চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩

২৩ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১১:১১ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

অবকাঠামোর কাজ শুরু হতে লাগবে আরো ৬ মাস

সরকারের মেগা প্রজেক্ট মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ড্রইং-ডিজাইনের কাজ শেষ। বর্তমানে চলছে টেন্ডার প্রক্রিয়ার কাজ। মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের মূল অবকাঠামো নির্মাণে কাজটি তিনটি প্যাকেজে ভাগ করে টেন্ডার ডাকা হয়েছিল গতবছরের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে। যার প্রথম প্যাকেজে সিভিল কনস্ট্রাকশন (জেটি নির্মাণ ও ড্রেজিং), দ্বিতীয় প্যাকেজে কার্গো হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট ক্রয় (বিভিন্ন ধরণের ক্রেন) ও তৃতীয় প্যাকেজে বিভিন্ন ধরণে বোট ক্রয় করা হবে।

 

 

এরমধ্যে বোট ক্রয়ের টেন্ডারে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি। তাই পুনঃটেন্ডারে যাবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। কার্গো হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়ের টেন্ডারে দরপত্র জমা পড়ে মাত্র একটি। বর্তমানে সিভিল কনস্ট্রাকশন কাজ ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট ক্রয়ের টেন্ডারের মূল্যায়ন চলছে। অর্থাৎ পুনঃটেন্ডারে যাওয়া ও জমা পড়া টেন্ডারের মূল্যায়ন শেষ করে অবকাঠামোর কাজে যেতে আরো অন্তত ৬ মাসে সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মীর জাহিদ হাসান।

 

 

গতকাল রবিবার দুপুরে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সদস্যরা নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরের চলমান কাজ পরিদর্শনে এলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক এ তথ্য জানান।

 

 

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, মাতারবাড়ি পোর্ট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট শুরু হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে যা ওই বছরের ১০ মার্চ একনেকে পাস হয়। একই বছর সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ জাপানের নিপ্পন কোই জেভি এর সাথে ২৩৪ কোটি টাকার চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি গভীর সমুদ্রবন্দরের ডিজাইন ও টেন্ডারে সহায়তা করবে যার সময়কাল ছিল ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের (২০২২) ডিসেম্বর পর্যন্ত। আর এই জানুয়ারিতে প্রজেক্টের কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। তবে এখনো তার টেন্ডারের মূল্যায়ন চলছে।

 

 

জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য মোট ১ হাজার ৩১ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে যার অর্থ কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

 

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর দুই ধাপে নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে প্রথম স্তরের কাজ সম্পন্ন হবে দুটি সেকশনে। এরমধ্যে প্রথম ধাপের কাজে ৩০০ মিটার লম্বা মাল্টি পারপাস বার্থিং জেটি নির্মাণ, ৪৬০ মিটার কনটেইনার জেটি নির্মাণ, ৩৫০ মিটার প্রশস্ত, ১৬ মিটার গভীরতা ও ১৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার দৈর্ঘের চ্যানেল নির্মাণ। নির্মাণ করা হবে ২ দশমিক ১৫ কিলোমিটার নর্থ ব্রেক ওয়াটার ও ৬৭০ মিটার সাউথ ব্রেক ওয়াটার।

 

 

এছাড়া ৩টি টাগ বোট, ১টি পাইলট বোট ও একটি সার্ভে বোট ক্রয় করা হবে। অন্যদিকে ইক্যুইপমেন্টের মধ্যে ২টি কি গেন্ট্রি ক্রেন, ১টি মাল্টি পারপাস গেন্ট্রি ক্রেন, ৬টি রাবার টায়ার গেন্ট্রি ক্রেন, ২টি রিচ স্টেকার ও ১২টি ইয়ার্ড চেসিস ক্রয় করা হবে।

 

 

এদিকে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে সড়ক সংযোগের কাজটি করা হচ্ছে আলাদা একটি অংশে। প্রথম পর্যায়ে ২ লেনের ২৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হবে এবং ৪ লেনের ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের সাথে যুক্ত করা হবে। এর মধ্যে থাকবে ১৪টি ব্রিজ।

 

 

এ কাজটিও তিনটি প্যাকেজে করা হচ্ছে বলে জানান সড়ক অংশের প্রকল্প পরিচালক মো. জাকির হোসেন। গত বছরের ৭ জুলাই সড়কের কাজের টেন্ডার ডাকা হয় ও ১৫ নভেম্বর টেন্ডার খোলা হয়। এই কাজের টেন্ডারও বর্তমানে মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে। এবছরের আগস্ট থেকে কাজ শুরু করা বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। এ কাজে সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ১৯০ হেক্টর জায়গা অধিগ্রহণ করতে হবে।

 

 

তবে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে কর্ণফুলী টানেলের রোড কানেক্টিভিটি রাখার দাবি এসেছে। কারণ মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের রোড কানেক্টিভিটির সাথে কর্ণফুলী টানেলের পর আউটার রিং রোড হয়ে মাতারবাড়ির সাথে যুক্ত করলে অন্তত ৩৫ কিলোমিটার রাস্তা কমে যায়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই কমে আসবে।

 

 

গতকাল রবিবার দুপুরে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সদস্যরা নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্রবন্দরের চলমান কাজ পরিদর্শনে এসে কাজের অগ্রগতি জেনে দাবি করছেন প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ হবে এবং কাক্সিক্ষত সময়েই গভীর সমুদ্রবন্দর চালু করা হবে।

 

 

সংসদীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন রনজিত কুমার রায়, এম আব্দুল লতিফ, ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, মো. আছলাম হোসেন সওদাগর ও এস এম শাহজাদা। এছাড়া বন্দরের বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এসময় উপস্থিত ছিলেন।

 

 

আর্থিক সংকটে বন্ধ হবে না গভীর সমুদ্র বন্দরের কোন কাজ

 

 

 

 

মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম
সভাপতি, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়
সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

 

 

দেশে চলমান ডলার সংকট কিংবা বৈশ্বিক মন্দার কারণে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের কোন কাজে ব্যঘাত ঘটবে না উল্লেখ করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেছেন, নানা কারণে বিশ্বে যে আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাব বাংলাদেশের উপরেও পড়েছে। তবে এ কারণে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের কাজ বাধাগ্রস্ত হবে না। এটি একটি জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মেগা প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের ডোনার পার্টনার হিসেবে রয়েছে জাপানের জাইকা। করোনার মহামারীর মধ্যেও একদিনের জন্যও এই প্রজেক্টের কাজ বন্ধ থাকেনি। তাই এই প্রজেক্টে কোন আর্থিক সংকট সৃষ্টি হবে না। প্রজেক্টের কাজ যেভাবে চলমান রয়েছে সেভাবেই চলবে।

 

 

গতকাল দুপুরে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্যরা নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্র বন্দরের চলমান কাজ পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

 

 

এছাড়া কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘেঁষে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সমুদ্র বন্দর স্থাপনে পরিবেশের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে জানতে চাইলে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, মূলত কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরেই এখানে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি করা হচ্ছে। যার সমীক্ষা চালিয়েছে স্বয়ং জাপান। তাদের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা সব চিন্তা করেই এখানে গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন এবং তারাই এই কাজের ফান্ডিং পার্টনার হয়ে কাজ তদারকি করছেন। তাই বলা যায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জন্য বন্দরের কোন সমস্যা হবে না।

 

 

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরকে রিজিওনাল হাব হিসেবে ব্রান্ডিং করা হচ্ছে

 

 

 

রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান
চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ

 

 

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর রিজিওনাল হাব হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে ব্রান্ডিং করা হচ্ছে উল্লেখ করে বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম শাহজাহান বলেন, এই বন্দরের ব্রান্ডিংয়ের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আমরা শিপিং কোম্পানিগুলোকে আমাদের বন্দরের ব্যাপারে জানাচ্ছি। পাশাপাশি তার বাস্তবায়নও দেখাচ্ছি।

 

 

গতকাল দুপুরে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সদস্যরা নির্মাণাধীন গভীর সমুদ্র বন্দরের চলমান কাজ পরিদর্শনে এলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বন্দর চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।

 

 

তিনি বলেন, সম্প্রতি আমরা ১০ মিটার গভীরতার ও ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়িয়েছি। আমরা ভারতের সঙ্গে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য আনা নেওয়া করেছি এবং তাদের সাথে আমাদের কয়েকটি চুক্তিও হয়ে গেছে। এছাড়া ইতিমধ্যে ইউরোপের কয়েকটি বন্দরের সাথে আমরা সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু করেছি। যার মাধ্যমে বিশ্বের বন্দরগুলো ও জাহাজ মালিকেরা আমাদের কাজ সম্পর্কে জেনে গেছে।

 

 

এখনো আমাদের সাথে পর্তুগাল, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডের বিভিন্ন বন্দরের সাথে সরাসারি জাহাজ চালুর অপেক্ষায় আছি। তাই মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের ব্রান্ডিংও হয়ে যাচ্ছে। এই বন্দর চালু হলে সিঙ্গাপুর পোর্ট, শ্রীলংকার কলম্বো পোর্ট, মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং ও তানজুম পেলিপাস বন্দরের মত আমরা একটি ট্রান্সশিপমেন্ট হাব হিসেবে কাজ করবো। এছাড়া এই বন্দরকে ঘিরে ফিডার জাহাজের একটি অপার সম্ভাবনা খুলে যাবে।

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট