চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

৩ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১১:১১ অপরাহ্ণ

নাজিম মুহাম্মদ

আবির আলীর জবানবন্দিতে শিশু আয়াত হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা

আয়াত হত্যায় অভিযুক্ত গ্রেপ্তার আবির আলির জন্ম আয়াতদের ভাড়া বাসাতেই। অথচ পাঁচ বছরের শিশু আয়াতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ছোট্ট দেহটি কেটে ছয় টুকরো করে আবির। দেড় মাস আগে আয়াতকে হত্যার পরিকল্পনা করে আবির। তার পরিকল্পনা ছিল হত্যার পর আয়াতের দাদার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করবে। বিষয়টি বন্ধু হাসিবকেও জানিয়েছিল সে। দ্বিতীয় দফায় সাতদিন রিমান্ডের পর  শনিবার ৩ ডিসেম্বর আদালতে আয়াত হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে জবানবন্দি দিয়েছে আবির আলি। প্রায় ১৭ পৃষ্ঠার জবানবন্দিতে শিশু আয়াত হত্যার বর্ণনায় উঠে আসে লোমহর্ষক চিত্র। মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল দেবের আদালতে এ জবানবন্দি দিয়েছে আবির।

আবির জানান, আয়াতদের ভাড়া বাসাতেই তার ও ছোট বোন আখির জন্ম। ঝগড়া করে মা-বাবা আলাদা বাসায় থাকত। আর্থিক সংকটের কারণে তার ভেতরে বড় লোক হওয়ায় স্বপ্ন জাগে। এরপরই পরিকল্পনা করে আয়াতকে হত্যা করে তার দাদার কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করবে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনোজ দে জানান, আয়াত হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেপ্তার আবির। জবনাবন্দির পর আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

 

যেভাবে হত্যা করা হয় আয়াতকে : জবানবন্দিতে আবির বলেন, ১৫ নভেম্বর বেলা তিনটার সময় দাদা মঞ্জুর সাথে মসজিদে মক্তবে যায় আয়াত। সাড়ে তিনটার সময় দেখি আয়াত বাসায় ফিরছে। তাকে প্রথমে ডাকে। সে আসতে চায়নি। পরে গলায় ও ঘাড়ে ধরে বাবার ভাড়া বাসায় ঢুকিয়ে আয়াতকে খাটে শুইয়ে তার হিজাব দিয়ে মুখ চেপে ধরে গলা টিপে মৃত্যু নিশ্চিত করে আবির। হত্যার পর বাবা আজহারুল ইসলামের পরনের লুঙ্গি পেঁচিয়ে বাসায় থাকা একটি ছাই রংয়ের ব্যাগে আয়াতের মৃতদেহটি ঢুকিয়ে রাখে। বেলা চারটার (১৫ নভেম্বর) দিকে ব্যাগ ভর্তি আয়াতের মৃতদেহ ও আরেকটি কালো পলিথিনের বস্তায় কিছু কাঁথা কম্বল নিয়ে বাবার বাসা থেকে বের হয়ে আকমল আলি খালের পকেট গেট এলাকায় মায়ের বাসার দিকে রওনা দেয় আবির। এ সময় তিন তলার ভাড়াটিয়া ইয়াছিনের সাথে দেখা হয় আবিরের। তাকে কাঁথা কম্বলের পলিথিনটি দিয়ে আয়াতের দেহভর্তি ব্যাগ আবির নিজেই বহন করে। বাসায় ঢুকে আয়াতের মৃতদেহ ভর্তি ব্যাগটি সানসেটের উপর রাখে। বেলা চারটার দিকে আবিরের মা বাসায় ফিরলে খাবার খেয়ে ফের আয়াতের বাসার দিকে যায় আবির। এরমধ্যে আয়াতকে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। আবির নিজেও অন্যদের সাথে আয়াতকে খোঁজার ভান করে।

আবির জবানবন্দিতে জানায়, রাতে বাসায় ঢুকার আগে আকমল আলী গেইটের পাশে কাঁচা বাজারের দোকান থেকে একটি নীল রংয়ের ছুরি, একটি কসটেপ এবং দুই কেজি মাপের আধা কেজি পলিথিন কিনে রাত দশটায় বাসায় ফিরে। সেই সময় মা এবং তার বোন বাসায় ছিলনা। রাত সাড়ে দশটার দিকে মা বোন বাসায় ফিরলে তাদেরকে আয়াত নিখোঁজের কথা জানালে তারাও আয়াতকে খুঁজতে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।

 

যেভাবে কাটা হয় শিশু আয়াতকে: মা ও বোন আয়াতের খোঁজে বাসা থেকে বের হয়ে গেলে সানসেট থেকে আয়াতের লাশটি নামিয়ে বাথরুমে নিয়ে যায় আবির। সেই সময় বাসার পাশে নির্মানাধীন একটি ভবনের ইট ভাঙার শব্দ হচ্ছিল। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রথমে ছোট ছুরি দিয়ে আয়াতের দেহ কাটার চেষ্টা করে। কিন্ত চামড়া মোটা হয়ে যাওয়ায় যেভাবে চাইছিল সেভাবে দেহটি কাটা যাচ্ছিল না। পরে ঘরে থাকা বটি দিয়ে কাটা শুরু করে। হাড়ের অংশগুলো গাছের গুড়ির উপর রেখে আলাদা করে। আবির জানায়, প্রথমে আয়াতের দুটি হাত কেটে আলাদা করে। তারপর গলার অংশ এর পা দুটি কেটে শিশু আয়অতের দেহটি মোট ছয় টুকরো করে। দুই পা ও দুই হাত আলাদাভাবে সাদা পলিথিনের ভেতর ঢুকিয়ে কসটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে প্যাকেট করে। দেহ ও মাথার অংশটি পলিথিনে ঢুকছিলো না। আয়াতের জামা ও প্যান্ট এক পলিথিনে, হিজাব এক পলিথিনে ও লাশ মুড়িয়ে আনা লুঙ্গিটি একটি পলিথিনে মুড়িয়ে একটি বাজারের ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। আয়াতের কাটা দেহের অংশগুলো বাথারুমে রেখে বাসায় তালা লাগিয়ে ব্যাগভর্তি রক্তাক্ত কাপড়গুলো গলিরমুখে খালে ফেলে দেয়। গলির মুখের একটি দোকান থেকে বড় সাইজের চারটি সাদা পলিথিন নিয়ে বাসায় ঢুকে একটিতে দেহ ও আরেকটি মাথার অংশটি ঢুকিয়ে কসটেপ মোড়ানের সময় মা এবং বোন দরজায় কড়া নাড়ে। তাদেরকে গায়ের পশম কাটার কথা বলে দরজার বাইরে প্রায় আধা ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখে। আয়াতের দেহের খণ্ডিত অংশ গুলো প্যাকেটভর্তি করে কসটেপ লাগিয়ে ব্যাগে ঢুকিয়ে পুনরায় সানসেটে তুলে রাখে। বাথারুমের জানালা দিয়ে কসটেপের খণ্ডিত অংশ বাইরে ফেলে দেয়। ধুয়ে ছুরিটি বিছানার তোষকের নীচে এবং বটি দা খাটের নীচে রেখে দেয়। প্রায় আধাঘন্টা পর দরজা খুললে মা জানতে চাই কসটেপের আওয়াজ কেন? তখন আবির বলেন, ‘তুমি জানো না মাঝে মাঝে আমি কসটেপ দিয়ে শরীরের পশম পরিস্কার করি? রাত বারোটার দিকে বাথরুমে ঢুকে গোসল করে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ে।

 

যেভাবে ফেলা হয় দেহের খ-িত অংশ: জবানবন্দিতে আবির জানায়, পরদিন ১৬ নভেম্বর সকাল সাতটার সময় ইপিজেড এলাকায় চাকরি খুঁজতে চলে যায় আবিরের মা। ছোট বোন আঁখি ঘুমাচ্ছিল। সকাল এগারোটার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আবির। বেলা আড়াইটা থেকে চারটা পর্যন্ত বাসা সংলগ্ন ব্রিজের কাছে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলে। রাতে বাসায় ফিরে ছোট বোনের সাথে স্বাভাবিক ভাবে লুডু খেলে রাত এগারোটার সময় খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ে। পুরো দিন আয়াতের দেহের খণ্ডিত অংশ ভর্তি ব্যাগটি বাসার ভেতরে সানশেটের উপরে ছিল।
পরদিন (১৭ নভেম্বর) সকালে ছোট বোন ও মা চাকরির খুঁজতে বের হয়ে গেলে দেহের খণ্ডিত অংশগুলো ব্যাগ থেকে বের করে আবির। ওই সময়ও রক্ত পড়ছিল। পরে বাসায় থাকা প্লাস্টিকের একটি চাউলের বস্তায় দেহের খণ্ডিত অংশগুলো ঢুকিয়ে নেয়। তারপরও যখন রক্ত পড়ছিল তখন বিছানার নীচে থাকা একটি পলিথিনের বস্তায় দেহের অংশটি ঢুকিয়ে নেয়। দেহ ও কাটা হাত দুটি একটি ব্যাগে এবং দুই পা ও মাথার অংশসহ বাকী তিন টুকরো ছোট বোন আঁখির স্কুল ব্যাগে ঢুকিয়ে নেয়। সানসেটে রক্তের দাগ দেখে গন্ধ ছড়াবে ভেবে রক্তের উপরে তিব্বত পাউডার ও ব্লু বার্ড পারফিউম ছিটিয়ে দিই।
সকাল (১৭ নভেম্বর) সকাল পৌনে আটটায় আয়াতের দেহের খণ্ডিত অংশভর্তি ব্যাগ নিয়ে সাগর পাড়ে গিয়ে ফেলে আসে আবির।
আবির জানান, দুপুরে যথারীতি বাসায় খাবার খেয়ে আয়াতের বাসার ওখানে ঘুরে আসে। বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলে।

 

পূর্বকোণ/রাজীব/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট