চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩

২৩ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

এনআইডি তদন্তের জট খোলেনি ৪০ মাসেও!

মামলা দায়েরের ৪০ মাস পার হলেও এখনো ধীরগতিতে এগুচ্ছে রোহিঙ্গা এনআইডি জালিয়াতির তদন্তের কাজ। অবশ্য তদন্ত সংস্থা বলছে- ১৫টি তথ্য চেয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে চাওয়া চিঠির উত্তর পেলে তদন্তের জট খুলতে সহায়ক হবে।

 

 

জানা যায়, রোহিঙ্গা এনআইডি জালিয়াতির মামলার তদন্তের জট খুলতে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে ১৫টি তথ্য চেয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু চিঠির উত্তর না মেলায় তদন্তের কাজে ধীর গতি হচ্ছে বলে দাবি সংস্থাটির।

 

 

এদিকে, রোহিঙ্গা এনআইডি জালিয়াতি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া জয়নাল ও মোস্তফা ফারুকের ল্যাপটপ এবং ব্যবহৃত মুঠোফোন থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম। এসব তথ্য যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

 

 

জানা যায়, চুক্তিভিত্তিক ডেটা অপারেট মোস্তফা ফারুকের দুটি ল্যাপটপ আর পেনড্রাইভে পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ৪০ উপজেলা নির্বাচন অফিসের ল্যাপটপের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়ারের গোপন কোড নম্বর। যেসব কোড নম্বর দিয়ে নির্বাচন কমিশন অফিসের বিভিআরএস (বাংলাদেশ ভোটার রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম) সফটওয়ারের মাধ্যমে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কিংবা নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিসহ সব ধরনের কাজ অনায়াসে করা যায়।

 

 

এছাড়া পাওয়া গেছে প্রায় ২০ হাজার ডেট ফাইল (ডেটাবেইজ ফাইল)। চুক্তি ভিত্তিক কর্মী মোস্তাফার কাছে এসব গোপন কোড নম্বর কীভাবে এল তা খতিয়ে দেখছে তদন্ত সংস্থা নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।

 

 

অন্যদিকে, গ্রেপ্তার জয়নালের ল্যাপটপ আর মুঠোফোনে পাওয়া গেছে দুই হাজারের বেশি ডেট ফাইল। সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য মিললেও নির্বাচন কমিশন অফিসের সুনির্দিষ্ট সফটওয়্যার ছাড়া এসব ফাইল খোলা সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় ২০১৯ সালে দায়ের হওয়া রোহিঙ্গা এনআইডি জালিয়াতি মামলার তদন্ত এগুচ্ছে ধীরগতিতে।

 

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পরিদর্শক সঞ্জয় সিনহা জানান, আমরা বেশ কিছু তথ্য চেয়ে নির্বাচন কমিশনের চিঠি দিয়েছে। তথ্যগুলো পেলে এনআইডি জালিয়াতি মামলার জট খুলতে সহায়ক হবে। সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদনে যেসব ডেট ফাইলের তথ্য পাওয়া গেছে তা নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট সফটওয়ার ছাড়া খোলা সম্ভব নয়। ডেট ফাইলগুলো ইতিমধ্যে নির্বাচন অফিসে পাঠানো হয়েছে।

 

 

১৫ তথ্যে খুলবে জট : রোহিঙ্গা এনআইড জালিয়াতির ঘটনার জট খুলতে নির্বাচন কমিশনের কাছে চাওয়া ১৫টি হচ্ছে – নির্বাচন কমিশনের নেটওয়ার্ক সিস্টেমে এবং বাংলাদেশের কোন নাগরিককে ভোটার হতে হলে তার প্রক্রিয়ার ধাপ অনুসারে বিস্তারিত বর্ণনা। গ্রেপ্তার জয়নালের মেইল আইডির পাসওয়ার্ড। যেটি নির্বাচন কমিশনের এক্সপার্ট আইডিএ প্রকল্প নির্বাচন কমিশন নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলন। সুনির্দিষ্ট পাঁচটি ল্যাপটপ ব্যবহারীর বিস্তারিত তথ্য। জয়নালের কাছ থেকে জব্দকৃত ল্যাপটপ ও মুঠোফোন থেকে সংগৃহীত ডেট ফাইলের প্রতিবেদন। জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক খোরশেদ আলমের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন।

 

 

জয়নালের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত ল্যাপটপ সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে ল্যাপটপটির হার্ডডিস্কে বায়ো এনরোলমেন্ট সফটওয়্যার ইনস্টল করা আছে। ল্যাপটপের ডি ড্রাইভে বিভিআরএস নামে একটি ফোল্ডারে ১৯৪৬টি ডেট ফাইল রয়েছে। তার কাছ থেকে জব্দকৃত মুঠোফোনে ৯০টি টিএন আইডি কার্ডের রঙিন পিডিএফ ফাইল ও একই ফোনে ৩১০টি ডেট ফাইল পাওয়া গেছে। এসব ফাইল খোলার সফটওয়্যার রয়েছে একমাত্র নির্বাচন কমিশনের কাছে।

 

 

ভোটার নম্বর এর বিপরীতে ফরম-২, জাতীয় পরিচয় পত্র পেয়ে থাকলে তার তথ্য, সার্ভারে সংযুক্ত থাকা ল্যাপটপের আইডি, কবে, কখন, কোথায়, কীভাবে এসব ভোটারদের তথ্য সার্ভারে আপলোড করা হয়েছে, তার গেইটওয়ে, যে মডেমের মাধ্যমে অথবা ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে তার আইএমইএ নম্বর, ম্যাক আইডি এবং সংশ্লিষ্ট ফরমের কপি।

 

 

নিবন্ধন ফরম-২ এর সিরিয়াল নম্বর ৪১৮৬৬৩০১ থেকে ৪১৮৬৬৪০০ পর্যন্ত ভোটার নম্বরগুলো নির্বাচন কমিশনারের সার্ভারে আপলোড হয়েছে। কোন উপজেলা থেকে কবে,কখন, কোন ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটারগুলো আপলোড করা হয়েছে তার বিস্তারিত তথ্য।

 

 

২০০৮ সালে থেকে নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের এনআইডি সংক্রান্ত সেন্টার সার্ভারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম ও বিস্তারিত বিবরণ। হালনাগাদ আইডি কার্ড প্রণয়ন কিংবা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তিরকরণে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কার কী দায়িত্ব তার তথ্য। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক ইকবাল হোসেন ২০১৯ সালে এ সংক্রান্ত যে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তার কপি। জব্দকৃত ল্যাপটপটি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের নিবন্ধিত কিনা তার তথ্য।

 

 

জব্দকৃত ল্যাপটপের মাধ্যমে কখন, কোন কোন উপজেলা নির্বাচন অফিসের সার্ভার ব্যবহার করে অবৈধভাবে কতজন রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় পত্র পেয়েছে তার তথ্য। রোহিঙ্গাদের ডাটা আপলোড করাকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন অফিসের সার্ভারে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের তথ্য। ল্যাপটপটি কাস্টমাইজেশন করে আইডি পরিবর্তন করা হয়েছিল কিনা। যদি করা হয়ে থাকে পরিবর্তিত ল্যাপটপ আইডি ব্যবহার করে কখন, কোথা থেকে মূল এনআইডি সার্ভারে অবৈধভাবে কতজন রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন তার তথ্য। একই ল্যাপটপ থেকে রোহিঙ্গাদের ডাটা আপলোড করাকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন অফিসের সার্ভারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তথ্য। এ ল্যাপটপের মাধ্যমে ভোটার হওয়া রোহিঙ্গাদের ভোটার নিবন্ধন ফরম-২ এর সত্যায়িত ফটোকপি।

 

 

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা ভোটার তালিকাভুক্ত করার অভিযোগে ২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর নগরীর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন ডবলমুরিং থানা নির্বাচন অফিসার পল্লবী চাকমা। মামলাটি তদন্ত করছে নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অফিস সহায়ক জয়নাল ও ডাটা অপারেটর মোস্তফা ফারুকসহ এ পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট