চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২ ডিসেম্বর, ২০২২ | ১:৩৫ অপরাহ্ণ

নিজস্ব সংবাদদাতা, লোহাগাড়া

ওয়াংছুর দেয়া হেলমেট-বেয়নেট মুক্তিযুদ্ধের অম্লান স্মৃতি

আবদুল হামিদ বেঙ্গল লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের আখতারিয়া পাড়ার অধিবাসী। বাল্যকালে ছাত্রলীগ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন । বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ১৯৭১ সালে এপ্রিল মাসে তিনি ভারতের ত্রিপুরার শ্রীনগর সীমান্ত পার হয়ে মনু বাজারে পৌঁছেন। পরদিন তার সাথে কয়েকজনকে হরিণা ক্যাম্পে পাঠান। এরপর ৩৫ জনের একটি গ্রুপ প্রশিক্ষণের জন্য ওইখান থেকে ওমান ক্যাম্পে প্রেরণ করেন। ইকু কোম্পানি গ্রুপের হয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন সেখানে। পরে তাদেরকে পুনরায় হরিণা ক্যাম্পে আনা হয়। ওইখানে তারা দু’গ্রুপে বিভক্ত হন।

 

একই সালের মাঝামাঝি সময়ে ২নং সেন্টারের আওতাধীন ফেনী জেলার ছাগল নাইয়ার মিধার বাজারে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। পাকবাহিনী পালিয়ে যাওয়ার সময় শত্রু বাহিনীর একটি আর্টিলারি শেল তাদের বাংকারে এসে পড়লে তিনি আহত হন। তাকে দ্রুত আগরতলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা শেষে পুনরায় তাকে হরিণা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ওইখানে ক্যাপ্টেন মাহফুজ-এর নেতৃত্বে ৩টি গ্রুপ গঠন করা হয়। তিনি বলেন, ১৮ সেপ্টেম্বরের পর ১নং সেক্টরের ৮৫নং গেরিলা গ্রুপের সাথে সাবরুম বর্ডার অতিক্রম করে রামগড়, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা হয়ে তারা চন্দনাইশে আসেন।

 

তাদের ৮৫নং গ্রুপটি সাতকানিয়ার চরতির বজল চেয়ারম্যানের বাড়িতে এসে ক্যাম্প স্থাপন করে। পরবর্তীতে স্থান পরিবর্তন করে দোহাজারী হয়ে চন্দনাইশের পাহাড়ি অঞ্চলের ধোপাছড়িতে উপস্থিত হয়। বাজারের উত্তর পার্শ্বে সুলতান আহমদ কুসুমপুরীর আলফা গ্রুপ ক্যাম্প ছিল। আবদুল হামিদ বেঙ্গলের গ্রুপ ক্যাম্পটি ছিল বাজারের পশ্চিম দিকে। পরে যুক্ত হয় হাবিলদার আবু ইসলাম ও ল্যান্স নায়েক হারুনের পৃথক দু’টো গ্রুপ। তখন রমজান মাস ছিল। বাজারে মুক্তিযোদ্ধারা ইফতার করার সময় অতর্কিতভাবে পাকবাহিনী বাজারে আক্রমণ চালালে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা জবাব দেন।

 

এরপর তিনি ও সহযোদ্ধারা রাঙামাটি পৌঁছেন। সেখানে ভারতের মাউন্টেন ডিভিশনের সাথে ১০ ডিসেম্বর আমরা একত্রিত হয়। হঠাৎ একদিন পাহাড়ের অবস্থানরত পাকবাহিনীর ক্যাম্প থেকে গুলি বর্ষণ শুরু হয়। মুক্তিবাহিনীরাও পাল্টা গুলি চালিয়ে জবাব দেন। সন্ধ্যার দিকে গোলাগুলি বন্ধ হয়। ১২ ডিসেম্বর দুপুর বেলায়পাক হানাদার বাহিনী পুনরায় হঠাৎ গুলি বর্ষণ শুরু করে। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী একত্রিত হয়ে পাকবাহিনীকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ চালান। এতে ভারতীয় বাহিনীর সেনা সদস্য ওয়াংছু গুলিবিদ্ধ হন। পাশে ছিলাম আমি (আবদুল হামিদ বেঙ্গল)। ওয়াংছু তার হেলমেট ও একটি বেয়নেট আমার হাতে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে মিত্রবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা বড়কল থানা ও বাজার আক্রমণ করে শত্রু মুক্ত করেন। ওইখানে পাকবাহিনীর সাথে তুমুল যুদ্ধ হয়। ভয়াবহ যুদ্ধে পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

 

পরবর্তী অপারেশন হয় শুভলং ও রাঙামাটি শত্রু মুক্ত করতে। ওইখানে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। এক পর্যায়ে পাকবাহিনী পালিয়ে যায়। পুরো এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। এরপর মুক্তিযোদ্ধারা আনন্দ-উল্লাস করেন। বেঙ্গল বলেন, তার সহযোদ্ধা ওয়াংছু’র দেয়া সেই হেলমেট ও বেয়নেটটি মুক্তিযুদ্ধের অম্লান স্মৃতির নিদর্শন হিসেবে তার কাছে আজো সংরক্ষিত আছে। যদি ভবিষ্যতে সুযোগ হয়, তিনি ওই দু’টি স্মৃতি জাদুঘরে দান করবেন।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট