চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৪ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১২:৫৪ অপরাহ্ণ

মরিয়ম জাহান মুন্নী

উত্থান পতনেও পিছু হটেননি নারী উদ্যোক্তা রয়ন জন্নাত

জীবনের এমন একটা সময় কাটার পর ভেবেছিলেন জীবনে বুঝি আর কোনো আলো অবশিষ্ট নেই? জীবনে নানা উত্থান পতন এসেছিল। কিন্তু পিছু হটেননি। বাবাও ছিলেন দরিদ্র বর্গাচাষী। আবার বিয়ে হয় আরেক অভাবের সংসারে। অল্প বয়সে সংসারে প্রবেশ করায় শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাটা আর হয়ে উঠেনি। যদিও পরবর্তীতে সেই স্বপ্নটা সন্তানদের দিয়েই পূরণ করেছেন। এরপর স্বামীর ৯শ’ টাকা বেতনের চাকরিটাও চলে যায়। সেই বয়সেই জীবন সংগ্রামে মেনে পড়েন।

 

এমন অসহায় অবস্থায় জীবনের মোড় বদলায় এক চাচার সহযোগিতায়। ৩৭শ’ টাকায় একটি সেলাই মেশিন কিনে দেন তিনি। সেই মেশিন দিয়েই ঘরে বসেই কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি কুশিকাটার কাজ করে সংসারের হাল ধরেন। জীবনের সাথে সংগ্রাম করে যখন একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই আরেকটি ধাক্কা দেয় নদী ভাঙন। সাঙ্গু নদীর ভাঙনে হারিয়ে পেলেন শেষ সম্বল ভিটে বাড়িটাও। এতো প্রতিবন্ধকতার মাঝেও মনোবল ঠিক রেখে এগিয়ে যান তিনি। হয়ে উঠেন সফল উদ্যোক্তা এবং জনপ্রতিনিধিও। তার এ পরিশ্রমের যোগ্য সম্মানও পেয়েছেন রয়ন জন্নাত।

 

অদম্য এই নারী সেই কষ্টের পুরস্কারও পেয়েছেন ২০২২ সালের মা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা পাঁচ জয়িতার একজন হয়েছেন তিনি। অর্থনৈকিতভাবে সাফল্য অর্জনকারী জয়িতা ক্যাটাগরিতে তিনি বাঁশখালী উপজেলার মধ্যে সেরাদের সেরা হয়েছেন। এখন তিনি স্বাবলম্বী। শুধু তাই নয়, তার প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান হয়েছে অন্য নারীদেরও। নিজের ইচ্ছে শক্তির বলে অন্য নারীদের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন থেকে হয়ে উঠেছেন জন প্রতিনিধিও।

 

তার এ সাফল্য অর্জনের পিছনের গল্প জানতে চাইলে রয়ন জান্নাত বলেন, আজকের এ অবস্থানে আসা এতোটা সহজ ছিল না। নারী হয়ে এমন অনেক উদ্যোগ নিয়েছি সংসারের অভাব দূর করতে। এতে আশপাশের মানুষ নানারকম কথা বলেছেন। কখনো কখনো চরিত্র নিয়েও কথা বলেছেন। কিন্তু সব সময় সততার সাথে আমি আমার কাজ করে গেছি। পাশাপাশি অন্য নারীদেরও কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এখন দিন বদলেছে। কিন্তু এখনো সে সময়ের কথা ভুলতে পারি না। কিছু কিছু মানুষের কথা যেন বুকের মধ্যে গেঁথে আছে। তাদের এ কথাগুলো একজন নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করে। এ কারণে অনেক নারী থেমেও যায়। তবে আমি পিছু হটিনি। কারণ আমার স্বামী ও পরিবার আমার সাথে ছিল।

 

রয়ন জান্নাত আরো বলেন, আমার যখন বিয়ে হয় আমার স্বামী মাসিক ৯০০ টাকা বেতনের দারোয়ানের চাকরি করতো। এর মাঝে আমাদের কোলজুড়ে এক এক করে সন্তান আসতে থাকে। সংসারের অভাব অনটন আরো বেড়ে গেল। এমন অসহায় অবস্থায় আমার দূরসম্পর্কের চাচাকে বুঝিয়ে তার সহযোগিতায় ৩৭০০ টাকার বিনিময়ে একটি সেলাই মেশিন কিনি। শহরের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে একটি গার্মন্টেসের কিছু কাজ নিই। সেই কাজ আমি একা করিনি। আমার সাথে সাথে গ্রামের মেয়েদেরও কাজের সুযোগ করি। এসময় কুশিকাটার কাজও করি। এভাবেই দিন চলে। তারপর ২০১১ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে নির্বাচিত হই। সেলাইয়ের কাজ তখনও ছাড়িনি।

 

২০১৫ সালে সাঙ্গু নদীর ভাঙ্গনে বসতবাড়িটা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে শহরে চলে আসি। শহরে এসেও সেলাইয়ের কাজ এবং হোম মেইড খাবার ডেলিভারির কাজ করতে থাকি। আবার ২০২০ সালের করোনাকালীন সময়ে শহর থেকে গ্রামে চলে আসি। এখানে ছেলে মেয়ের সহযোগিতায় ‘তুষারকন্যা’ নামে একটি ফেসবুক পেইজ খুলি। এ পেইজে কাপড়, নিজে তৈরি আচার বিক্রি শুরু করি। এভাবে দেশীয় সব সিজনাল ফলের আচার তৈরি শুরু করি। এখন আমার আচার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও যাওয়ার সুযোগ হয়েছে।

 

আলহামদুলিল্লাহ, এখন আমার মাসিক আয় ৪৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার। নিজেকে উদ্যোক্তা পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি। আমার ব্যবসাকে আমি আরো বড় আকারে রূপ দিতে চাই। কারখানা তৈরি করে মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে চাই। এছাড়া আমার এক মেয়ে দুই ছেলের মধ্যে মেয়েটা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, এক ছেলে সিটি কলেজে ও আরেক জন কোরানে হাফেজ হয়েছে।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট