চট্টগ্রাম বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৪ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সার্ভিস থেকে রেহাই চান গার্মেন্টস মালিকরা

নগরীর ষোলশহর ওয়ার্ডে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট (প্রা.) সার্ভিসকে’ ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকে বিরোধিতা করে এসেছিল ওই এলাকার বাসিন্দারা। এবার ওই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে রেহাই চেয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাগুলো। সার্ভিস চার্জের নামে অতিরিক্ত টাকা আদায়সহ নানা অনিয়মের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরাও।

 

জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট (প্রা.) সার্ভিসকে ষোলশহর ওয়ার্ডে ময়লা আর্বজনা সংগ্রহের দায়িত্ব দেয় সিটি কর্পোরেশন। ওয়ার্ডের আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প-কারখানা, দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টার, হাট-বাজার, মার্কেট-শপিংমলের ময়লা সংগ্রহের কাজ দেওয়া হয় এই প্রতিষ্ঠানকে।

 

অভিযোগ আছে, ময়লা সংগ্রহের বিনিময়ে ইচ্ছেমতো টাকা নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ফ্ল্যাটপ্রতি ১০০ টাকা, সেমিপাকা ঘরে ৫০ টাকা, দোকানে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা, শিল্প কারখানায় (আয়তন অনুসারে) ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, হোটেল-রেস্টুরেন্টে দেড় হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, কনভেনশন হলে খাবারের আয়োজনে প্রতি ১০০ জন অতিথির সৃষ্ট বর্জ্যে ২০০ টাকা, হাট-বাজার ও শপিং মলে ২ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা, পুরাতন ভবন সংস্কারে টন প্রতি ১ হাজার টাকা এবং ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে দৈনিক ২০ থেকে ৫০ টাকা আদায় করছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

শুধু তাই নয়, কঠিন বর্জ্য, শুকনো বর্জ্য ও ভেজা বর্জ্যরে জন্য আলাদা আলাদা তিনটি বিন নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিন প্রতি ১ হাজার করে ৩ হাজার টাকা দিতে হয় ওই প্রতিষ্ঠানটিকে। অথচ ২০১৬ সালে শুরু হওয়া ডোর টু ডোর ময়লা অপসারণ প্রকল্পে ঘর প্রতি একটি ছোট এবং বিল্ডিং প্রতি বড় বিন বিনামূল্যে দেওয়া হয়েছিল সিটি কর্পোরেশন থেকেই।

 

এ বিষয়ে চলতি ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস থেকে রেহাই চেয়ে মেয়র বরাবর চিঠি দিয়েছে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। সংগঠনটির প্রথম সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়- তৈরি পোশাক শিল্পে অন্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের মত কঠিন বর্জ্য হয় না, যতটুকু হয় তা পোশাক কারখানার নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা কর্মীর দ্বারা প্রতিদিন অপসারণ করা হয়।

 

এছাড়া তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্ছিষ্ট কাপড়ের টুকরোগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘ঝুট’ পণ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রেরণ করা হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে ৭ নম্বর ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন পোশাক শিল্প কারখানা পৌরকরের আওতায় পরিচ্ছন্নতা কর হিসেবে ৭% সহ মোটা অংকের টাকা পরিশোধ করে যাচ্ছে।

 

এরই মধ্যে চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠান বেসরকারিভাবে কঠিন বর্জ্য নিষ্কাশনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরীর সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাথে চুক্তিবন্ধ হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে চুক্তির আওতায় আসার জন্য বিভিন্ন অংকের ফি ধার্য করে তা প্রদানে অযৌক্তিকভাবে চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে।

 

বর্তমানে পোশাক শিল্পের ক্রান্তিকালে নতুন করে কোন আর্থিক ব্যয় সংযোজন করা কারখানাগুলোর পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস নামের প্রতিষ্ঠানের হয়রানি থেকে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্প কারখানাগুলো রেহাই পেতে চায়।

 

এদিকে, সিটি কর্পোরেশনের নাগরিকদের কাছ থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদাভাবে টাকা নেওয়া আইনবহির্ভ‚ত বলে অভিযোগ উঠেছে। কারণ পৌরকর নীতিমালা অনুযায়ী, নগরবাসী ১৭ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করে থাকে। যার মধ্যে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ ৭ শতাংশ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও ময়লা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাবদ ৭ শতাংশ এবং ৩ শতাংশ সড়কবাতির জন্য চার্জ আদায় করা হয়। কাজেই নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে ময়লা-আর্বজনা সংগ্রহের জন্য টাকা নেওয়া কতটুকু আইনসিদ্ধ তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

 

জানা যায়, পাইলট প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলক এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে পাইলট প্রকল্প হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটির সাথে সরাসরি ৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করে বসেছে চসিক। প্রশ্ন উঠেছে, কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ থাকা সত্ত্বেও কেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আবর্জনা সংগ্রহের দায়িত্ব দিতে হলো? কোন ধরনের টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়া একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সাথেই বা কেন আবর্জনা সংগ্রহের চুক্তি করলো সিটি কর্পোরেশন?

 

এ বিষয়ে ষোলশহর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান মোবারক আলী বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আইন ২০২১ অনুযায়ী প্রতিটি ভবনের সামনে তিন ধরনের তিনটি বিন থাকবে। কিন্তু অনেকই তিনটি বিন নিচ্ছেন না। কেউ একটি বা দুটি নিচ্ছেন। আর বিনগুলো যে চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস থেকেই নিতে হবে তা নয়। চাইলে কেউ একই রকম বিন নিজেই কিনে বসাতে পারবেন। আর যে সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ হয়েছে তা ঢাকার তুলনায় অনেক কম।

 

চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস এর সাথে চুক্তি প্রসঙ্গ তিনি বলেন, আমরা যখন এ কাজটি করার উদ্যোগ নিয়েছি তখন এ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামে ছিল না। তাই চট্টগ্রাম ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট সার্ভিস এর আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের কাজটি দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের সাথে চুক্তি শেষ হলে এবং এমন প্রতিষ্ঠান আরো পাওয়া গেলে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কাজ দেওয়া হবে।

 

উল্লেখ্য, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে জাইকার একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে দৈনিক ৩ হাজার টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৩০ টন গৃহস্থালি, ৫১০ টন সড়ক ও অবকাঠামোগত এবং ৬৬০ টন মেডিকেল বর্জ্য। উৎপাদিত বর্জ্যরে মধ্যে কর্পোরেশন সংগ্রহ করে দুই হাজার টন। বাকি বর্জ্য নালা-নর্দমা, খাল-বিল, নদী ও উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকে।

 

পূর্বকোণ/আর

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট