চট্টগ্রাম শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

৪ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১২:৩১ অপরাহ্ণ

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী

শেখ হাসিনার চট্টগ্রাম সমৃদ্ধির বিকল্প নাম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন-অগ্রগতির আকাশচুম্বী অর্জন বিশ্বস্বীকৃত। দেশীয়-আন্তর্জাতিক সকল চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ও অন্ধকারের অশুভ শক্তির অপচেষ্টাকে নস্যাৎ করে অদম্য প্রজ্ঞা-মেধা-দেশপ্রেম ও সাহসিকতায় দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ব্রতে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। দারিদ্র বিমোচন-তরুণদের কর্মসংস্থান-যোগাযোগ-শিল্পায়ন-নগরায়ন-ভৌত অবকাঠামো-অর্থনৈতিক অঞ্চল-সামাজিক নিরাপত্তা বিধানসহ সাফল্যগাথায় যুগান্তকারী মাইলফলক হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য বিস্ময়কর উপমা সমুদ্র বিজয়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ, চলমান মেট্রোরেল প্রকল্প এবং করোনাজয়ে বিশ্বে পঞ্চম ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম স্থানে অধিষ্ঠ হওয়া ইত্যাদি। মুক্তির মহানায়ক স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামকে ঘিরে যে স্বপ্নের সংযোগ স্থাপন করেছেন; তার প্রায়োগিক দৃশ্যমানতায় স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত বিশ্বস্ত অনুসারী প্রয়াত জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরী, এম. এ. আজিজসহ বর্ষীয়ান নেতাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী চট্টগ্রামের কিংবদন্তি নেতা আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও চট্টলবীর এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ প্রমুখ কর্মবীরের অসাধারণ অবদান।

 

এটি সর্বজনবিদিত যে সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ঐতিহ্যের দিক থেকে অতি প্রাচীনকাল থেকেই চট্টগ্রামের ইতিহাস নৈপুণ্য, বৈচিত্র্য ও সংগ্রামী চেতনায় ঋদ্ধ। সমুদ্র বন্দরের কারণে চট্টগ্রাম ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকেও বৈশ্বিক পরিম-লে ছিল সুপ্রসিদ্ধ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তীতে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে চট্টগ্রামের অবদান স্বকীয় সত্ত্বায় ভাস্বর। স্বর্গীয়/প্রয়াত যাত্রামোহন সেন, শেখ-এ চাঁটগাম কাজেম আলী, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, মাস্টারদা সূর্য সেন, লোকনাথ বল, আবদুল হক দোভাষ, রফি উদ্দিন সিদ্দিকী, সিরাজুল হক, ডা. এম.এ. হাশেম, খান বাহাদুর বদি আহমদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার আনোয়ারুল আজিম, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত ও পূর্ণেন্দু দস্তিদার, বাদশা মিয়া চৌধুরীর মত অনেকেই চট্টগ্রামের নন্দিত ইতিহাস সৃজনে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। চট্টগ্রাম শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতবর্ষকেও মুক্তি সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মহিমান্বিত অধ্যায় রচনায় পথপ্রদর্শক। সম্ভবত এজন্যই বহুকাল পূর্বে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী বলেছেন ‘চট্টগ্রাম সর্বাগ্রে’।

 

চট্টগ্রামকে প্রকৃত অর্থে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-বন্দর-ওয়াসা-রেলওয়ে-সিডিএ-পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত এসব কর্মযজ্ঞে বদলে যাচ্ছে চট্টগ্রামের দৃশ্যপট। ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ মডেলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কে সংযুক্তির উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। বাংলাদেশের এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর তলদেশে প্রথম ও দীর্ঘতম এই টানেল নির্মাণের সূচনা হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও চীনের মহামান্য রাষ্ট্রপতির প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম শহরকে বাইপাস করে সরাসরি কক্সবাজারের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার পাশাপাশি চট্টগ্রাম শহরে যানজট কমে আসবে। চীনের সাংহাইয়ের আদলে নদীর দুই তীরকে একই বন্ধনে আবদ্ধ করবে দৃষ্টিনন্দন এই টানেল। উল্লেখ্য যে, ২০০৮ সালে সংসদ নির্বাচনের পূর্বে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে নির্বাচনী সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে এই টানেল নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রকল্প প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই টানেলে প্রতিটি টিউবের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার এবং টিউবগুলোর দূরত্ব প্রায় ১২ মিটার। টানেলের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তে রয়েছে ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক এবং আনোয়ারা প্রান্তে ৭২৭ মিটার দৈর্ঘ্যরে ওভারব্রিজ। ১৮ থেকে ৩১ মিটার গভীরতায় নেমে যাওয়া এই টানেল দিয়ে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ-পূর্বে আনোয়ারায় সিইউএফএল ও কাফকোর মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে স্থলপথ দিয়ে বের হবে। ৩৫ ফুট প্রশস্ত ও ১৬ ফুট উচ্চতার টানেলে দুটি টিউব দিয়ে যান চলাচলের সুযোগ থাকবে। নগরীর আউটার রিং রোড, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কাটগড় সড়ক, বিমানবন্দর সড়ক এবং পতেঙ্গা বিচ সড়ক দিয়ে টানেলে প্রবেশ করা যাবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে টানেল চালু হলে চট্টগ্রাম শহর-বন্দর ও বিমানবন্দরের সাথে উন্নত-সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হবে। ফলে ভ্রমণ সময় ও খরচ কমবে এবং পূর্ব প্রান্তের শিল্পকারখানার কাঁচামাল ও প্রস্তুতকৃত মালামাল পরিবহন প্রক্রিয়া সহজতর হবে। কর্ণফুলী টানেল শুধু দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে না; দেশের প্রধান পর্যটন এলাকাগুলোর মধ্যে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন-বান্দরবানসহ পাহাড়, সমুদ্র ও নদীর ত্রিমাত্রিক নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সহজতর যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও মুখ্য ভূমিকা রাখবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর পরিস্থিতির বহুমাত্রিক উন্নতি সাধিত হয়েছে। প্রতিবছরই বাড়ছে বন্দরের আয়। নিজস্ব তহবিল থেকে নানান উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশীয় বিনিয়োগ। সমুদ্রপথে কনটেইনারে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ৯৮ শতাংশ হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। আমদানি-রপ্তানি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা অর্জনে বর্তমান সরকারের গৃহীত মেগা প্রকল্পের মধ্যে প্রণিধানযোগ্য হচ্ছে; পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি), গভীর সমুদ্র বন্দর, পতেঙ্গা-হালিশহর উপকূলে বে-টার্মিনাল নির্মাণ ইত্যাদি। এছাড়াও স্বয়ংক্রিয় কনটেইনার অপারেশন পদ্ধতি সিটিএসএস, বন্দরে নিরাপদে জাহাজ যাতায়াত ও বহিঃনোঙ্গরে অবস্থানকালে জাহাজগুলোকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করার জন্য আধুনিক ভিটিএমআইএস চালু এবং সামগ্রিক কার্যক্রম ডিজিটাল করার ফলে বন্দরের সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তৈরি পোশাক খাতসহ সকল বৈদেশিক বাণিজ্য আন্তর্জাতিকভাবে সুদৃঢ় করতে হলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ব্যয় ও সময় হ্রাস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গ। ব্যবসায়ীদের মতে দেশে গভীর সমুদ্র বন্দর স্থাপনই হচ্ছে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র পন্থা। এর যথার্থ অনুধাবন ও দেশের ব্যবসায়ীদের দীর্ঘ দিনের দাবির প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন যা চলমান মেগা প্রকল্প সমূহের অন্যতম।  ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ ‘দেশীয় বিনিয়োগে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত পরিসংখ্যান মতে, চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছরে ১৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে। পরবর্তী পাঁচ বছর ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে বছরে গড়ে ২৮ লাখ টিইইউএস কন্টেইনারে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ পাঁচ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৬ শতাংশ। পাশাপাশি বেড়েছে বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিংও। উল্লেখ্য অর্থবছর সমূহে গড়ে প্রতি বছর বাল্ক পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে যথাক্রমে ৩ কোটি ৭৭ লাখ টন ও ৭ কোটি টন। এছাড়াও বেড়েছে জাহাজ আগমনের হারও।  ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে প্রতি বছরে ২ হাজার ৫৯২টি জাহাজ হ্যান্ডলিং এর বিপরীতে পরের পাঁচ বছরে ঐ সংখ্যা বেড়ে গড়ে হয়েছে বছরে ৩ হাজার ৯৪২টিতে। ২০২১ সালে এই বন্দর দিয়ে ১১ কোটি ৬৬ লাখ টন পণ্য এবং ৩২ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। পেপারলেস ট্রেডের দিকে অগ্রসরমান চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বশেষ ইলেকট্রিক ডেলিভারিতে যুক্ত হয়ে ঘরে বসে অনলাইনে ইলেকট্রনিক ডেলিভারি পাচ্ছেন গ্রাহকেরা। ফলে ভুয়া  ডেলিভারি শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।

 

চট্টগ্রামের যানজট নিরসনে নেওয়া হয়েছে ফ্লাইওভার, আউটার রিং রোড, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত পৃথিবীর দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প। নগরীর লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ শেষ হলে নগরের যানজট সমস্যা অনেকাংশে নিরসন হবে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এরই মধ্যে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে এম এ মান্নান-আখতারুজ্জামান-কদমতলী ফ্লাইওভার, দেওয়ানহাট ওভারপাস, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক, চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক, ডিটি-বায়েজিদ সংযোগ সড়ক, শাহ আমানত সেতু-বহদ্দারহাট ছয় লেনের সংযোগ সড়ক, আউটার রিং রোড, ইনার রিং রোড। প্রকল্পগুলো চালু হওয়াতে নগরের যানজট নিয়ন্ত্রণে অনেকাংশে সহায়ক হয়েছে। ৭ নভেম্বর ২০২২ একই সাথে সারাদেশের ১০০টি সেতুর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগের ৪৪টি সেতুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। ৪৪টি সেতুর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার কালারপোল সেতু, রাঙামাটির বরকল সেতু এবং খাগড়াছড়িতে রয়েছে ৪২টি সেতু। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামে মেট্রোরেল চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে দ্রুততার সাথে এগিয়ে যাচ্ছে ১৮ হাজার কোটি টাকায় দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার-ঘুনধুম রেললাইন স্থাপন প্রকল্প।  দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বাঁশখালী ও মাতারবাড়িতে স্থাপিত হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্র ।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সহযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে চলছে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরুদ্ধার, পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প। সিইজিআইএস এর কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিদ্যমান নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। প্রকল্পের আওতায় পুনঃখননের মাধ্যমে ৩৫টি খালের প্রাচীর নির্মাণ, ৫টি ‘টাইডাল রেগুলেটর’ নির্মাণ, ৬০টির বেশি সেতু ও কালভার্ট পুনর্গঠন এবং পুনঃনির্মাণের মাধ্যমে মূল নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হচ্ছে। এছাড়া ১২০ কিলোমিটার জুড়ে ৯০টির বেশি ‘ক্রস ড্রেইন’, কালভার্ট পুননির্মাণ ও পরিষ্কার করা হচ্ছে। প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ২১টি ‘সিল্ট ট্র্যাপ’। প্রকল্পের অগ্রগতি ইতিমধ্যে অনেকাংশে দৃশ্যমান হয়েছে।

নগরবাসীকে পানির সঙ্কট থেকে পরিত্রাণে চট্টগ্রাম ওয়াসা কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ২০২০ সালে উদ্বোধন হওয়া চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাটে হালদা নদীর তীরে নির্মিত ওয়াসার আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শেখ রাসেল পানি শোধনাগার থেকে দৈনিক পানি পাওয়া যাচ্ছে নয় কোটি লিটার। চলতি বছরের ১৬ মার্চ উদ্বোধন হয় দৈনিক ১৪ কোটি ৩০ লাখ লিটার উৎপাদন ক্ষমতার চট্টগ্রাম ওয়াসার মেগা প্রকল্প শেখ হাসিনা পানি শোধানাগার-২। যৌথ অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম ওয়াসার ভান্ডালজুড়ি পানি শোধানাগার নির্মাণ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৭৫ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুপেয় পানি সরবরাহের প্রত্যাশাও করা হচ্ছে। এছাড়াও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরী ও আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি বিনোয়োগ আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। এ দুটি প্রকল্পের কাজ পরিপূর্ণতা পেলে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রচ- অনুভূত। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে গতিশীলতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকল্পে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ১৭ নভেম্বর সার্কুলার জারির মাধ্যমে চট্টগ্রামের রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল সিইপিজেড, কর্ণফুলী ও কোরিয়ান ইপিজেডকে আলাদা অফিস কোড ব্যবহারে নির্দেশনা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউজের নিয়ন্ত্রণাধীন সিইপিজেডের কোড ব্যবহার করে কর্ণফুলী ও কোরিয়ান ইপিজেডের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় শুল্কায়নসহ কাস্টমস সংক্রান্ত কার্যক্রম যথাযথভাবে প্রতিপালনে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছিল। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে তিনটি ইপিজেডকে পৃথক কোডে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে বর্তমান সরকার কর্তৃক গৃহীত শিক্ষাক্ষেত্রে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ যথা-উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক-উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজসহ শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ, নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ, বিনামূল্যে বই বিতরণ, শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি ও ঝড়ে পড়া রোধকল্পে স্কুল ফিড়িং প্রকল্প গ্রহণ, পর্যায়ক্রমে শিক্ষা উপকরণসরবরাহ, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ ইত্যাদির সুফল এসে পৌঁছেছে চট্টগ্রামেও। এসব পদক্ষেপে চট্টগ্রাম শিক্ষা বিস্তারে কার্যকর ও ফলপ্রসূ অবদান রেখে চলছে। উচ্চশিক্ষা লাভে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়। অতিসম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রদত্ত ভাষণে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে কতিপয় উপাচার্য-শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে সত্যনিষ্ঠ মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জনশ্রুতিমতে চট্টগ্রামেও উচ্চশিক্ষা-গবেষণাসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনায় প্রভূত অর্থ-কারিগরি যোগান দেওয়া সত্ত্বেও কতিপয় হিংস্র বংশপরম্পরায় আত্মস্থ দুর্বৃত্তদের অর্থ লোপাট-অপকর্মের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রাম  মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল-জেনারেল হাসপাতালের উন্নয়ন এবং চট্টগ্রাম হৃদরোগ হাসপাতাল স্থাপন অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিভাত। বর্তমানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে পিপিপি প্রকল্পের হেমোডায়ালাইসিস সেন্টারে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা প্রদান ইতিমধ্যে অনেকের নজন কেড়েছে। সাধারণ মানুষকে মানসম্পন্ন ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়ার জন্য এটি সরকারের একটি অত্যন্ত সফল উদ্যোগ।

 

দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে বর্তমানে পুরো চট্টগ্রামে গ্যাস সঙ্কটে শিল্প কারখানা-নিয়মিয়ত রান্নাবান্না-গ্যাস চালিত পরিবহনসহ সকল নাগরিক সেবা প্রচন্ড ব্যাহত এবং এক ধরনের গণঅসন্তোষ সর্বত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে। কালুর ঘাট সেতু নির্মাণে দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন মহলে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করছে। আগামী ৪ ডিসেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার চট্টগ্রাম আগমনকে সামনে রেখে বিরাজিত সকল সমস্যা সমাধানে প্রাণপ্রিয় নেত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।  দেশের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম সচল থাকলে বাংলাদেশও সচল থাকবে। এই স্বতঃসিদ্ধ ধারণাকে পর্যাপ্ত আমলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামের উন্নয়নের ভার নিজ হাতে নিয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে এটুকুু সহজে দাবি করা যায়, শেখ হাসিনার অপর নাম সমৃদ্ধির চট্টগ্রাম।

লেখক: শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট