চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

১২ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১০:৫৩ পূর্বাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

বাবার পথে অপরাধ জগতে ছেলেও

খুন-চাঁদাবাজি-বিচার-সালিশসহ নানা অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে কারাভোগ করছেন জঙ্গল সলিমপুরের অঘোষিত রাজা মশিউর রহমান। র‌্যাব-৭ এক বছর আগে গ্রেপ্তার করেছে তাকে। বাবার দেখাদেখি ছেলে মহিবুল হাসান শিবুলও পা বাড়িয়েছে অপরাধ জগতে। বাবা কারাগারে যাবার পর এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।

 

গত সোমবার (৯ জানুয়ারি) বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরের এন নম্বর সমাজ এলাকা থেকে শিবলুকে গ্রেপ্তার করে বায়েজিদ থানা পুলিশ। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালিয়ে মশিউরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৭। তিনি বর্তমানেও কারাবন্দী। মশিউরের কথার বাইরে যাবার সুযোগ ছিল না জঙ্গল সলিমপুরের বাসিন্দাদের। তিনি সেখানে স্বঘোষিত রাজা। বিচার-সালিশ, অবৈধ বিদ্যুৎ, সরকারি জমি দখল-বেদখল, চাঁদবাজি, খুন, ইট-বালি, সমিতি ও শাখা সমিতির নামে চাঁদাবাজি হেন কাজ নেই তার ইশারায় হয় না। তার ভয়ে তটস্থ থাকে জঙ্গল সলিমপুরে বসবাসরত লাখের বেশি নারী পুরুষ। বায়েজিদ বাইপাস সড়ক হবার পর তার ভাগ্যে আসে আমূল পরিবর্তন। দ্বিগুন উৎসাহে মেতে উঠে দখল বাণিজ্যে।

 

সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের ছত্রছায়ায় থেকে বছরের পর বছর ধরে তিনি এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। হত্যা, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে অভিযুক্ত চাঞ্চল্যকর ছোটন হত্যাসহ ২৭ মামলার আসামি কাজী মশিউর রহমান। তার রয়েছে নিজস্ব বাহিনী। মশিউরের অনুসারী প্রত্যেকে একাধিক মামলার আসামি। যেমন- আল আমিন সাগর ৪টি, কাউছার ৪টি, ওসমান ২টি, মিজানের ৩টি, সিরাজের ৩টি, মশিউরের ছেলে শিবলুর একটি, সায়েমের ৪টি, আরিফের ৪টি, জসিমের ২টি ও সেলিমের ৩টি মামলা রয়েছে সীতাকুণ্ড থানায়। মীর আরমান, মিজান, কাউছার ও ছেলে শিবলু তার প্রধান বিশ্বস্ত সহচর। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালিয়ে মশিউরকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৭।

 

সেই সময় র‌্যাব-৭ এর উপ-অধিনায়ক মেজর মোস্তফা জামান জানিয়েছিলেন, পাহাড়ের ওই বসতিতে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখেন মশিউর। পাশাপাশি চাঁদাবাজি, জায়গা দখলসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজেও যুক্ত তিনি। এর আগে ২০১৭ সালে তাকে একবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

 

বায়েজিদ থানার পরিদর্শক (ওসি) ফেরদৌস জাহান জানান, বাবা কারাগারে যাবার পর এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন ছেলে শিবলু। তিনিও বাবার দেখাদেখি নানা অপরাধে জড়ায়। দখল-বেদখল চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে শিবুলর বিরুদ্ধে বায়েজিদ ও সীতাকুণ্ড থানায় সাতটি মামলা রয়েছে। সর্বশেষ সেলিম উদ্দিন সবুজ নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত ও মারধর করে। বাবার দেখাদেখি ছেলেও পা রাখে অপরাধ জগতে। শিবলুকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে পাঠানো হলে বিজ্ঞ আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণের আদেশ দেয়।

 

মাটিতে পুঁতে ফেলা হয় লাশ : ২০১৬ সালে বাসা থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শাহাদাত হোসেন ছোটন নামে এক যুবককে। হত্যার পর লাশ মাটিতে পুঁতে রাখেন। ঘটনার ১৪ মাসের মাথায় ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড়ে মাটি চাপা দিয়ে রাখা ছোটনের কঙ্কাল উদ্ধার করে সিআইডি।

 

১০ জুলাই (২০১৬) রাত বারোটার সময় সলিমপুর ওভারব্রিজ এলাকার আমানত উল্লার ভাড়া বাসা ঘিরে ফেলে মশিউরের অনুগত কামাল, রানা, সালাউদ্দিন, কালু, রফিক, গিট্টু জাহাঙ্গীর, মামুন, কাওসার, আল আমিন, সোহেল, ওসমান ও বার্মা সায়েম। ওই বাসাতেই ছিল ছোটন। বাসা ঘিরে ফেলার বিষয়টি বুঝতে পেরে ঘর থেকে বের হয়ে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলে ছোটনকে তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করে মাটিতে ফেলে দেয়। পরে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে আধামরা করে একটি ভ্যান গাড়িতে তুলে জঙ্গল সলিমপুর ছিন্নমূলের ভেতরে স্কুল মাঠে নিয়ে দলনেতা মশিউরের কাছে হাজির করে।

 

ছোটন মারা যাবার পর মশিউর ও আরমান বলেন, যেভাবে হোক ছোটনের মৃতদেহ লুকিয়ে ফেলতে হবে। মশিউরের নির্দেশে রানা, কালু, রফিক, মামুন, কামাল, সালাউদ্দিন মিলে ছোটনের মৃতদেহ জঙ্গল সলিমপুর সিঙ্গাপুর নাসিরের মালিকানাধীন ক্যারাডি পাহাড়ে নিয়ে মাটির নিচে গর্ত করে পুঁতে ফেলে।

 

বিষয়টি পুলিশ জেনে গেছে সন্দেহে দুদিন পর তারা রাতের বেলা মৃতদেহটি তুলে বস্তায় ভরে ছিন্নমূলের বহদ্দারহাট শাখার পাহাড়ের নিচে এনে রেখে দেয়। পরে ক্যারাডি পাহাড়ের পাদদেশে মাটির নিচে দ্বিতীয় দফায় পুঁতে রাখে। ঘটনার এক বছর পর ২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ক্যারাডি পাহাড়ের পশ্চিমে কালিছড়া এলাকা থেকে মাটির নিচে পুঁতে রাখা ছোটনের কংকাল উদ্ধার করে সিআইডি। পরবর্তীতে ছোটনের মা বাবার ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করে ছোটনের লাশ চিহ্নিত করে সিআইডি।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিদর্শক মোহাম্মদ শরীফ জানান, ছিন্নমূল নেতা মশিউরের পরিকল্পনায় এ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে। তদন্তে এ হত্যাকাণ্ডের মাস্টার মাইন্ড মশিউরসহ ১৫ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এরমধ্যে কালু নামে একজন বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে।

 

১০ সমাজে ১১৭ শাখা : জঙ্গল সলিমপুরে সরকারি জমিতে যত ব্যবসা-সরকারি খাস জমিতে বিভিন্ন এলাকা থেকে বাস করছে এক লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি পরিবার। পুরো সলিমপুরকে ভাগ করা হয়েছে দশটি সমাজে। এসব সমাজের শাখা রয়েছে ১১৭টি।

পূর্বকোণ/আরএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট