির জাগরণ শুধু ভাষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েকমাস পর থেকে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। নতুন রাষ্ট্রে বাঙালি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকাশের প্রথম পদক্ষেপ। দেশ বিভাগের পর বাংলার মূল কেন্দ্র কলকাতা ছিল পূর্ববঙ্গের বাইরে ভারতের অংশে। সে সময় এ অঞ্চল থেকে বহু হিন্দু জমিদার কলকাতায় চলে যান। অন্যদিকে ভারতের ধনাঢ্য মুসলমানেরা চলে যান পশ্চিম পাকিস্তানে। ভূমি নির্ভর ধনাঢ্য মুসলমানেরা বাস করতেন পশ্চিম পাকিস্তানেই। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে পূর্ব বাংলায় সরকারি চাকরিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের আধিপত্য ছিল। দেশ বিভাগের পর অধিকাংশ হিন্দু কর্মকর্তা-কর্মচারী ভারতে চলে যান। ফলে শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, চাকরির ক্ষেত্রেও উর্দুভাষীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানিরা বোঝাতে চাইত তারা বাঙালিদের চেয়ে উন্নত। তাদের আচরণে সেটাই প্রকাশ পেতে থাকে। বাঙালিরা বুঝতে পারে উর্দু রাষ্ট্র ভাষা হলে স্বভাবতই চাকরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বাঙালিরা সুবিচার পাবেন না। তাই ভাষার প্রশ্নটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল।

 

নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের বেশির ভাগ মানুষের বাস ছিল পূর্ব বাংলায়। পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানবগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালি ৫৬ শতাংশ। যেখানে উর্দুভাষী ছিল মাত্র ৪ শতাংশ। উর্দু পাকিস্তানের বিশেষ কোনো অঞ্চলের ভাষা ছিল না। পাকিস্তানের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষাগুলো মধ্যে বাংলা ভাষাই ছিল সর্বাপেক্ষা উন্নত। এ সব ছিল বাংলাভাষার পক্ষে বড় যুক্তি। স্বভাবতই পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ আশা করেছিল, এ অঞ্চলের উন্নয়নে সচেষ্ট হবে পাকিস্তানি শাসকরা। কিন্তু সেটা হয়নি। পাকিস্তানের রাজধানী হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত সবই পশ্চিমাঞ্চল ঘিরেই বেড়ে উঠল। শিল্পায়ন, আমদানি, বিদেশি সাহায্য কেন্দ্রীভূত হলো পশ্চিমে। পূর্ব বাংলা যে ধীরে ধীরে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশ হয়ে উঠছে, সেটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। ফলে স্বাধিকারের প্রশ্নে এই অঞ্চলের জনগণকে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়।

 

১৯৪৮ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে যখন উর্দু ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রথমেই প্রতিবাদ মুখর হয় বাঙালি বুদ্ধিজীবী সমাজ। তারা এই অন্যায় বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। সারা দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে উঠে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীতে ভাষার জন্য প্রথম শহীদ হলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। রক্তের বিনিময়ে পূর্ববাংলা অর্জন করে ভাষার অধিকার । তথাপি পূর্বাঞ্চলের প্রতি পাকিস্তানি শাসকদের নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি। ফলে পূর্ববাংলায় আন্দোলন বিস্তৃতি লাভ করে। এরই পথ ধরে দানা বাঁধে ছয় দফা ও এগার দফার আন্দোলন। পরিণতিতে সংঘটিত হয় ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান। পাকিস্তানি শাসনযন্ত্রের হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানিদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট