চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

১২ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

মৃত জুটমিল পুনর্জীবিত হওয়ার আশা শ্রমিকদের

আমিন জুট মিল বন্ধ হওয়ার আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বকেয়া পাননি অন্তত ৫৬৪ জন শ্রমিক। কর্মকর্তারা জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র না থাকায় এসব পাওনা পরিশোধ করা যায়নি। যদিও বাকি তিন সহস্রাধিক শ্রমিকের পাওনা ইতিমধ্যেই পরিশোধ করা হয়েছে।

 

এদিকে, চার মাস আগে সারাদেশের ২৬টি পাটকলের শ্রমিক নেতাদের ডেকে নিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান। শ্রমিকদের কাছ থেকে পাটকলগুলো পুনরায় চালু করার বিষয়ে মতামত চেয়েছেন মন্ত্রী। রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিলগুলোর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত ও রপ্তানিতে যুগোপযোগী উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। বেসরকারি মিলগুলোর মতো তখন রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোও লাভের ধারায় ফিরবে বলে মন্ত্রীকে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।

 

আমিন জুট মিল শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আরিফুর রহমান বলেন, ‘সীমিত আকারে মিলগুলো চালু করার পরামর্শ দিয়েছিলাম আমরা। বেসরকারি উদ্যোগে মিলগুলো চালু করা হলে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সরকারিভাবে চালু হলে সরকার ও শ্রমিক-উভয়ই লাভবান হবেন।’

 

গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাটকে কৃষিজাত পণ্য হিসেবে ঘোষণা দেন। কৃষিপণ্যের মতো ব্যাংকঋণ ও রপ্তানিতে সব ধরনের সুবিধা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।

 

এ বিষয়ে শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আরিফুর রহমান বললেন, ‘পাটকলের শ্রমিকেরা পুরোনো, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শ্রমিক। পাট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আমরা আশান্বিত হয়েছি। কিন্তু পাটকলগুলো চালুর করার উদ্যোগ নিলে সারাদেশের হাজার হাজার শ্রমিক উপকৃত হবে। জুট মিলগুলো আবারও চালু হবে সেই আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন শ্রমিকেরা।’ দেশের প্রাচীনতম পাটকল আমিন জুট মিলও নতুন উদ্যমে চালু হবে-তার অপেক্ষায় দিন গুনছেন শ্রমিকেরা।’

 

২০২০ সালের ১ জুলাই সরকার দেশের পাটকলগুলো বন্ধ ঘোষণা করে। গোল্ডেন হ্যান্ডসেকের মাধ্যমে শ্রমিকদের অবসর দেওয়া হয়। মিল বন্ধ হওয়ার পর থেকে অনেকেই অর্থাভাবে অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন বলে দাবি শ্রমিকদের। অনেক শ্রমিক এখন অভাব-অনটনে ভুগছেন। কেউ পেশা বদলে রিকশা-ভ্যান চালাচ্ছেন। কেউ ফুটপাতে ব্যবসা করছেন। তবে বেশিরভাগই বেকার হয়ে পড়েছেন। মিলের আশপাশে এসে খোঁজখবর নেন।

 

আমিন জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) এএইচএম কামরুল ইসলাম গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘মিল চালুর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। তাতেও কাঙ্ক্ষিত দরদাতা মিলছে না।’

 

শ্রমিক নেতা আরিফুর রহমান বলেন, ‘চাকরিহারা শ্রমিকদের অনেকেই অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। অভাবের তাড়নায় কেউ রিকশা-ভ্যান চালাচ্ছেন। কেউবা দিনমজুর-শ্রমিকের কাজ করছেন। দক্ষ শ্রমিক হারিয়ে গেলে পাটকলের জন্য শ্রমিক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে। একই সঙ্গে দেশের সোনালি ঐতিহ্য পাটশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

১৯৫৪ সালে আমিন জুট মিল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পাকিস্তানের নাগরিক ‘আমিন সাহেব’ মিলটি প্রতিষ্ঠা করেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে এটিকে জাতীয়করণ করা হয়। স্বাধীনতার পরও প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। ‘৯০ দশকেও স্থায়ী আর অস্থায়ী মিলে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ছিল। মিল বন্ধ হওয়ার আগপর্যন্তও চার হাজার ১২৩ জন শ্রমিক ছিল। মিল বন্ধ হওয়ার পর থেকে পর্যায়ক্রমে শ্রমিকদের বকেয়া ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করা হয়। তবে ৫৬৪ জন শ্রমিক এখনো পাওনা টাকা পাননি বলে জানান শ্রমিক নেতা আরিফুর রহমান।

 

জিএম এএইচএম কামরুল ইসলাম বলেন, ‘জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও অন্যান্য কাগজপত্রের জটিলতার কারণে বকেয়া পাওনা টাকা পেতে দেরি হচ্ছে। তাদের বেশিরভাগই অস্থায়ী শ্রমিক। কাগজপত্র জমা দেয়া সাপেক্ষে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হবে, বলেন জিএম কামরুল ইসলাম।’

 

পাকিস্তান আমলের এ মিলের বেশিরভাগই মেশিনই পুরোনো। প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তারপরও জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় অনেক যন্ত্রাংশে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ৫টি মিলে রাত-দিন পালাক্রমে কাজ করতেন শ্রমিকেরা। কার্পেট, সুতা ও বস্তা তৈরির মিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সর্বশেষ চট আর বস্তা তৈরির মিলগুলো চালু ছিল।

 

শ্রমিকরা দাবি করেন, জুট মিলের কাঁচামাল পাট কেনায় জোচ্ছুরি, পাটের মৌসুমে পাট না কেনা, অতিরিক্ত দামে পাট কেনা, পাট ভিজিয়ে রাখাসহ নানা কারচুপি এবং পুরোনো মেশিন সংস্কার না করায় ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট