চট্টগ্রাম রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

১৯ নভেম্বর, ২০২২ | ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী

মানবসৃষ্ট ১০ বিপদে হালদা

মানবসৃষ্ট ১০ বিপদে হালদা। মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে বছরের পর বছর ধরে সমস্যাগুলো জিইয়ে রয়েছে। এমনকি সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় নদী কেন্দ্রিক সমস্যার তালিকা ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে। হালদা নিয়ে কাজ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর। কিন্তু এসব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় কোন উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছে না জনগণ।

 

হালদার অন্যতম দশ সমস্যা হচ্ছে নগরীর গৃহস্থালি, শিল্প কারখানা, পোল্ট্রি ফার্মের দূষিত বর্জ্যরে দূষণ, মা মাছ শিকার, বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধন, ডলফিন হত্যা, বালি ও মাটি উত্তোলন, তামাক চাষ, বাঁধ দিয়ে মৎস্য চাষ, রাবার ড্যাম, কুম ভরাট ও লবণের আগ্রাসন। অথচ ৯৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা হালদা নদী রুই জাতীয় মাছের প্রজনন, কৃষি কাজে সেচ সুবিধা, ওয়াসার সুপেয় পানি, যোগাযোগ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশ উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বিশাল অবদান রেখে আসছে।

 

সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হালদা নদীর প্রধান সমস্যা দূষণ। নগরীর অক্সিজেন ও কুলগাঁও এলাকার গৃহস্থালি ও শিল্প কারখানার দূষিত বর্জ্য বামনশাহী খাল হয়ে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ত। কিন্তু সিডিএ’র অনন্যা আবাসিক এলাকায় বামনশাহী খালটি ভরাট ও দখল করে স্থানীয় কিছু লোকজন। এ অবস্থায় সিডিএ বামনশাহী খালকে অনন্যা আবাসিকের প্রধান ড্রেনেজ সিস্টেমের সাথে সংযুক্ত করে ফেলে। তাতে অক্সিজেন থেকে কুলগাঁও পর্যন্ত শহরের দূষিত বর্জ্য কুয়াইশ ও খন্দকিয়ার খাল হয়ে মদুনাঘাট এলাকা সংলগ্ন হালদায় গিয়ে পড়ছে। দূষিত পানির কারণে হালদার প্রজনন হুমকিতে পড়েছে।

 

অপরদিকে আবাসস্থল ধ্বংস, নদী দূষণ, মাছ ধরার জালে আটকা, ইঞ্জিন চালিত যানে আঘাত ও অবৈধ শিকারের কারণে গত পাঁচ বছরে হালদায় ৪০টি ডলফিন মারা গেছে। মূলত আলোচ্য ৫ কারণেই হালদায় বেশিরভাগ ডলফিন মারা যায়। হালদাতে যে ডলফিনের বিচরণ স্থানীয়ভাবে এগুলোকে হুতুম বা শুশুক বলা হয়। বাংলা নাম গাঙ্গেয় ডলফিন। বাংলাদেশে এসব ডলফিন বিপন্ন তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। হালদার ভাটি এলাকা বিশেষ করে রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় সরকারিভাবে বালি উত্তোলন বন্ধ থাকলেও উজানে মানিকছড়ি এলাকায় বালি উত্তোলনের মহোৎসব চলছে। বালি উত্তোলন বন্ধে সরকারের পদক্ষেপ না থাকায় দিনে দিনে এটি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

 

একই উপজেলায় তামাক চাষের আগ্রাসন ক্রমাগত বাড়ছে। হালদাতে মা শিকার হচ্ছে অহরহ। একই সাথে অবৈধভাবে জাল ও বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনে নেমেছে অসাধু ব্যক্তিরা। বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের দায়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে হাটহাজারী গড়দুয়ারা এলাকায় জনৈক আলমগীরকে আটক করে এক মাসের বিনাশ্রমে কারাদন্ড দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম। এছাড়াও হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহিদুল আলম হালদায় মা শিকারিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছেন। একইভাবে অভিযান চালাচ্ছে নৌ পুলিশও। তারপরও থামছে না মাছ শিকারীদের তৎপরতা।

 

হালদা নদীর ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ি ও ভুজপুরে কৃষি কাজের জন্য নির্মাণ করা দুইটি রাবার ড্যাম। কিন্তু রাবার ড্যামে পাহাড়ি ছড়ার পানি আটকিয়ে কৃষি কাজে ব্যবহারের কারণে হালদায় সাগরের লবণ পানির আগ্রাসন বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

 

হালদা নদীতে দুই বছর ৮ মাস কাজ করেন তৎকালীন হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও বর্তমানে চা বোর্ডের উপ-সচিব মোহাম্মাদ রুহুল আমীন। এ প্রসঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে দৈনিক পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘হালদায় সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। তাহলেই সৃষ্ট সমস্যাগুলো দ্রুত সময়ের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব। বিশেষ করে প্রশাসন দিয়ে হালদায় এককভাবে মা শিকারসহ নানা অনিয়ম বন্ধ হবে না। এ ক্ষেত্রে নদীর দুই পাড়ের জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলেই হালদার ঐতিহ্য ফিরে আসবে।’

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদা রক্ষায় মন্ত্রণালয় ও দপ্তরসমূহ স্বতন্ত্র কোন সিদ্ধান্ত না নিয়ে সবগুলো সমস্যা চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথায় হালদা নদী এবং নদীর নির্ভর মানুষ এর সুফল পাবে না।’

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট