চট্টগ্রাম রবিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৫ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১২:১১ অপরাহ্ণ

মরিয়ম জাহান মুন্নী

কুসংস্কার প্রশ্রয় পায়নি, ৪ সন্তানই সুপ্রতিষ্ঠিত

একে একে তিন কন্যা সন্তানের মা হয়েও কখনো ভেঙ্গে পড়েননি। পরবর্তীতে এক পুত্র সন্তানের মা হন তিনি। তবে তিন কন্যাকেও মানুষ করেছেন পুত্র সন্তানের মত সমান গুরুত্ব দিয়ে। চার সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের গহনাসহ সর্বোচ্চ খুইয়েছেন। আবার জর্জরিত হয়ে পড়েন ঋণে। তবুও ছাড়েননি হাল। তার সেই কষ্ট সফল করেছেন তিন মেয়ে ও এক ছেলে। বর্তমানে চারজনই সরকারি চারটি চাকরিতে। দুই মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ছোট মেয়ে প্রশাসন ক্যাডারে সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত এবং একমাত্র ছেলে কমর্রত আছেন বাংলাদেশ আনসার ব্যাটালিয়নে। পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে লড়াই করা এ সফল জননীর নাম হামিদা বেগম।

 

তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। সমাজের নানারকম কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সন্তানদের জীবন সাজাতে জীবন সংগ্রামে নেমে পড়েন তিনি। অদম্য এই নারী আনুমানিক ৬০ বছর বয়সে এসে তার সেই কষ্টের পুরস্কারও পেয়েছেন। ২০২২ সালের মা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী থেকে সফল জননী ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়ে সেরা পাঁচ জয়িতার একজন হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন তার যোগ্য সম্মান।

 

বয়সের ভারে অসুস্থ হামিদা বেগম খুব উৎসাহ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, শৈশবে বাবা-মাকে হারাই। তবে পিতামাতা না থাকলেও তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন হওয়ায় সেই সময়ে আমি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করার সুযোগ পাই। যেহেতু তখন মেয়েদের বেশিদূর পড়াশোনা করার সুযোগ ছিল না তাই পঞ্চম শ্রেণি থেকেই শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়েছিল। যে পাড়ায় আমার বাড়ি (দুয়ারী পাড়া) সেখানেরই একজনের সাথে আমার বিয়ে হয়। এরপর একে একে তিন কন্যা এবং এক পুত্র সন্তানের মা হই।

 

যেহেতু আমার তিন কন্যা, চারপাশের মানুষজন সবসময় চাইতেন মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করিয়ে তাদের বিয়ে দিয়ে দেই। কারণ ১০-১৫ বছর আগেও সমাজে বাল্যবিবাহ ছিল ব্যাধির মত। তারা এমনও বলতেন, ‘মেয়েদের পড়াশুনা করিয়ে কী হবে? শ্বশুরবাড়ির আখের গোছাবে।’ আমি বলতাম, ‘আমার মেয়েরাই আমার ছেলে। আমি তাদের মানুষের মত মানুষ করতে চাই। তাদের শুধু আমার জন্য নয়, দেশের মানুষের কল্যাণে তৈরি করতে চাই। সেই ইচ্ছে থেকেই তাদের পড়াশোনা করাই।’

 

হামিদা বেগম আরো বলেন, ‘আমার স্বামী দেশের বাইরে থাকতেন। তিনি টানা ১২ বছর পর প্রবাস থেকে দেশে আসেন। এসময় আমি একাই আমার সন্তানদেরকে মানুষ করতে লড়াই করি। তাদের পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসি। এসময় গ্রামের মানুষ নানারকম কথা বলে আমাকে ভয়ও দেখাতো। আমার শখের গহনাগুলো পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয় সন্তানদের পড়াশোনার জন্য, যেগুলো আর ছাড়িয়ে আনা হয়নি। এ নিয়ে পরবর্তীতে সন্তানেরা মন খারাপ করতো। আমি তাদের বলতাম ‘তোরাই আমার মুকুট’। আবার অনেক টাকা ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ি। এমনই সংগ্রাম করে দিন অতিবাহিত করেছি। খেয়ে না খেয়ে সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছি। এ ব্যাপারে আমি কখনোই পিছু তাকাইনি। আল্লাহ আমাকে জীবনযুদ্ধে জয়ীও করেছেন। আমি পড়াশোনা করতে না পারলেও আমার তিন সন্তানই উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন।

 

যেই সমাজ নানারকম কথা বলেছে, এখন তারাই আমার সন্তানদের কারণে গর্ববোধ করে। তাই আমি বলবো কখনোই আশপাশের মানুষের কথায় কান না দিয়ে নিজের মনের কথা শুনতে। শুধু ছেলে কেন, মানুষের মত মানুষ করতে পারলে মেয়ে-সন্তানও বাবা-মায়ের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে। যদি শর্ত ইচ্ছে থাকে তবে সফলতা একদিন আসবেই।’

 

পূর্বকোণ/আর

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট