চট্টগ্রাম রবিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২০ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ

সারোয়ার আহমদ

হুমকি ও লাখ টাকায় ‘চিঠি বাণিজ্য’র নেপথ্যে তেল পাচারকারী সিন্ডিকেট!

গত মঙ্গলবার (১৭ জানুয়ারি) আগ্রাবাদের একজন শিপিং এজেন্ট থেকে হুমকি দিয়ে ভেন্ডর চিঠি নিয়ে বিদেশি জাহাজে কাজ করার অনাপত্তি পত্র আদায়ের চেষ্টার ঘটনা ঘটে। যা শেষ পর্যন্ত থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। হুমকি- ধামকি ছাড়া বিপুল অংকের টাকার বিনিময়েও এই ভেন্ডর চিঠির লেনদেন হয় শিপিং বাণিজ্যে। এসব ঘটনা ঘটছে অহরহ। সমঝোতার মাধ্যমে এসব কাজ আড়ালে ঘটে বলেই ভেন্ডর ইস্যুটি সবসময় প্রকাশ্যে আসে না।

 

 

শুধু একটি জাহাজে কাজ করার অনুমতি নিতেই ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা ব্যয় করা কিংবা পেশী শক্তি দেখিয়ে যে চিঠি আদায়ের চেষ্টার নেপথ্যে কি এমন ব্যবসা রয়েছে, একটু গভীরে গেলেই বেরিয়ে আসবে সেই থলের বিড়াল।

 

 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও বৈধ এই ভেন্ডর কাজের পেছনে রয়েছে একটি বড় অসাধু চক্র। যারা মূলত বিপুল অর্থ ব্যয় করে ভেন্ডর চিঠি নিয়ে যায় বিদেশি জাহাজ থেকে অবৈধভাবে তেল আনতে। এই তেল চোরাকারবারির পেছনে রয়েছে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা ও মালয়েশিয়ার বন্দরের আরো কিছু চক্র। আন্তর্জাতিক ও দেশি চক্রের যোগসাজসে চলে বিদেশি জাহাজকে ভর করে রমরমা তেল পাচারের বাণিজ্য।

 

 

মূলত, বিদেশ থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিভিন্ন জাহাজে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা দেয় চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের নিবন্ধিত কিছু মেরিন কনট্রাক্টর বা ভেন্ডরগণ। তারা ওইসব জাহাজে খাবার, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, রঙ, খুচরা যন্ত্রাংশসহ সকল ধরণের দরকারি পণ্য সরবরাহ করে। এছাড়া জাহাজের বর্জ অপসারণের কাজও তারা করে।

 

 

তবে একাজ করতে শিপিং এজেন্ট থেকে ‘ভেন্ডর অনাপত্তি পত্র’ নিতে হয়। এই অনাপত্তিপত্র নিতে মাঝে মধ্যে ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে শিপিং এজেন্টর কর্মকর্তরা। যা অনেক সময় শিপিং এজেন্টর মালিকপক্ষ জানেনই না। তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সেই ‘ভেন্ডর অনাপত্তি পত্র’ দিতে উচ্চ হারে টাকা আদায় করে। আবার কখনো কখনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পেশী শক্তি ও হুমকি-ধামকি দিয়ে সেই অনাপত্তিপত্র আদায় করে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে যে কোন উপায়ে হোক বিদেশি জাহাজ উঠতে পারার অনুমতি পাওয়া।

 

 

তেল পাচার হয় যেভাবে : সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার ও মালয়েশিয়ার ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরগুলো হয়ে প্রতিনিয়ত প্রচুর জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। এর মধ্যে বিশাল আকারের কার্গো জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙ্গরেই পণ্য খালাস করে। তাদের চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে প্রবেশ করতে হয় না। বিদেশি ওইসব বন্দরের একটি চক্র বাংলাদেশের চক্রের সাথে যোগসাজসে জাহাজে জ্বালানী তেল লাগবে বলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণে তেল লোড করে দেয়। যেখানে জাহাজের ক্যাপ্টেনকেও হাতে রাখা হয়।

 

 

ওই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙ্গরে আসলে লোকাল শিপিং এজেন্ট থেকে ভেন্ডরের নাম করে জাহাজে উঠতে চায় দেশি চক্রের সদস্যরা। যে কোন উপায়ে হোক সেই জাহাজের আসা অতিরিক্ত তেল নিয়ে আসার জন্যই তারা শিপিং এজেন্টগুলো থেকে উচ্চ মূলে ভেন্ডর অনাপত্তিপত্র নেয়। টাকায় কাজ না হলে পেশি শক্তি দেখিয়ে হুমকি-ধামকিও দেওয়া হয়।

 

 

ওই চক্র সেই অনাপত্তি পত্র নিয়ে বন্দর কাস্টমসের চোখে ধুলো দিয়ে ছোট জাহাজ নিয়ে যায় বড় জাহাজ থেকে তেল আনতে। বিদেশি ওইসব জাহাজ দৈর্ঘ, প্রস্থ ও উচ্চতায় এতোটাই বড় যে মাত্র এক ইঞ্চি পরিমান বেশি তেল বহন করলেও তাতে হাজার হাজার টন তেল পাওয়া যায়। বিশেষ করে তেলবাহি জাহাজগুলোতে। সেই তেল এনে লোকাল বাজারে বিক্রি করে চোরা কারবারিরা। এর মাধ্যমে সরকার হারায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।

 

 

কারা জড়িত তেল পাচার চক্রের সাথে : নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় রয়েছে অধিকাংশ বিদেশি শিপিং এজেন্টের অফিসগুলো। তাই তেল পাচার চক্রের সদস্যদের অনেকেই রয়েছে আগ্রাবাদ-কেন্দ্রিক। আবার এই এলাকার অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও জড়িত এই চক্রের সাথে। এদের মধ্যে অনেকেরই আবার কোন বৈধ লাইসেন্স না থেকেও এই ভেন্ডর ব্যবসায় জরিত রয়েছে। তারা মূলত পেশী শক্তির মাধ্যমে বা বিপুল টাকা ব্যয় করে অনাপত্তি নিয়ে লাইসেন্সধারী অন্যকারোর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ করে।

 

 

এই আগ্রাবাদ এলাকা ছাড়াও পতেঙ্গা এলাকায় রয়েছে কয়েকটি চক্র। বিভিন্ন তেল কোম্পানিগুলোর ডিপো পতেঙ্গা এলাকায় হওয়ায় ও তেল খালাসের ডলফিন জেটি পতেঙ্গা এলাকায় হওয়ায় এই এলাকার অনেকেই তেল চোরাকারবারির সাথে জড়িত। এ ছাড়াও আছে আকমল আলী রোড ও চান বালি ঘাটেও এমন কয়েকটি চক্র রয়েছে।

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট