চট্টগ্রাম শনিবার, ০৩ ডিসেম্বর, ২০২২

সর্বশেষ:

১৭ নভেম্বর, ২০২২ | ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ

মোহাম্মদ আলী, মানিকছড়ি ঘুরে এসে

ক্ষত-বিক্ষত হালদার বুক

বালি খেকোদের আগ্রাসনে ক্ষত-বিক্ষত হালদার বুক। নদীর উজানে প্রায় অর্ধশত পয়েন্ট থেকে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে প্রতিদিন তোলা হচ্ছে কমপক্ষে ২০০ ট্রাক বালি। তাতে মানিকছড়ি উপজেলার প্রায় ১৬ কিলোমিটার এলাকায় হালদা নদীর দুই পাড় ভেঙে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছে। নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি। ভাঙনের কারণে উজান থেকে বালি নেমে ভরাট হচ্ছে ভাটি অঞ্চল। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বালু খেকোদের বিরামহীন ধ্বংসযজ্ঞ চলে এলেও নীরব প্রশাসন। বালি উত্তোলনের বিষয়টি মানিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রক্তিম চৌধুরীর নজরে আনলে পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের অনুমতি ছাড়া কোন কিছু বলতে পারবো না। আপনি অফিসে আসেন, অন্যথায় কিছু বলা যাবে না।’ এদিকে, স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রতিদিন হালদা নদী থেকে অবৈধভাবে শতশত ট্রাক বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। সারাবছরই হালদা পাড়ে এ ধ্বংসযজ্ঞ চলে আসলেও প্রতিকারে এগিয়ে আসছে না কেউই। ফলে পাড় ভেঙে বর্ষা মওসুমে নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি। ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে অনেকটা বিধ্বস্ত গ্রামীণ সড়কসমূহ।

 

প্রায় ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদী। নদীর উৎপত্তি রামগড়ের পাতাছড়া ইউনিয়ন। সেখান থেকে এটি রামগড়, মানিকছড়ি, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, চান্দগাঁও হয়ে কর্ণফুলী নদীর সাথে সংযুক্ত হয়েছে। বিশাল এ নদীর রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়ি এলাকায় বালি উত্তোলন সরকারিভাবে বন্ধ থাকলেও এখনো উন্মুক্ত রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলায়। বালি উত্তোলনের উন্মুক্তের সুযোগ নিয়ে উন্মত্ততায় মেঠে ওঠেছে শতাধিক বালি খেকো। সংঘবদ্ধ বালি খেকোরা প্রতিদিন প্রায় ২০০ ট্রাক বালি বিক্রি করছে। এ বালি খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়াও যাচ্ছে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও শহরে।

 

নিজেকে বালি ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে মানিকছড়ির গোরখানা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ মাসুম পূর্বকোণকে বলেন, ‘মানিকছড়ি উপজেলায় হালদার দুই পাড়ে ১৬ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় অর্ধশত পয়েন্টে ৫০টির মতো শ্যালো মেশিন রয়েছে। এসব শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় দুইশ’ ট্রাক বালি উত্তোলন করা হয়। এসব বালি ৬০০ ফুট ধারণ ক্ষমতার প্রতি ট্রাক নয় হাজার টাকা এবং ৪০০ ফুট ধারণ ক্ষমতার প্রতি ট্রাক ছয় হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। জায়গার দূরত্ব অনুযায়ী ট্রাক ভাড়া আলাদাভাবে নেওয়া হয়।’

 

মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘হালদা থেকে নির্দিষ্ট কোন মাসে নয়, সারাবছরই বালি উত্তোলন করা হয়। তুলনামূলক মান ভাল হওয়ায় হালদার বালির চাহিদাও রয়েছে অনেক বেশি।’

 

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, হালদার প্রতিটি পয়েন্ট থেকে দৈনিক ৪ থেকে ৫ ট্রাক বালি উত্তোলন করা হয়। অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের কারণে নদীর দুই পাড় ভেঙে হালদায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এতে গভীরতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন অংশে ভরাট হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন প্রায় ২০০ ট্রাক বালি বিক্রির কারণে স্থানীয় সড়কগুলোর অবস্থাও ভঙ্গুরদশা, যানবাহন চলতে পারে না।

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদা নদীর উজানে ব্যাপকভাবে বালি ও মাটি উত্তোলনের কারণে নদীর আকার ও ভৌত গঠন ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে নদীর পানির ঘোলাটেভাব। পাহাড়ের মাটি ধসে ভরাট হচ্ছে নদী, একই সাথে নদীর দুই পাড়ের জমি ভেঙে যাচ্ছে। সেই সাথে কমছে নদীর গভীরতাও। অপরদিকে রুই জাতীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের কুম ভরাট এবং নদীর পানির ঘোলাটেভাব বেড়ে যাওয়াও দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তাতে মাছের প্রজনন আবাসস্থলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।’

 

প্রফেসর মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘হালদার উজানে কোনভাবে সরকারিভাবে বালি মহাল ইজারা দেওয়া যাবে না। তবে শ্রমিকদের মাধ্যমে ম্যানুয়ালি বালি তুলে ইঞ্জিন ছাড়া নৌকায় পরিবহন করলে বালির চাহিদা যেমন পূরণ হবে, তেমনি নদীর ইকোসিস্টেমের তেমন ক্ষতি হবে না।’ বালি উত্তোলন প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসার ফারহানা লাভলী পূর্বকোণকে বলেন, ‘উজানে হালদা মরে যাচ্ছে। অবাধে বালি উত্তোলনের কারণে হালদার ব্যাপক ক্ষতি হবে। হালদা নদী নিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের একটি কমিটি রয়েছে। এ কমিটির মাধ্যমে মানিকছড়ি ও রামগড়ে হালদার বিভিন্ন সমস্যাসমূহ সমাধান করা সম্ভব।’

পূর্বকোণ/পিআর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট