চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর, ২০২২

১৯ নভেম্বর, ২০২২ | ১১:০৩ পূর্বাহ্ণ

মিজানুর রহমান

নারী উদ্যোক্তায় মূল বাধা দৃষ্টিভঙ্গি

একজন পুরুষ ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবার, স্বজন যেভাবে পাশে দাঁড়ান-নারীর ক্ষেত্রে সেভাবে দাঁড়ান না। নারী হওয়ার কারণেই বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা পেতে শিকার হতে হয় বাড়তি বিড়ম্বনার। উদ্যোক্তা হতে পরিবার ও সমাজ থেকে যে পরিমাণ সমর্থন দরকার নারী হওয়ায় তা মেলে না। নারীদের প্রতি এই বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গিই নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে প্রধান বাধা বলে মনে করছেন সফল নারী উদ্যোক্তারা।

 

নারী উদ্যোক্তা ও মেরিডিয়ান গ্রুপের চেয়ারপার্সন কোহিনুর কামাল মনে করেন, একজন পুরুষ ব্যবসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবার, স্বজন বা রাষ্ট্র যেভাবে পাশে দাঁড়ায়- নারীদের ক্ষেত্রে সেভাবে দাঁড়ায় না। কারণ তারা মনে করে পুরুষরাই কেবল টাকা উপার্জন করতে জানে। যে কারণে অনেক বাধা পেরিয়ে নারীরা ব্যবসা শুরুর পর কোনো কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে আর ওঠে দাঁড়াতে পারেন না।

 

কোহিনুর বলেন, ৩০-৩৫ বছর ধরে নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছি। শুরুর দিকে একজন নারী হিসেবে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তা এখন নেই বললেই চলে। তবে কৃষিসহ অনেক খাতে নারী উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন না। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিসহ নানা কারণে কৃষিখাতে লাভবান হওয়া কঠিন। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকার শস্য বীমা চালু করলে এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়বে।

 

নারী উদ্যোক্তারা পড়ে গেলে ওঠে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করার পরামর্শ দিয়ে এই সফল নারী উদ্যোক্তা বলেন, নারী হিসেবে নয়- ব্যবসায়ী হিসেবে সমস্যার সমাধান করতে হবে। সময়, পরিশ্রম, একাগ্রতা থাকলে যে কোনো উদ্যোগে সফল হওয়া সম্ভব। নিজের প্রতি নিজের রেসপেক্টটা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের প্রতি পরিবার, স্বজন, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে কাজ করতে হবে। কাজে সফল হলেই এটি সম্ভব।

 

শুধু নারী হওয়ার কারণেই ব্যবসায় বাড়তি সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় বলে মনে করেন নারী উদ্যোক্তা ও রিগ্যাল ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং এজেন্সির প্রোপাইটর রোজিনা আক্তার লিপি। তিনি বলেন, শিপিং খাতে পুরুষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করা বড় চ্যালেঞ্জ। এই খাতে সবাই পুরুষ হওয়ায় নারী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে একটু বেশিই কষ্ট করতে হয়। নারী হওয়ার কারণে বন্দর-কাস্টমসের কিছু কর্মকর্তা হয়রানি করেন।

 

লিপি বলেন, আমদানি-রপ্তানি নিয়ে জ্ঞান অর্জনে নারীদের আগ্রহ কম। এই কারণে শিপিং খাতে নারীদের অংশগ্রহণও খুবই কম। তবে আমি মনে করি- সাহস করে এগিয়ে এলেই হবে। কাজের পেছনে লেগে থাকলেই হবে। একবার বুঝে গেলে কাজ করতে মজা লাগবে। চ্যালেঞ্জ নিতে জানতে হবে। সরকার নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করতে যেসব সুযোগ-সুবিধা ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে- সেগুলো নিতে হবে। তবেই সফলতা মিলবে।
শিপিং খাতে অংশগ্রহণ বাড়াতে নারীদের জন্য ঋণপ্রাপ্তিকে আরও সহজ করার পরামর্শ এই নারী উদ্যোক্তার।

 

তিনি মনে করেন, শিপিং খাতে বন্দর এবং কাস্টমসকেন্দ্রিক দুর্নীতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। শিপিং খাতে নারীদের আগ্রহী করতে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। প্রশিক্ষণের পর যারা এই খাতে উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী হবেন, তাদের জন্য শিপিং ব্যবসায় সুযোগও সৃষ্টি করে দিতে হবে। তবেই দেশ এগিয়ে যাবে।উদ্যোক্তা হতে পারিবারিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়াও নিরাপত্তার অভাবকে বাধা বলে মনে করেন নারী উদ্যোক্তা ও এগনোটিজ এগ্রো লিমিটেডের পরিচালক বাহারোজ দীপা। তিনি মনে করেন, কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে যেসব চ্যালেঞ্জ থাকে তা গ্রহণযোগ্য হিসাবে নেওয়ার সুযোগ কম নারীদের। কৃষি খাতে কাজ করাকে শিক্ষিত বা ভদ্র সমাজের অনেকেই এখনও সম্মানের চোখে দেখেন না। ফলে এই খাতে নারী উদ্যোক্তা কম।

 

দীপা বলেন, দক্ষ ও বিশ্বস্ত শ্রমিকের অভাব, কৃষি উপকরণের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় কৃষি খাতে টিকে থাকা চ্যালেঞ্জিং। তবে পরিশ্রমী, সুশৃঙ্খল, সৃজনশীলতা, সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা, নিজের উপর আস্থা রাখা, ধৈর্য্যের সাথে সময় এবং পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমর্থন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পেলে নারী উদ্যোক্তারা আরও এগিয়ে যাবেন। পরিবার ও সমাজের সমর্থন পেলে নারীরা আরও ভালো কাজ করতে পারবেন বলে মনে করেন নারী উদ্যোক্তা ও আলিজ বিডির মালিক সানজিদা আফরোজ।

 

তিনি বলেন, বাসায় বসে সিরিয়াল না দেখে মেধা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হলেই লাভ। এখন যে পরিস্থিতি- তাতে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও অর্থনৈতিকভাবে ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার ও সমাজ থেকে ভালো সমর্থন পেলে নারীরা সহজেই কাজ করতে পারবেন।

 

পূর্বকোণ/আর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট