চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি, ২০২৩

সর্বশেষ:

২৭ নভেম্বর, ২০২২ | ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

ইমাম হোসাইন রাজু

কাটাছেঁড়া ছাড়া হার্টের ছিদ্রের প্রথম সফল অস্ত্রোপচার

মো. শহীদ আলম। পঞ্চাশোর্ধ্ব এই ব্যক্তি পেশায় একজন ভ্যানচালক। নগরীর চান্দগাঁওয়ের মোহরা এলাকার এ বাসিন্দার বছর দু’য়েক আগে ধরা পড়ে তার হার্টের মধ্যে ছিদ্র রয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, জন্মগতভাবেই এ ত্রুটি ছিল শহীদের। কিন্তু ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন শহীদ ও তার পরিবার। তারমধ্যে কাটাছেঁড়ার ভয়ও ছিল।

শহীদ আলমের ছেলে মো. রোবেল বলেন, ‘বাবার রোগ ধরা পড়ার এক প্রকার দিশেহারা হয়ে পড়ি। ভাবতেও পারিনি তার জন্মগত হার্টের ছিদ্র রয়েছে। একদিকে চিকিৎসার খরচ অন্যদিকে ওপেন হার্ট সার্জারি করে অস্ত্রোপচার করার কথা শুনে আরও বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ি।’

 

শহীদের মতো একই ভয় ছিল ফটিকছড়ির বাসিন্দা রহমত উল্লাহ’র পরিবারের। শহীদ আলমের বয়স পঞ্চাশ হলেও রহমতের বয়স ছিল মাত্র ২ বছর। জন্মের পর থেকেই শারীরিক নানান সমস্যা থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে হার্টের ছিদ্র ধরা পড়ে তার। একমাত্র সন্তানের বুকে ছুরি চালানোর ভয়ও ছিল তার পরিবারের। সুখবর হলো- কোন ধরণের কাটাছেঁড়া ছাড়াই আধুনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জন্মগত হৃদরোগের ছিদ্র বন্ধ করা হয় শহীদ ও রহমত উল্লাহ’র। প্রয়োজন হয়নি একটি অর্থেরও।

গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে আধুনিক ডিভাইসের মাধ্যমে জন্মগত হৃদরোগের ছিদ্র বন্ধ করা হয় এ দু’জনসহ পাঁচজনের। যাদের একটি পয়সাও প্রয়োজন হয়নি। আর এ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিও ছিল সরকারি এ হাসপাতালের জন্যও প্রথম। যার নেতৃত্ব দেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. নুরুন্নাহার ফাতেমা।

 

জানা যায়, কনজেনিটাল হার্ট ডেস্ক-বাংলাদেশ (সিএইচডি-বিডি) এবং চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগ ও চট্টগ্রাম সোসাইটি অফ ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজির যৌথ উদ্যোগে এসব রোগীদের সেবা ও বিনামূল্যে ডিভাইস প্রদান করা হয়। আর এ চিকিৎসাসেবা পদ্ধতিও চমেক হাসপাতালের জন্য প্রথম ছিল। যা এর আগে কখনোই হয়নি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সফল অস্ত্রোপচারের পর পাঁচজনকেই হৃদরোগ বিভাগের সিসিইউতে রাখা হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ফাহমিদা। কাছে গিয়ে শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে মিষ্টি হেসে বলেন, ‘আমি ভালো আছি, এখন কোনও সমস্যা নেই। ডাক্তার বলেছেন কাল বা পরশু বাড়ি যেতে পারবো।’

পাশের সিটে নিজ সন্তানকে নিয়ে বসে ছিলেন রহমত উল্লাহ’র মা। তিনিও বলেন, ‘কোন ধরণের কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন হয়নি। আমার সন্তান সুস্থ আছে। এজন্য আল্লাহ’র কাছে শুকরিয়া আদায় করছি।’

 

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. নুরুন নাহার ফাতেমা বলেন, মানুষ মনে করে জন্মগত হৃদরোগ শুধু বাচ্চাদেরই আছে। কিন্তু এটি ভুল। এটি বড়দেরও হয়ে থাকে। আজকে পাঁচটি রোগীর মধ্যে একটি মাত্র দুই বছরের শিশু। বাকি চারজনই প্রাপ্ত বয়স্ক ও বৃদ্ধ। সবাই জন্মগত হৃদরোগী। ইন্টারভেনশনাল প্রসিডিউর খুবই বিশেষায়িত একটি চিকিৎসা সেবা। অনেক প্রতিকূলতার সাথে আমরা বাংলাদেশে এই চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম চালু করেছি। যা বুক না কেটে পায়ের রগ দিয়ে ডিভাইসের মাধ্যমে ছিদ্রটি বন্ধ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, কনজেনিটাল হার্টডিজিজ হলো জন্মগত হৃদরোগ। জন্মগত হৃদরোগ পরিণত বয়সেও ধরা পড়তে পারে। এটি থাকলে শিশুরা সহজেই ঠাণ্ডা-কাশি, নিউমোনিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়। জন্মের পর এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহবান প্রখ্যাত এ চিকিৎসকের।

 

চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. আশীষ দে বলেন, ‘বেসরকারিভাবে একটি ডিভাইসের ম‚ল্য দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। কিন্তু পাঁচজন রোগীকে বিনামূল্যে এ সেবা প্রদান করা হয়। চমেক হাসপাতালে ইন্টারভেনশনাল প্রসিডিউর এটিই প্রথম। আমরা আশা করছি সকল সুযোগ সুবিধা পেলে ভবিষ্যতে এমন কাজ চলমান থাকবে।’

তিনি বলেন, হার্টের ছিদ্র, জন্মগত বাড়তি নালি, রক্তনালীর সংকুচিত অংশ কিংবা সংকুচিত বাল্বের চিকিৎসার জন্য এখন আর সার্জারির প্রয়োজন হয় না। বর্তমান আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সার্জন ও কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে জন্মগত হৃদরোগের কাটাছেঁড়াহীন চিকিৎসা এখন দেশেই সম্ভব হচ্ছে।

 

পূর্বকোণ/এএস

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট