চট্টগ্রাম সোমবার, ০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

৮ জানুয়ারি, ২০২৩ | ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

‘মন চায় গাড়ির নিচে জীবন দেই’

কম টাকায় কিডনি ডায়ালাইসিস করতে চমেক হাসপাতালের স্যান্ডোর ডায়লাইসিস সেন্টারে আসেন বাদাম বিক্রেতা গৌরাঙ্গ দাশ। সেন্টারটিতে প্রতিমাসে (৮ বার) তার ডায়ালাইসিস খরচ হতো ৮ হাজার ৬৫০ টাকা। কিন্তু নতুন বছরে ফি বাড়ানোর কারণে গৌরাঙ্গ দাশকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।

 

গৌরাঙ্গ দাশ বলেন, ‘গ্রামেগঞ্জে চানাচুর-বাদাম বিক্রে করে কোনভাবে সংসার চালাতে হয়। তারমধ্যে প্রতি সপ্তাহে ডায়ালাইসিসের জন্য বাড়তি টাকার প্রয়োজন হয়। ফি বাড়ানোর কারণে সামনে ডায়ালাইসিস করাও সম্ভব হবে না। মন চায় গাড়ির নিচে নিজের জীবন দিয়ে দেই। আর ভালো লাগছে না।’

 

শুধু গৌরাঙ্গ দাশের ক্ষেত্রেই নয়, চমেক হাসপাতালে পিপিপি’র আওতায় চালু হওয়া স্যান্ডোর কিডনি ডায়ালাইসি সেন্টারের প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রেই নতুন বছরে ফি বাড়ানো হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। যাতে এক প্রকার দিশেহারা রোগীরা।

 

অন্যদিকে, কিডনি ডায়ালাইসিসের জন্য পূর্ব নির্ধারিত ফি বহাল রাখার দাবিতে হাসপাতালে বিক্ষোভ করেছেন রোগীরা। গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ করেন তারা। এসময় হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে গিয়েও জড়ো হন রোগী ও তাদের স্বজনরা। যদিও এক পর্যায়ে তাদের বুজিয়ে সেখান থেকে পাঠানো হয়। তবে ফিরে গিয়ে দ্বিতীয়বার স্যান্ডোরের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা।

 

রোগীরা জানান, প্রতিমাসে একজন রোগীকে ৮ বার কিডনি ডায়ালাইসিস করতে হয়। এরমধ্যে দুই বার ২৭৯৫ টাকা করে পরিশোধ করলেও বাকি ৬ বারই ৫১০ টাকা করে পরিশোধ করতে হতো একজন রোগীকে। কিন্তু নতুন বছরের শুরুতে এসে দু’বারের পরিবর্তে তা চারবার করা হয়। তাও আবার ফি বাড়িয়ে ২৯৩৫ টাকা করা হয়েছে। আর বাকি চারবার ৫৩৫ টাকা করা হয়েছে। এতে করে প্রতিরোগীর ডায়ালাইসিস ফি প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে।

 

নুরুল আলম নামে এক কিডনি রোগী বলেন, এমনিতেই ডায়ালাইসিস ফি জোগাড় করতে দিশেহারা হয়ে পড়ি। তারমধ্যে ফি বাড়ানো হয়েছে। এখন তো মারা যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই। মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসেই কম খরচে সেবা নিতে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালের চেয়েও এখন স্যান্ডোরে বেশি ফি দিতে হচ্ছে। এটি খুবই অস্বাভাবিক। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে বিবেচনা করার দাবি জানাই।’

 

ভ্যানগাড়ি চালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘খুব কষ্ট করেই জীবন চালাচ্ছি। এখন যদি ডায়ালাইসিস করতে না পারি, তাহলে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই নেই। শুধু আমি নই, অনেক রোগীর মৃত্যু হবে। তাই সরকারের প্রতি অনুরোধ করবো, আমাদের বাঁচাতে অন্তত ফি কমানোর সুযোগ করে দেয়া হোক।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের কিডনি রোগীদের জন্য ২০১৭ সালের ৫ মার্চ ৩১টি মেশিন নিয়ে চমেক হাসপাতালের নিচ তলায় কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টারটি চালু করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডোর এই সেন্টারে তাদের কার্যক্রম দশ বছর চালিয়ে যাবে। যার জন্য সরকারি জায়গা ব্যবহার করবে প্রতিষ্ঠানটি। এরজন্য কোন ভাড়া দিতে হবে না।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিটি কিডনি ডায়ালাইসিসের বিপরীতে প্রায় ৩ হাজার টাকা (বর্তমানে) দিতে হয় রোগীকে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমোদনে ফি কমিয়ে ৫৩৫ টাকা (বর্তমানে) দিতে পারেন একজন রোগী। কিন্তু অর্থ কমালেও স্যান্ডোরকে প্রতি মাসেই ৩ হাজার টাকা (বর্তমানে) হিসেবে করেই বিল পরিশোধ করতে হয় সরকারের। অর্থাৎ রোগীরা ডায়ালাইসিস ফি ছাড় পেলেও সম্পূর্ণ টাকাই ভর্তুকি দিতে হয় সরকারকে।

 

জানতে চাইলে স্যান্ডোরের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) নাজমুল আহসান বলেন, ‘চুক্তি অনুযায়ী ফি কমানোর একমাত্র ক্ষমতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। সেখানে আমাদের (স্যান্ডোর) কিছু করার থাকে না। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর বছর ফি বাবদ ৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়, যার কারণে নতুন বছরের শুরুতে এসে ফি কিছুটা বেড়েছে। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’

 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘কোভিডকালে মৌখিকভাবে কিছু ছাড় দেয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে বর্তমানে তা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষমতা রয়েছে সাড়ে ৬ হাজার জনের। কিন্তু এই সীমা অতিক্রম হওয়ায় এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। যদিও সরকারি নিয়মের বাইরে যাওয়ার আমাদের সুযোগ নেই, তবে এ সংক্রান্ত বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। আশা করছি এ বিষয়ে শীঘ্রই একটি সমাধান পাওয়া যাবে।’

 

পূর্বকোণ/আরএ

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট