চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

৬ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব সংবাদদাতা, পটিয়া

দেওয়ানহাট রেল লাইনের দু’পাশে পড়েছিল ৮০-১০০ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ

পটিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার মো. মহিউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বর্ণনা করে বলেন, বাবা তাহের উদ্দিন আহমদ রেলওয়ের ইলেকট্রিক ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন। সে সুবাদে বাবার সাথে আমবাগান রেলওয়ে কলোনিতে থাকতাম । ৭১ এর স্বাধীনতা সংগ্রামে আমবাগান ঝাউতলায় যুদ্ধ আরম্ভ হয় ২ মার্চ থেকে। ওই দিন সকালে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারীতে একটি ট্রেন যাওয়ার পথে ঝাউতলা স্টেশনের কাছাকাছি গেলে ট্রেন থামিয়ে পাকবাহিনী ট্রেনে উঠে ৫/৬ জন বাঙালিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ খবর পেয়ে আমরা বাঙালিরা যার যা আছে (দেশীয় অস্ত্র) নিয়ে ঝাউতলা স্টেশনে দৌঁড়ে গেলাম।

 

 

পাকবাহিনী তখন স্টেশনের পূর্ব পাশে সর্দ্দার বাহাদুর স্কুলে অবস্থান নিল। ২ মার্চ থেকে পাকবাহিনীরা অবস্থান নিল ওয়ারলেস কলোনী ঝাউতলা স্টেশনের পশ্চিমে আর বাঙালিরা অবস্থান নিল আমবাগান টাইগারপাস এলাকায়। তাদের সাথে বাঙালিদের থেমে থেমে সংঘর্ষ হয়। ২৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মর্টারসেল মেরে টাইগারপাস নৌবাহিনীর দপ্তর দেওয়ানহাট ব্রিজ পর্যন্ত পাকবাহিনী দখলে নেয়।

 

 

তখন আমার বাবা আমাকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি পটিয়ায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সকাল ১১ টার দিকে বাবা ও আমি রেল লাইন ধরে চট্টগ্রাম স্টেশনের দিকে যাত্রা শুরু করি। দেওয়ানহাট ব্রিজের কাছাকাছি আসতেই দেখলাম রেল লাইনের দু’পাশে কমপক্ষে ৮০-১০০ জনের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে আছে। সেখানে আমাকে ও বাবাকে পাকবাহিনীরা ধরে ফেলে। তারা আমাদের কলমা পড়তে বলে। পড়ার পর তারা আমাদের ছেড়ে দেয়। পরে আমরা পটিয়া চলে আসি।

 

 

তিনি বলেন, মে মাসের শেষ দিকে আমি, সাদেক, তৈয়ব, হাসানসহ ৫ জন মিলে ফটিকছড়ি হয়ে তিন দিন হেঁটে হরিনা ইয়ুথ ক্যাম্পে পৌঁছলাম। সেখান থেকে আমাদেরকে আগরতলায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে আর্মি বিমানে তানদুয়া বিএলএফের গেরিলা সেন্টারে ট্রেনিং দেওয়া হয়। দীর্ঘ ৪০-৪৫ দিন ট্রেনিং শেষে আমাদেরকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর গাইড দিয়ে বিমানে নিয়ে আসা হয় আসামের শিলচরে। সেখান থেকে আমরা ১৭৮ জন দেমাগ্রিতে আসলাম। সেখানে ভারতীয় আর্মি ক্যাম্পে আমাদেরকে রাখা হল। কয়েকদিন পর আমাদের ডাক পড়ল বাংলাদেশে প্রবেশের।

 

 

বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি এসে দেখি শেখ ফজলুল হক মনি ভাই হেলিকপ্টারে করে এসে সেখানে উপস্থিত হলেন। আমাদের গ্রুপ থেকে পটিয়া গৈড়লা এলাকার আবুল কাসেমকে মনি ভাই হেলিকপ্টারে করে নিয়ে গেলেন। এরপর পাহাড়ি পথে পায়ে হেঁটে একটি খাল পাড় হয়ে এক বন কর্মকর্তার ঘরে প্রবেশ করলাম। সেখানে সবাই খেতে বসলে হঠাৎ মর্টার শেল হামলা শুরু হয়। এ সময় আমরা সবাই আর্মস নিয়ে বাঙ্কারে ঢুকে পড়ি। এ সময় মর্টার শেলের আঘাতে আমাদের ২ জন সহযোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন।

 

 

এরপর আমরা কয়েকজন সহযোদ্ধাসহ পাহাড়ে রাত কাটালাম। ভোরবেলা দেখি আমাদের গ্রুপের অন্যরা হেলিকপ্টার করে আমাদের খোঁজ করছেন। সেখান থেকে আমরা কাপ্তাই পুরাতন বাজার এসে মিলিত হলাম। কাপ্তাইয়ে পাকবাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে আমাদের অনেক সহযোদ্ধা হতাহত হন। সেখান থেকে সবাই লিচু বাগান হয়ে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আসলাম। এর কিছুদিন পরই দেশ স্বাধীন হয়।

 

পূর্বকোণ/আর

 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট